প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও এনআরসি প্রসঙ্গ : সমুন্নত থাকুক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

এইচ এম মেহেদী হাসান: ভারতের আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্ববেগের কোনো কারণ নেই, জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনের সাইড লাইনের মিটিংয়ে এন আর সি নিয়ে কথা হলে এই বিষয় আশ্বস্ত করেন।তবে মাঝে মাঝে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়ায়।

ভিটে মাটি ছাড়া হওয়ার আতঙ্ক কি মানুষকে বিজেপির বিরুদ্ধে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত প্রশ্নটা উঠতেই পারে। তবে সব কিছুর মূলে রয়েছে ভোটের রাজনীতি ও কিছুটা ধর্মীয় গোড়ামি। ৩১ আগস্ট ২০১৯ ভারতের আসাম রাজ্যের চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা National Register of Citizens (NRC) ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত হয় হালনাগাদকৃত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি। মোট ৩,৩০,২৭,৬৬১ জন আবেদনকারীর মধ্যে চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় স্হান পান ৩,১১,২১,০০৪ জন।তালিকা থেকে বাদ পড়েন ১৯,০৬,৬৫৭ জন। বাদ পড়া লোকদের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ হিন্দু ধর্মালম্বী বাঙালি ও ৬ লাখ মুসলমান রয়েছেন। আর বাকি দুই লাখের মধ্যে আছে বিহারি, নেপালি ও লেপচা। তবে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য প্রক্রিয়াগত পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে তালিকায় যাদের নাম নেই, তারা নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য ‘করেনার্স ট্রাইব্যুনালে ‘আপিল করতে পারবেন। কেউ ট্রাইব্যুনালে নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে হাইকোর্টে আবেদন করতে পারবেন। হাইকোর্টে নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন।এতেও ব্যর্থ হলে তিনি ‘বিদেশী বলে গণ্য হবেন তিনি এবং সরকার তাকে আটক করাসহ অন্য আইনি ব্যবস্হা নিতে পারবে।

আসামের NRC ইস্যুটি সম্প্রতি আলোচনায় এলেও এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সাত দশক আগে, বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫১ সালে আসামে প্রথমবারের মতো জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ( NRC) প্রকাশ করে। এরপর ১৯৭৯ সালে আসামে বিদেশিবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে NRC হালনাগাদের দাবিতে প্রথম স্মারকলিপি দেয় অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ( AASU)। ও ১৯৮৫ সালের ১৪ আগস্ট ঐতিহাসিক আসাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এবং ১৯৯৯ সালে আসাম চুক্তি অনুয়ায়ী, NRC হালনাগাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয় ভারত সরকার। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে NRC’র হালনাগাদ প্রক্রিয়া শুরু করতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ চাওয়া হয়। এবং ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা পেয়ে NRC হালনাগাদের প্রক্রিয়া শুরু করে ভারত সরকার। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে NRC’র প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই আসাম সরকার NRC’র দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশ করে। এতে আবেদন করে ৩ কোটি ২৯ লাখ এবং বাদ পড়ে ৪০ লাখ। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর চূড়ান্ত NRC প্রকাশে সরকারকে বেঁধে দেয়া সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়।২০১৯ সালের ২৬ জুলাই NRC থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের অতিরিক্ত একটি খসড়া প্রকাশ করা হয়। এতে নতুন করে যোগ হয় ১,০২,৪৬২ জনের নাম।বাদ পড়া ব্যক্তির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪১,১০,১৬৯ জন।২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত NRC তালিকা থেকে ১৯ লাখের বেশি মানুষ বাদ। আসাম সরকারের NRC’র কারণে কিছুটা হলেও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে উদ্বিগ্ন দেখা দিয়েছে। এর মূল কারণ রোহিঙ্গা সংকট।হয়তো মানুষের মধ্যে এই কাজটি করেছে যে,না আবার আসাম থেকে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ ঘটায় ভারত সরকার।তাহলে তো মরার উপর খড়ার মা’র মতো হবে।সুতরাং উদ্বিগ্ন মানুষের মনের ভাবনাগুলো যেন সত্য না হয় সেটাই প্রত্যাশা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ৩-৬ অক্টোবর ২০১৯ চার দিনের সফরে ভারতে রয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এটা হচ্ছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তৃতীয়বারের মতো পুর্ননিবাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম ভারত সফর।অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরও শেখ হাসিনার প্রথম ভারত সফর।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩-৪ অক্টোবর ২০১৯ ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ভারতীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে দিয়েছিলেন এবং ৪ অক্টোবর ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে রাখেন। এই প্রসঙ্গে কথা বলার অর্থ হচ্ছে ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ।মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল ভারত। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে ভারত কখনও হটকারী সিদ্ধান্ত নিবে না।তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপকারের কথা কখনও বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায়নি।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে যে সুসম্পর্ক ছিল তা আজও তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধরে রেখেছেন। সুতরাং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেহেতু সরকারে আছেন সেহেতু বাংলাদেশের মানুষের কোনো উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। শেখ হাসিনা এখন সারা বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী।তিনি জননেত্রী থেকে এখন বিশ্ব নেত্রী।

তিনি এখন সারা বিশ্বের সেরা রাষ্ট্র্রনায়ক।সারা বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের প্রতীক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে হলে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং ভারত সরকার যা কিছু করবে অবশ্যই ভেবে চিন্তে করবে।আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির মূলচাবিকাঠি এখন শেখ হাসিনার কবজ্বায়।কারণ তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতোই অসীম সাহসী ও সততার অধিকারী এবং মেধা মননে ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী। আসামের NRC সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যাপার। ভারত সরকার কখনও চাইবে না দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও শান্তি বির্নিষ্ট হোক।তবে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে কিছু মহল এর ফায়দা লুফে নিতে পারে,সেই ব্যাপারে সবার সচেতন থাকা প্রয়োজন রয়েছে। মোদি সরকারে সাথে শেখ হাসিনা সরকারের যে সুসম্পর্ক রয়েছে তাতে মনে হয় না নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বড় ধরণে কোনো মাথা ব্যথা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রয়েছে। ভারতের সাথে অভিন্ন পানি চুক্তি থেকে শুরু করে সব বিষয়ে শেখ হাসিনা সরকার যুক্তিসঙ্গত উপায়ে সমাধান করতে পারবে বলে মনে করে বাংলাদেশের মানুষ।এই আস্তা ও বিশ্বাস তিনি অর্জন করতে পেরেছেন বাংলাদেশের মানুষের।

তবে যেহেতু NRC’র বিষয়টা আসাম সরকার জোড়ে সোড়ে নাড়া দিচ্ছে, তাই বিষয়টাকে হালকাভাবে নিলে হবে না।সব সময়ই নজর দাড়িতে রাখতে হবে।সরকারি পর্যায় ও বেসরকারি পর্যায়ও খোঁজ খবর নিতে হবে।যাতে করে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের উপর না চাপাতে পারে ভারত সরকার। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও স্হানীয় নেতাদের বক্তব্য কিছুটা মানুষের মধ্যে চিন্তার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের মতো দেশের একটি রাজ্যের নাগরিকপঞ্জি( NRC) কি সব কিছু ধূলিসাৎ করে দিবে? তা কখনও হতে পারে না।প্রতিটি মানুষের ন্যার্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, সেখানে যেনো ধর্মের অনধিকার চর্চা প্রতিষ্ঠি না হয়।হিংসা বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে আসাম এগিয়ে যাবে এটাই মানুষের প্রত্যাশা।ভোটের রাজনীতির কাছে কেনো হেরে যাবে মানবতা, প্রেম ভালোবাসা,নাগরিক অধিকার? আসামের NRC হোক মানবতার জয়।সবার উপরে মানুষ সত্য এ কথা হোক NRC’র বিষয়। জীবন যৌবনের সব সময় ব্যয় করে হয়েছে বৃদ্ধ। জীবনের সর্ব উত্তম সময় দিয়ে করেছে আসামের উন্নয়ন, সেই কিনা এখন নয়তো আসামের মানুষ! এ কেমন রীতি NRC’র? এমনও বাস্তব ঘটনা দেখা যায় ভারতের সেনাবাহিনীতে চাকরি করে,দেশের জন্য দিয়ে গিয়েছেন জীবন আর তাঁর সন্তানেরা এখন NRC’র জন্য আদালত পাড়ায় হাজির।ভারতের মতো উদার গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে আসাম যেনো কোনো স্বৈরশাসক না হয়। আর NRC’র কারণে যেনো কোনো পিতা মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক ছিন্ন না হয়।জাতিগত কোনো বিভেদ তৈরি না হয়। প্রতিবেশী দেশের সাথে আমাদের আছে আত্নার সম্পর্ক। কোনো কোনোদিন না হয় ছিন্ন। একজন আসামের মানুষও যেনো না হয় গৃহহীন, একজন মানুষও যেনো না হয় নিগৃহীত। মাদার অব হিউম্যান্যানিটি বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বের বিস্ময়। বাংলাদেশ এখন শান্তি ও উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ এখন অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে যেনো আসাম রাজ্যের NRC কোনো বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়।সেই বিষয়ে প্রতিটি মুহূর্ত বাংলাদেশ সরকার তথা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সজাগ থাকবে এটাই জাতির প্রত্যাশা।যেহেতু NRC অনেক আগের বিষয়, সেহেতু বাংলাদেশ ভারত সরকারের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে।আর আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে কেই যাতে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে মাঠ ঘোলাটে না করতে পারে সেই বিষয়টিও সরকারের বিবেচ্যবিষয়। তবে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ না কি আসামে অবৈধভাবে বসবাস করে আসছে বলে দাবি করছে আসাম সরকার।কিন্তু বিষয়টি আদো সত্য কিংবা মিথ্যা সেই বিষয়টি প্রকাশ পাবে তথ্য প্রমাণাদি থেকে।আসামে প্রথম নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছিল যে ১৯৫১ সালে সেখানে দাবি তুলে কয়েক দশক আগে আসামে ‘বাঙালি খেদাও ‘আন্দোলন শুরু হয়। তার ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের মধ্যে অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে তাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে চার বছর আগে আসাম সরকার নতুন নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ শুরু করে। নাগরিকপঞ্জিতে ঠাঁই পেতে হলে বাসিন্দাদের প্রমাণ করতে হয়,তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে রাজ্যে আবাস গেড়েছেন। গত চার বছর ধরে সেখানকার বাসিন্দাদের নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নানা কাগজপত্র হাতে এক দরজা থেকে অন্য দরজায় ছুটতে হয়েছে। নাগরিকপঞ্জিতে বাদ পড়াদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনায় বাংলাদেশের ভেতরেও উদ্বিগ্ন রয়েছে।

তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলেন,”এটা একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ” আর বাংলাদেশের মানুষও তা-ই মনে করে, এটাই যেনো সত্য হয়। নাগরিকপঞ্জির মারপ্যাঁচে যেনো কোনো নিরাপদ নিরীহ মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে যে সুসম্পর্ক রয়েছে তাতে নাগরিকপঞ্জি কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরাতে পারবেনা। NRC হয়তো আসামের রাজনীতির খেলা। ভোটের ব্যালট বাক্স ভারি করার অন্যতম ইস্যু ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সুতরাং ভারতের মতো এতো পরিপক্ক রাষ্ট্র কখনও বহিঃবিশ্বের কাছে হাসির পাত্র হবে না।এটা সবার জানা আছে। NRC’র জায়গায়তে NRC থাকুক। বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন না থাকুক সেটাই সকলের প্রত্যাশা।রাজনীতির কাছে যেনো নাগরিকপঞ্জির গ্রহণযোগ্যতা না হারিয়ে যায়।