আদালতে হত্যা চেষ্টার মামলা চলমান। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া গেছে। কিন্তু এরপরও মামলার আসামিরা জামিনে মুক্ত থেকে বাদীকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার এক বয়োজ্যেষ্ঠ ভুক্তভোগী ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী হাজী মোহাম্মদ জাফর উল্ল্যাহ (৭৪) অভিযোগ করেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তার ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন থাকলেও আসামিরা আইনের সুযোগ নিয়ে জামিনে মুক্ত থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি অব্যাহত রেখেছে তারা।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, সন্দ্বীপ থানার এফআইআর নং-২, তারিখ ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এবং জিআর নং-৭৭ এর মাধ্যমে মোঃ মিজান (৪৯), মোঃ করিম (৪২) ও মোঃ রাহাত (২৬)-এর বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৫০৬ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে একাধিকবার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে পেনাল কোডের ৪৪৭/৩২৩/৩০৭/৫০৬ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, জায়গা-জমি ও পারিবারিক বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও মনোমালিন্য চলছিল। বিষয়টি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে একাধিক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকেই আসামিরা বাদীকে মারধর ও ক্ষতির হুমকি দিয়ে আসছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সন্দ্বীপ উপজেলার সারিকাইত ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বাদীর বসতঘরের সামনে তাকে দেখতে পেয়ে গালিগালাজ শুরু করে আসামিরা। বাদী প্রতিবাদ করলে তারা লাঠিসোটা নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে হামলা চালায়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান আসামি মোঃ মিজান হাতে থাকা লাঠি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে বাদীর মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করেন। অপর আসামিরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করে গুরুতর আহত করে। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে বাদীর স্ত্রী সুফিয়া বেগমও হামলার শিকার হন। তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরে স্থানীয়রা আহত দম্পতিকে উদ্ধার করে গাছুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে জামিনে মুক্ত থাকায় আরও দুঃসাহসী ও হিংস্র হয়ে উঠেছে। গ্রেপ্তার বা আইনের কঠোরতার মুখোমুখি না হওয়ায় তারা এখন প্রকাশ্যে ও গোপনে বাদীর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করতে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমেও বারবার চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাদীপক্ষের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাণনাশের হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নানা ধরনের হয়রানি চলমান রয়েছে। এতে বৃদ্ধ বাদী ও তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চরম উদ্বেগ, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় তাদের ওপর আবারও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের ৩ জুন রাত আনুমানিক ১২টার দিকে একই এলাকার মোঃ এমলাক (৪৫) নামে এক ব্যক্তি লাঠি হাতে বাদীর বাড়িতে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তিনি বাদীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসেন, ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পরদিন নিরাপত্তার স্বার্থে ভুক্তভোগী সন্দ্বীপ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তার লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও হুমকি-ধমকি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেছেন বাদী। বরং অভিযুক্তদের তৎপরতা আরও বেড়েছে বলেও অভিযোগ তার।
বৃদ্ধ বাদী হাজী মোহাম্মদ জাফর উল্ল্যাহ বলেন, আমি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। আদালতের ওপর আস্থা রেখে মামলা করেছি। কিন্তু আসামিরা জামিনে বাইরে থেকে প্রতিনিয়ত আমাকে ও আমার পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানা মাধ্যমে চাপ দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন সবসময় আতঙ্কে থাকি।
তিনি আরও বলেন, যাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে, তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছে। এ অবস্থায় আমার পরিবার নিয়ে নিরাপদে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু বিচার চাই।
ভুক্তভোগী পরিবার অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিচারাধীন মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও আসামিরা জামিনে মুক্ত থেকে যেভাবে ধারাবাহিকভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, তা শুধু একজন বৃদ্ধ বাদীর জন্য নয়, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিধারার জন্যও উদ্বেগজনক।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরও যদি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মামলার বাদী দীর্ঘদিন ধরে আসামিদের হুমকির মুখে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তারা ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply