কৃষিনির্ভর জামালপুর জেলায় অবৈধ ইটভাটার লাগামহীন বিস্তার এখন কৃষক, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ফসলি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব অবৈধ ভাটার কারণে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
৭টি উপজেলা ও ৮টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জামালপুর জেলা মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পৌর এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে, জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমির আশপাশে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাস্তবে এই আইনের তোয়াক্কা না করেই জেলায় গড়ে উঠেছে ১০২টি ইটভাটা। এর মধ্যে মাত্র ১৪টির রয়েছে সরকারি অনুমোদন, বাকি ৮৮টি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপসয়েল) কেটে নেওয়ায় জমির উৎপাদনক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি ভাটার মাটি বহনকারী ট্রাক থেকে সড়কে মাটি পড়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র ধুলাবালি, যা পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
ইসলামপুর উপজেলার চরগোয়ালিনী ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহিনুর রহমান সাজু মাস্টার ও গিরাম মিয়া বলেন, “অবৈধ ইটভাটার কারণে আমাদের ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। ধুলাবালিতে শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টে ভুগছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ ইউনিয়নের রুকনাই এলাকার বাসিন্দা তাহিজল ইসলাম ও সুমন মিয়া। তারা জানান, “এই ভাটাগুলো শুধু পরিবেশ নয়, আমাদের জীবনযাপনকেও বিষিয়ে তুলেছে।
জামালপুর পৌর শহরের বাসিন্দা সাংবাদিক মিঠু মিয়া বলেন, “অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটা এখন আমাদের গলার কাঁটা। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, আর আমরা ভুগছি। পৌর শহরের ভেতরেই ১০–১২টি ভাটা এখনও চালু রয়েছে—এগুলো বন্ধে কেন এত গড়িমসি?”
এ বিষয়ে কয়েকজন ইটভাটা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা তাদের ভাটার বৈধতা প্রসঙ্গে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
এদিকে অবৈধ ইটভাটার বিস্তার পরিবেশ ও কৃষির জন্য গুরুতর হুমকি স্বীকার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর।
জামালপুর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এ কে এম ছামিউল আলম কুরসি বলেন, “অবৈধ ইটভাটাগুলো পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইন ও নীতিমালা থাকার পরও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান কবে শুরু হবে? কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply