বন্দরনগরী চট্টগ্রাম-এ জ্বালানি তেল চুরি ও অবৈধ বিক্রির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরের বিভিন্ন প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতেও প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে চোরাই জ্বালানি তেল। এতে যেমন আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে, তেমনি সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
স্থানীয় সূত্র ও সচেতন মহলের অভিযোগ, নগরীর পতেঙ্গা এলাকা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ মেরিন ড্রাইভ এবং আউটার রিং রোড হয়ে ফৌজদারহাট পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কপথের বিভিন্ন স্থানে শত শত অবৈধ দোকানে চোরাই জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। এসব দোকানে খোলা ড্রাম, বোতল বা ছোট ট্যাংকে তেল মজুদ করে বিক্রি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চালক ও সহকারীরা তেলবাহী ট্যাংকার থেকে নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেল চুরি করে এসব দোকানে সরবরাহ করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন তেলবাহী গাড়ি থেকে ডিজেল ও অকটেন চুরি করে স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে সেই তেল বাজারমূল্যের চেয়ে কিছুটা কম দামে বিভিন্ন গাড়িচালক ও ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। এভাবে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার তেল অবৈধভাবে বাজারে প্রবেশ করছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
শুধু ছোটখাটো দোকান নয়, এ অবৈধ ব্যবসার পেছনে রয়েছে বড় বড় সিন্ডিকেটেরও জোরালো প্রভাব। দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংঘবদ্ধ চক্র এই ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চোরাই তেলের সরবরাহ ও বিক্রি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ নিয়ে বিভিন্ন গুজব ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় অনেক স্থানে তেলের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাম্প ও ডিপোগুলোতে অস্বাভাবিক ভিড় ও ছোটখাটো বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সরকার প্রশাসনিক নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল চুরি ও অবৈধ বিক্রি দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর অপরাধ। পেট্রোলিয়াম আইন ২০১৬ এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া জ্বালানি তেল মজুদ, পরিবহন বা বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব অপরাধে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। তবুও বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই চোরাই তেল বিক্রি চলতে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে।
এছাড়া এসব চোরাই তেলের ব্যবসার কারণে সরকার প্রতিনিয়ত বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। কারণ সরকার নির্ধারিত পাম্পের বাইরে অবৈধভাবে তেল বিক্রি হওয়ায় রাজস্ব ও ভ্যাট আদায় সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে, কারণ এসব স্থানে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রশাসনিক পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়েনি। অনেকের অভিযোগ, মাসোহারা বা অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে প্রশাসনের একটি অংশের যোগসাজশ থাকায় এই অবৈধ ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে।
এ অবস্থায় চট্টগ্রামবাসীর দাবি, জ্বালানি তেল চুরি ও অবৈধ বিক্রির এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় এই অপরাধচক্র শুধু সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতিই করবে না, বরং দেশের জ্বালানি খাতের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে থাকবে।
Leave a Reply