ঈদ উল আযহা মানেই চামড়া ব্যাবসায়ীদের ব্যস্ততা ও বাড়তি কিছু আয়ের চেষ্টা । কুষ্টিয়ার ব্যাবসায়ীরা সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন ঈদ উল আযহার কুরবানির চামড়ার জন্য। কিন্তু ট্যানারি মালিকদের কাছে টাকা আটকা পড়ে থাকায় কুষ্টিয়ার চামড়া ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, চামড়ার আমদানি থাকা সত্ত্বেও অর্থ সংকটে চামড়া কিনতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। অর্থাভাবে পূর্বের ন্যায় কর্মব্যাস্ততা নেই জেলার চামড়ার আড়তগুলোতে। এমনটি জানিয়েছেন কুষ্টিয়া চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি ও ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবছরই কুষ্টিয়ার আশেপাশের কয়েকটি জেলা থেকে লক্ষাধিক কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া আমদানি হয় জেলার আড়তগুলোতে। কুরবানির সময় আড়তগুলোর কাঁচা চামড়ার সিংহভাগই আমদানি হয় এসময়। কিন্তু এবছর কুষ্টিয়ার আড়তগুলো অনেকটাই ফাকা দেখা যায়, কারন হিসেবে আড়তমালিকরা জানান আমাদের পুঁজি সবই ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকা আছে চামড়া কেনার টাকা নাই।
মাসুদ আড়ত ঘর ও কুষ্টিয়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির জয়েন্ট সেক্রেটারি মোঃ সোহেল রানা জানান কুষ্টিয়াতে আমার বাবা দাদা ব্যবসা করে গেছে সেই সূত্র ধরে এখনো আমি আমার বাবার সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছি এক সময় আমরা খুবই ভালো ব্যবসা করেছি, আমার বাবা মোঃ মাসুদ সারা বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন ছিল, কিন্তু এখন আমাদের পুঁজি সবই ট্যানারি মালিকের হাতে পড়ে আছে, পুঁজি না থাকাই এবছর চামড়া তুলতে পারিনি। তিনি বলেন দুই ট্যানারি মালিকের কাছে আমার মোট ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পরে আছে, এর মধ্যে এক জনের কাছেই ৬ কোটি টাকা পরে আছে প্রায় ৫ বছর। আরেক জনের কাছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পরে আছে ২০১০ সাল থেকে, এই ব্যবসায়ী বলেন এখন আমার দুই কোটি টাকা থাকলে চামড়া তুলে ঘড় ভরে ফেলতে পারতাম, সোহেল রানা জানান কুষ্টিয়ার ব্লাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া দেশের মধ্যে বিখ্যাত, দেশে ও দেশের বাইরে কুষ্টিয়ার এই চামড়ার ব্যাপক চাহিদা কিন্তু প্রতিটি আড়ত ঘরই ট্যানারি মালিকদের কাছে ধরা খেয়ে নিঃস্ব প্রায়।
মেসার্স রাজা এন্টারপ্রাইজ আড়ত ঘরের এর মালিক রাজাও জানান তার অসহায়ত্বের কথা, প্রায় ৮-১০ বছর তার দেড় কোটি টাকা ট্যানারি মালিকদের মালিকদের কাছে পড়ে আছে। তিনি বলেন কুষ্টিয়ার চামড়া দেশের ভিতরে বিখ্যাত, ট্যানারি মালিকদের কাছে টাকা পড়ে থাকায় কুষ্টিয়ার চামড়া শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। ঢাকা থেকে ট্যানারির পক্ষে চামড়া নিতে আসে কর্মচারীরা মালিকপক্ষ আসে না, সাদা কাগজে লিখে নিয়ে যায়, পরে টাকা না দিলে আমাদের কিছু করার থাকে না। রাজা বলেন এবছর গত বছরের তুলনায় প্রতিটি গরুর চামড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দিয়ে কিনেছি, এখন মনে হচ্ছে কেনার থেকে বিক্রি দাম কম হবে।
এবছর কুষ্টিয়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা গরুর কাঁচা চামড়া আটশো থেকে হাজার টাকায় কিনছেন। কিছু ক্ষেত্রে বড় চামড়া ১২০০ টাকা দিয়েও কিনছেন তারা। এবং ছাগলের চামড়া পঞ্চাশ থেকে সত্তর দরে কিনছেন। এর সাথে প্রতিটি চামড়ার পেছনে লেবার এবং লবণ দিয়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয় তাদের।
কুষ্টিয়া শহরের বাবরআলী গেট সংলগ্ন চামড়া পটিতে ছোট বড় মিলিয়ে ৫৭ টি আড়ত ঘর রয়েছে। প্রতিটি আড়ত ঘড়ই ট্যানারি মালিকের কাছে ধরা খেয়ে কুষ্টিয়ার চামড়া শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
কুষ্টিয়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিস কোরাইশি বিজনেস স্টান্ডার্ডকে বলেন কুষ্টিয়ার চামড়া দেশ ও দেশের বাইরে ব্যাপক চাহিদা, কিন্তু কুষ্টিয়া চামড়া ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা না পাওয়াই এই চামড়া শিল্প কুষ্টিয়া থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন আমি নিজে গিয়ে শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিক বার মিটিং করেছি, ট্যানারি মালিকদের এই ধরনের আচরণের কথা জানিয়েছি, এবং এফবিসিসিআইতেও জানিয়েছি। তাতেও তেমন কোন সুফল আসেনি। হয়তো কিছু কিছু ট্যানারি মালিক ১০০ টাকায় ২,৩ টাকা হারে পরিশোধ করেছেন। এভাবে দিয়ে বলেছে আর দিতে পারব না। এ বছর চামড়ার ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন ঈদ পেরিয়ে গেলেও এখনো আমাদের চামড়া আমদানি হচ্ছে, বিভিন্ন ইউনিয়ন উপজেলাতে চামড়া লবণ দিয়ে রেখেছে, সেগুলো এখনো একমাস ধরে আমাদের আড়ত গুলোতে আসবে। এখনো আমাদের কেনা চলছে তাই এখনই লাভ লস সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। তিনি বলেন ট্যানারি মালিকদের লেনদেন ঠিক থাকলে কুষ্টিয়ার চামড়া শিল্প দেশের মধ্যে সেরা অবস্থানে থাকত।
Leave a Reply