কক্সবাজার জেলা জুড়ে চলমান এ সংকটের কারণে বাজারে প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি।
কক্সবাজারে হঠাৎ করে শহর ও সদর সহ জেলার অধিকাংশ এলাকায় এলপিজি’র তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের কোন তদারকি নেই। চলমান এ সংকটের কারণে বাজারে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি।
আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দাম দিয়েও মিলেছে না রান্না করার এই গ্যাস। কৃত্রিম এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। ফলে বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে অতি মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে এলপিজি গ্যাসের দাম বেশি বাড়তি। কেন এবং কি কারনে গ্যাসের দাম বেড়েছে তার কোন সঠিক উত্তর মেলেনি। তবে, ডিলার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাবসায়ীরা।
গত কয়েক দিনে পৌরসভা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কেনার এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। একদিকে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি, অন্যদিকে অনেক জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডারও পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্রাহকদের অভিযোগ, হঠাৎ এভাবে দাম বাড়ার নজির এই প্রথম। অন্য সময় গ্যাসের দাম বেড়ে যেতো, কিন্তু সংকট থাকতো না। কিন্তু এবার যেমন সংকট তেমনি প্রতি সিলিন্ডারে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়তি। যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক গ্যাসের দোকানে সিলিন্ডার পর্যন্ত দেখা যায় নি। বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ কম থাকায় তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, ফলে বিক্রির দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
বাহারছড়া এলাকার গ্যাস বিক্রেতা শাহিল এন্ড সোহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিউল আলম বলেন, ‘এই মুহুর্তে তার দোকানে কোন গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার নেই। গত দুদিন ধরে গ্রাহকরা গ্যাসের জন্য এসেও গ্যাস ক্রয় করতে পারেনি।’
সংকটের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত গ্যাসের দাম ১২৫৩ টাকা। আমরা সেই গ্যাস বিক্রি করতাম ১৩০০ থেকে ১৩৫০ টাকা। কিন্তু, এখন সেই গ্যাস কিনতে হচ্ছে ১৮০০ টাকা। ডিলাররা মেমো না দেওয়ায় ক্রয় করা থেকে বিরত আছি। কারণ, প্রশাসন এসে মোবাইল কোর্ট করলে আমরা কি ডকুমেন্ট দেখাবো? এজন্য সিলিন্ডার আপাতত নেই।
মোহাজের পাড়া এলাকার খুচরা গ্যাস বিক্রেতা হারুন ট্রেডার্সের মালিক মোহাম্মদ হারুন বলেন, ‘১৩০০ টাকার গ্যাস এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫০০ টাকা। ডিলারের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম থেকে না-কি গ্যাস আসছে না। এজন্য শহরে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।’
গাড়ির মাঠ এলাকার ব্রাদার্স প্রকৌশলী নামের গ্যাসের দোকানে চাকরি করেন হেলাল। তিনি বলেন, ‘গত তিনদিন ধরে দোকান বন্ধ। ডিলার দিচ্ছেন না। গ্রাহকরা বিরক্ত করতেছে। কিন্তু, দোকানে গ্যাস নেই।’
গাড়ির মাঠ বৌ বাজার এলাকার রুনু সওদাগরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিলারের কাছ থেকে ১০ টি এলপিজি নিয়েছি। ২ হাজার টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়।’
কোন প্রতিষ্ঠানের ডিলার থেকে গ্যাস ক্রয় করেছেন জানতে চাইলে, তিনি পরিচয় জানতে চান। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে কল কেটে দেন।
নাম জানাতে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার দোকানে গত পাঁচদিন ধরে সিলিন্ডার নেই। ডিলারের কাছে গেলে বলে গ্যাস নেই। শর্ত দিয়ে গ্যাস ক্রয় করতে বলে। গ্যাস ক্রয় করলে-ও মেমো দেয় না। আমি মূলত পেট্রোম্যাক্স, আইগ্যাস ও বসুন্ধরার সিলিন্ডার বিক্রি করি। এক সপ্তাহ আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১২৫০-১৩৫০ টাকা ছিল, গত তিনদিন ধরে সেটা ২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। শনিবার থেকে একই গ্যাসের দাম প্রতি সিলিন্ডারের ৩০০ টাকা বেড়ে যায়। রবিবার (৪ জানুয়ারি) থেকে ২৩০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। পুরো পৌরসভায় গ্যাস নেই। এখানে সিন্ডিকেট করে মূলত সংকটটা দেখানো হচ্ছে।’
এলপিজি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ইরান থেকে এলপিজির বৈশ্বিক সরবরাহকারীরা এখন মারাত্মক সংকটে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ওই বাজার থেকে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।’
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) শীর্ষ নেতারা অবশ্য জানান, ‘শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি থাকে। তার ওপর কয়েকটি কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে। দ্রুত আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।’
জেলা ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে শহরে অভিযান চালিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। খুরুশকুল রাস্তার মাথার মাম্মি এন্টারপ্রাইজকে ২০ হাজার এবং বাংলাবাজার কক্স ট্রেড লিংক’কে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আজ এবং কাল আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন ভোক্তার এই কর্মকর্তা।
জেলা এলপিজি সমিতির সভাপতি সরওয়ার আলম বলেন, চট্টগ্রাম থেকে গ্যাস সরবরাহ না হওয়ার কারণে এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছে। দুই একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।
Leave a Reply