গাজীপুরের শ্রীপুরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের নামে কার্যক্রম পরিচালনার সময় চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন,ক্ষমতার অপব্যবহার,প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে শ্রীপুর উপজেলা নারী ও শিশু কল্যাণ সমিতির সভাপতি এবং উপজেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য মেহেদী হাসান আশিকের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এরআগে, ২৯ জুন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও।
উপজেলার বরমী ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার মহি উদ্দিনসহ আরও ৭নিকাহ রেজিস্ট্রার সাক্ষরিত একটি অভিযোগ উপজেলা প্রশাসনে জমা দেন।
লিখিত অভিযোগে শ্রীপুর উপজেলার কয়েকজন নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) দাবি করেন, উপজেলায় বাল্যবিবাহ বন্ধের কথা বলে বিভিন্ন সময় নানাভাবে তাদেরকে হয়রানি করা হয়। তারমধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে কাজি ও তাঁর সহকারীদের আটক করে তাঁদের নিকাহ রেজিস্ট্রেশনের ভলিউম বা রেজিস্টার নিয়ে নেওয়া হতো। পরে সেটি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। এমনকি কোনো কাজি আইনগত কারণে বাল্যবিবাহ নিবন্ধনে অস্বীকৃতি জানালে পরবর্তী সময়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করে দেওয়ার ব্যবস্থা করার অভিযোগও রয়েছে। বিয়ে বন্ধের পর অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগ শুধু নিকাহ রেজিস্ট্রারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিয়ের আয়োজন করা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিবারের দাবী,কোনো এলাকায় বিয়ের খবর পেলে সেখানে লোক মারফত খবর নেওয়া হয়। মেয়ে কিংবা ছেলের বয়স কম হলেই বিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ওই পরিবারের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সেসব বিয়ে করানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীরা বলছেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আদায় বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মেহেদী হাসান আশিকের নেতৃত্বাধীন শ্রীপুর উপজেলা নারী ও শিশু কল্যাণ সমিতির সরকারি অনুমোদন, নিবন্ধন ও আর্থিক কার্যক্রমও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের প্রশ্ন, একটি বেসরকারি সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি কতটুকু প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কোনো আইনগত সুযোগ আছে কি না।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন আশিক।
ইউএনও, এসিল্যান্ড, মেয়রসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—এমন পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে তিনটি মূল দাবি জানানো হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সরকারি কমিটি বা প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি যাতে নিকাহ রেজিস্ট্রার কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
শ্রীপুরের লোহাগাছ গ্রামের গুচ্ছগ্রাম এলাকার বাসিন্দা আল আমিন বলেন, কিছুদিন আগেও হেলিপ্যাড মাঠের পূর্ব পাশে প্রথমে একটি বিয়ে বন্ধ করে পরে ৩০ হাজার টাকা নেয় বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ কমিটি। কাউকে জানালে মোবাইল কোর্টে জেলের হুমকি দেওয়া হয়।’
শ্রীপুরের গণমাধ্যমকর্মী আশরাফুল ইসলাম বলেন,’ অনেক ক্ষেত্রে পাত্রীর কথিত প্রেমিক কিংবা ইভটিজার পক্ষ বিয়ে বন্ধ করার জন্য বাল্য বিয়ের কমিটির ওই সদস্যকে কন্ট্রাক করে। অর্থ দিলেও মেয়েটি নিজে বিয়েতে সম্মত ছিল। তারপরও অর্থের বিনিময়ে বিয়ে বন্ধ করা হয়।’
শ্রীপুর উপজেলা সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন,’প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
তদন্ত কমিটির প্রধান ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন আহমেদ বলেন,’ তদন্ত কাজ চলমান। এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারবো।’
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত আশিক মুঠোফোনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো মিথ্যা দাবী করেন। পরে দু’একটা ঘটনা উল্লেখ করা হলে সেগুলো নিয়ে পরে দেখা করে কথা বলবেন বলে জানান।
শ্রীপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নাহিদ ভূঞা বলেন,’ অভিযোগ পেয়ে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
Leave a Reply