কক্সবাজার শহরে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে কার্যালয় চালু করে উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে “সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা” নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গেল মঙ্গলবার থেকে কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। সদর উপজেলা ও পৌরসভার প্রায় শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর বাসার মালিক মোশাররফ হায়দার প্রতিষ্ঠানের দুই কর্ণধার পরিচয়দানকারী আবদুর রহমান ও নুরুল আমিনের নাম উল্লেখ করে সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন। তাঁদের মধ্যে এ আবদুর রহমানের ঠিকানা দেখানো হয়, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ ও নুরুল আমিনের ঠিকানা গাজিপুর।
গেল মঙ্গলবার ( ১২ মে ) শহরের একটি আবাসিক হোটেলে জরুরি সভা রয়েছে জানিয়ে চলে যান আবদুর রহমান ও নুরুল আমিন। এরপর থেকে কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। ওইদিনের পর তারা দুজনেই কার্যালয়ে আসেনি। তাঁদের দুজনের ব্যবহ্ত মোবাইলও বন্ধ। এখনও পর্যন্ত তাঁদের দু’টি নাম্বার বন্ধ।
জানা যায়, চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে পৌরসভার সাবমেরিন কেবল এলাকার চৌধুরী পাড়ায় একটি বাসা ভাড়া নেয়। পরে “সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা” কক্সবাজার সদর শাখা নামে একটি সাইনবোর্ড দেওয়া হয়। অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে গ্রাহকের খুঁজে বিভিন্ন ওয়ার্ডের গিয়ে মহিলাদের সাথে কথা বলেন তারা। মাত্র ২০ হাজার টাকা প্রথম কিস্তি দিয়ে ২ লাখ টাকা নেওয়া যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কলাতলী, খুরুশকুল, লিংক রোড, পিএম খালী পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রায় শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিজন গ্রাহক থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে শুরু ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন।
বাসার মালিকের সাথে অগ্রিম বাবদ কোন লেনদেন না করে বুধবার ( ১৩ মে ) চুক্তিপত্র সম্পাদন করার কথা। কিন্তু এর একদিন আগেই গ্রাহকের ৩০ লাখ টাকা নিয়ে ছটকে পড়েন প্রতারক চক্র। অফিসে তালা বন্ধের কথা জানাজানি কথিত অফিসের সামনে জড়ো হয় অনেক নারি। তারা সেখানে বাসার মালিকের কাছ থেকে দু’জন ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। এক পর্যায়ে ওই নারিরা সেখানে কয়েক ঘন্টা অবস্থান নেয়। এ খবর জানার পর গেল বুধবার সন্ধ্যার পর খুরুশকুল ডেইল পাড়া এলাকায় যায় প্রতিবেদক। কথা হয় একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে।
মর্জিনা আক্তার বলেন, আমাকে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। অধিক মুনাফার কথা বলে গ্রাহক সংগ্রহ করতে বলেন। ৫ জন নারির কাছ থেকে ৬২ হাজার টাকা শাখা ব্যবস্থাপক পরিচয়দানকারী নুরুল আমিনের হাতে দিই। খুরুশকুল ২ নং ওয়ার্ড থেকে ১২ জনের কাছ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়েছে। এছাড়া আমার জানামতে লিংক রোড, আলির জাহাল খুরুশকুল এলাকা থেকে অন্তত কম হলে-ও ১৫ লাখ নিয়েছে।
পিএমখালি ৩ নং ওয়ার্ডের ভুক্তভোগী নারী বুলবুল আক্তার বলেন, ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৭ কিস্তিতে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। একটি ফরমে হাতের দস্তখত নিয়ে আমার কাছ ১০ হাজার আমানত টাকা নিয়েছে। তাীা বলেছেন, দুই লাখ দিবেন। চব্বিশ মাস কিস্তি চালাতে হবে। এজন্য জামানত হিসেবে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে।
খুরুশকুল ডেইল পাড়া এলাকার রাবেয়া বলেন, আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। শুরুতে প্রতি লাখে দুই হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে। প্রতিমাসে সর্বোচ্চে ১ হাজার টাকা লভ্যাংশ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
পিএমখালি ৩ নং ওয়ার্ডের পরানির পাড়া এলাকার হোসনে আরা বেগম বলেন, গেল ১২ মে ( মঙ্গলবার ) আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেয়। ২০ হাজার টাকা দিলে ২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। দুই বছর সময়সীমা দেওয়া হয়। প্রতিমাসে ১০ হাজার করে কিস্তি চালু রাখতে বলে। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে তাঁদের নাম্বার বন্ধ। অফিসে গিয়ে দেখলাম দরজায় তালা দেওয়া।
লিংক রোড এলাকার, ঝিনুক, রুমানা, আফরোজা, হোসনে আরাসহ একাধিক ভোক্তভোগি নারীরা জানান, মাত্র তিনদিনের মাথায় তারা অন্তত গ্রাহকের ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তারা দুই বছরে ২৪ কিস্তির কথা বলে প্রতিজন গ্রাহক থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা জামানত হিসেবে নিয়েছেন। জামানত দেওয়ার পর দুই লাখ টাকা কিস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে অনেক নারীকে নিঃস্ব করে পালিয়ে গেছে। অনেকে গরু, ছাগল, জমানো টাকা ও স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন।
বাসার মালিক মোশাররফ হায়দার দৈনিক আমার সময়কে বলেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তারা একটি কক্ষ ভাড়া নেওয়ার কথা বলে। দুই মাসের বাসা ভাড়া বাবদ অগ্রিম টাকা চাইলে চুক্তির সাথে দিবেন বলে। কিছু টেবিল ও চেয়ার নিয়ে দুইদিন অফিস করেন। এই সময়ের মধ্যে তারা সকালে বের হয়ে বিকেলে ফিরতেন। গত বুধবার তাঁদের সাথে চুক্তি সম্পানের কথা ছিল। কিন্তু, মঙ্গলবার বিকেল থেকে তাঁদের মোবাইল নম্বর বন্ধ। চেয়ার টেবিলও তারা বাকিতে নিয়েছেন। এখন অনেক মহিলারা তাঁদের খোঁজে বাসায় আসছে। এরপরেই সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছি।
Leave a Reply