একটি ফোনকল, আতঙ্কিত পরিবার, আর শিশুকে বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে পাঠানো মুক্তিপণ, সব মিলিয়ে যেন বাস্তবের এক শিহরণ জাগানো অপহরণের গল্প। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই গল্পই ভেঙে পড়ে, বেরিয়ে আসে এক সাজানো নাটকের চাঞ্চল্যকর সত্য। আর সেই নাটকের মূল পরিকল্পনাকারী, শিশুটির নিজের বাবা।
গত ৮ এপ্রিল (বুধবার) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর থানাধীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর এলাকায় অবস্থিত দারুননাজাত কারিমিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও হেফজখানার পঞ্চম শ্রেণির ১০ বছর বয়সী ছাত্র সাদ্দাম খান হঠাৎ নিখোঁজ হয়। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, বিকেল ৫টার দিকে মাদ্রাসা থেকে বের হওয়ার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজের অল্প সময়ের মধ্যেই শিশুটির বাবার মোবাইল ফোনে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে শিশুটিকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
ছেলের প্রাণনাশের আশঙ্কায় দিশেহারা পরিবার দ্রুত বন্দর থানায় গেলে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। বরং কথিত অপহরণকারীর নম্বর ট্র্যাকিং করে একটি সম্ভাব্য অবস্থান জানিয়ে পরিবারকে দক্ষিণ মধ্যম পুলিশ ফাঁড়িতে পাঠানো হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানের জীবন বাঁচাতে তারা অপহরণকারীর দেওয়া বিকাশ নম্বরে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। এরপর প্রায় ৫ ঘণ্টা পর শিশুটি পরিবারের কাছে ফিরে আসে।
তবে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় অনুসন্ধানে। প্রতিবেদকের কাছে শিশুটির বাবা সাদ্দাম খানের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। মুক্তিপণ পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কখনো বন্ধুর মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কথা বলেন, আবার নির্দিষ্ট তথ্য দিতে গিয়ে বারবার বিভ্রান্তিকর উত্তর দেন।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সেই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে কোনো টাকা পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
একপর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শিশুটির বাবা ভেঙে পড়েন এবং সরাসরি স্বীকার করেন, পুরো অপহরণ নাটকটি তারই পরিকল্পনায় সাজানো। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় তার এক বন্ধু এবং ওই বন্ধুর এক নারী সহযোগীও যুক্ত ছিল।
এই স্বীকারোক্তির পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটি শিশুকে কেন্দ্র করে এমন পরিকল্পিত নাটক শুধু নৈতিক অবক্ষয়ের দৃষ্টান্তই নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এদিকে, ঘটনার শুরুতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। কেন তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ নেওয়া হয়নি, কেন দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ছিল না, এসব বিষয় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের সাজানো অপহরণ শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিভ্রান্ত করে না, বরং প্রকৃত বিপদের সময় মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে যত্রতত্র গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
Leave a Reply