শহীদ স. ম. আলাউদ্দীন ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন জননেতা, সমাজসেবক, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ এবং মহান মুক্তিযোদ্ধা। তার জীবন ছিল আদর্শ, সংগ্রাম, সাহস ও আত্মত্যাগের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি শুধু সাতক্ষীরা জেলার গর্ব ছিলেন না, ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।স. ম. আলাউদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ২৯ আগস্ট (বাংলা ১৩৫২ সালের ১৫ ভাদ্র) সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা মরহুম সৈয়দ আলী সরদার এবং মাতা সখিনা খাতুন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শিক্ষাজীবনের শুরু হয় মিঠাবাড়ি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৬২ সালে কলারোয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬৪ সালে সাতক্ষীরা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৭ সালে খুলনার বি.এল. কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে বাসস্থান ছিল সাতক্ষীরা শহরের উপকণ্ঠ কাটিয়ার লস্করপাড়ায়। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও দৃঢ়চেতা এই মানুষটি শিক্ষা ও মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে তুলেছিলেন তার ভবিষ্যতের নেতৃত্ব।শিক্ষা আন্দোলন ও রাজনীতির সূচনামাত্র মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র অবস্থায় তিনি অংশগ্রহণ করেন কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে। এটাই ছিল তার রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রদের এগারো দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের গণআন্দোলন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে তালা-কলারোয়া থেকে সর্বকনিষ্ঠ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময়েই তাঁর স্বপ্ন শুরু হয়-সাতক্ষীরাকে ঘিরে। ১৯৭২ সালে সংসদ সদস্যের পদ থেকে যে দুজন পদত্যাগ করেছিলেন তিনি ছিলেন তাদেরই একজন। যশোর সামরিক আদালত তার অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ৪০ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে। ৯ জন এমএনএ/এমপিএ সরাসরি যুদ্ধ করেন, তিনি তাদের অন্যতম। তার বীরত্ব মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সশস্ত্র অংশগ্রহণস. ম. আলাউদ্দিন ছিলেন একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকাংশ এমএনএ এবং এমপিএ ভারতে গিয়ে সংগঠন চালালেও স. ম. আলাউদ্দিন সরাসরি রণাঙ্গনে অংশ নেন। ৯নং সেক্টরের অধীনে তিনি যুদ্ধ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসিকতা ও অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) এম. এ জলিল তাঁর “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” বইয়ে।স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতি ও কর্মকাণ্ডস্বাধীনতার পরপরই তিনি জাসদে যোগ দেন এবং ১৯৮০ সালে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। তিনি তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রামী এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত। তিনি ছিলেন নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।কারাবরণ ও প্রতিবাদস্বাধীনতার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৬ সালের জুন পর্যন্ত খুলনা, ঢাকা ও যশোর কারাগারে ছিলেন। জেলখানার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি অনশন ধর্মঘটে অংশ নেন এবং অন্য নেতাদের সাথে একাধিকবার স্থানান্তরিত হন। এ সময় তার সাহসী ভূমিকা অন্য রাজবন্দীদেরও অনুপ্রাণিত করে।সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক কাজস. ম. আলাউদ্দীন ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। তিনি সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের পাশে নিজস্ব জমি দান করে নগরঘাটা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন, যা জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তকস. ম. আলাউদ্দিন ছিলেন আধুনিক, কর্মমুখী শিক্ষার স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ”। কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপদ্ধতি ছিল যুগান্তকারী:*ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা।*অষ্টম শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি পেশা নির্বাচন।*হাতে-কলমে কৃষি, মৎস্য, হস্তশিল্প, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি প্রশিক্ষণ।*শিক্ষার্থীরা নিজে আয় করবে, সঞ্চয় করবে।*স্নাতক শেষে নিজ উদ্যোগে কর্মসংস্থান গড়বে।এই পদ্ধতি ছিল আত্মনির্ভরশীল মানবসম্পদ তৈরির এক আধুনিক, দূরদর্শী কৌশল।উন্নয়ন দর্শন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাস. ম. আলাউদ্দিন ছিলেন সাতক্ষীরার এক নবজাগরণের পুরোধা। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেননি, বাস্তবায়নের পদক্ষেপও নিয়েছেন:১. শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান:*আলাউদ্দিন ফুড অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে বিস্কুট কারখানা স্থাপন করেন।*সহস্রাধিক যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।*ভোমরা স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা।*চেম্বার অব কমার্স ও বন্দর ব্যবহারকারি সমিতি প্রতিষ্ঠা।২. কৃষি ও সেচনীতি:*গুচ্ছ সেচ কোম্পানির ধারণা।*কৃষিকে শিল্প হিসেবে পরিগণনা।*জমি ও কৃষকের মালিকানা ভিত্তিক লাভ বণ্টন নীতি।৩. চিংড়ি চাষ ও পরিবেশ সংরক্ষণ:*নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ।*সুন্দরবন এলাকায় হ্যাচারি স্থাপনের প্রস্তাব।*পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সংরক্ষণ।*জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ রোধে কঠোর অবস্থান।৪. যোগাযোগ ও অবকাঠামো:*সাতক্ষীরা-যশোর-খুলনা
Leave a Reply