আকিদাগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত মুসলিম জাতিকে বিভক্ত করে দিয়েছে। ঐক্যবদ্ধ মুসলিম জাতি আজ ছিন্ন-ভিন্ন। ফিলিস্তিন, কাশ্মির, মিয়ানমার, ভারত, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞের শিকারে পরিণত হয়েছে! মুসলিম নর-নারী ও শিশুরা মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। ইসলামবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মুসলিম জাতি আজ বিভক্ত।
এজন্য মুসলমানরা নিজেরাই নিজেদের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে মহানবী রসূলে করিম (স) যদি জীবদ্দশায় থাকতেন, তাহলে তিনি কি করতেন? তিনি অবশ্যই এই বিভক্তি মিটিয়ে দিতেন। মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতেন। মুসলিম জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক, সংস্কৃতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতেন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে তুলে নিতেন। সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি নির্মূল করে দিতেন। মুসলিম জাতিকে মহানবীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঈদে মিলাদুন্নবী (স) উদযাপনের এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ সকলকে মহানবী রসুলে করিম (স) এর শাফায়াতের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার তৌফিক দান করুন।
অদ্য ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সোমবার, ঢাকা জেলার দোহার থানাধীন নুরুল্লাপুর পাক দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা ফকির হযরত শালাল শাহ (কু:ছে:আ:) এর বংশধর গদিনশীন পীর ফকির শাহ শাহীন শাহ চিশতীর সভাপতিত্বে ঈদে মিলাদুন্নবী (স) উদযাপন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় ফকির শাহ শাহীন শাহ চিশতী উপরোক্ত বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভার প্রধান অতিথি বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির মহাসচিব সুফি সাগর সামস্ ভার্চুয়াল্লি যুক্ত হয়ে বলেন, উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলমানরা স্বাধীন ছিল না। পরাধীন অবস্থায় উলামায়ে কিরামগণের পক্ষে স্বাধীনভাবে কিতাব প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। তাদেরকে শাসকদের ডিকটেশন অনুযায়ী কিতাব প্রণয়ন করতে হয়েছে। একারণে ৬৮০ খ্রীস্টাব্দের পর উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের শাসনামলে এবং ১৮৬৬ খ্রীস্টাব্দের পর ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে যেসব কিতাব রচনা করা হয়েছে, যে সব কিতাবে মহানবী রসূলে করিম (স) ও তাঁর আহলে বাইত এবং তাঁর আউলিয়াদের সম্মানহানীকর বিষয়সমূহ রয়েছে তা ওই কিতাবের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, বরং আলেম-উলামাদের জ্ঞান ও ইজমা-কিয়াস দ্বারা সংস্কার করতে হবে।
পক্ষান্তরে বিভিন্ন পীর-মাশ্বায়েখদের দরবারে শরীয়তবিরোধী যেসব কর্মকান্ড বিদ্যমান রয়েছে, সে সব বিষয়ে কুরআন-হাদিসের আলোকে সংস্কার করতে হবে। একপক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে গীবত না করে, বিদ্বেষ না ছড়িয়ে, উভয়ের বিরুদ্ধে উভয়ের ধর্মীয় যেসব বিষয়ে অভিযোগ কিংবা ভুল-ত্রুটি রয়েছে, তা লিপিবদ্ধ করে ক্রমান্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে উভয় পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ জাতি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএইচপি মহাসচিব বলেন, তৌহিদি জনতা পরিচয়ে একদল উগ্রপন্থী দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা ও ভাঙ্গচুর চালাচ্ছে। আমি এই ভাঙ্গচুরের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। মাজার ভেঙ্গে আপনারা কি করতে চান? দেশে একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আপনারা কি অন্তর্বর্তী সরকারের বুকে ছুড়ি চালাতে চান? এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত তরুণ বিপ্লবী ছাত্র-জনতার অর্জন কি নস্যাৎ করে দিতে চান? আপনারা কি পতিত স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার পথ সুগম করে দিতে চান? আপনাদের এই আত্মঘাতী কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার রাজনীতির মাঠে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আপনারা আর আইন নিজ হাতে তুলে নেবেন না। আমি বিনয়ের সঙ্গে মাজার ভাঙ্গার আত্মঘাতী কর্মকান্ড বন্ধ করার আহবান জানাচ্ছি।
মহানবী রসুলে করিম (স) ওপর দরুদ-সালাম পাঠ করে প্রধান বক্তা মাওলানা প্রফেসর ফজলে রাব্বি ফরহাদ বলেন, মিলাদুন্নবী ও সিরাতুন্নবী উদযাপনের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। মিলাদুন্নবী হলো, নবীর জন্মদিন উদযাপন আর সিরাতুন্নবী হলো, নবীর কর্মজীবন। প্রতিবছর নবীর জন্মদিনে ঈদ উৎসব করতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত নবীর কর্মময় জীবনকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হবে। শরীয়ত বা ইসলাম ধর্মের রীতি-নীতি হলো, ৩টি।
এক. ঈমান, দুই. ইসলাম ও তিন. ইহসান। ঈমান হলো, এমন এক ধরনের বিশ্বাস যাতে কোনো দ্বিধা-দ্ব›দ্ব কিংবা সন্দেহ নেই। ইসলাম বিভিন্ন মজহাব দ্বারা বিভক্ত। কিন্তু মূল ইসলামের কোনো দ্বিধা কিংবা বিভক্তি নেই। এই দ্বিধামুক্ত ইসলামকে ‘ইহসান’ বলা হয়। ইসলামের মূল বিষয় হলো, ‘অন্তর ক্রিয়া’। এই অন্তর ক্রিয়া দ্বিধা ও সন্দেহমুক্ত।
এই ইসলামের লক্ষ্য হলো, তাওহিদ ও তাওহিদের প্রকৃতি হলো, ‘তাকওয়া’। ইহসান হলো, মানব জাতির জন্য কল্যাণকর এবং পবিত্র। ইহসানের অপর নাম হলো, ‘কামালত ও বুজুর্গী’। ইহসান অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ঈমান, আমল, নামাজ, রোজা, ইবাদত-বন্দিগি বিশুদ্ধ হয় না। এ জন্য ইহসান হলো, ‘ফরযে ওয়াজিব’। নামাজ আদায়কারীর নামাজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয় কি হয় না, ইহসান অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নামাজীর মনের এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং সন্দেহ বিলুপ্ত হয়। ইবাদতকারী আল্লাহর সত্ত্বাকে নিজের মধ্যে অনুভব করেন। মহানবী রসুলে করিম (স) বলেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহর বন্দিগি করো, যেন তুমি আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করছ।
এ সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, ফকির হযরত শালাল শাহ (কু:ছে:আ:) এর বংশধর ফকির হযরত শাহ স¤্রাট চিশতী, ফকির হযরত শাহ সাইমন চিমতী ও মাওলানা আক্তারুজ্জামান। উপস্থিত ছিলেন, দরবার শরীফের ভক্ত আশেকান ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন, মাওলানা বাহার মুন্সি। আলোচনা সভাশেষে মিলাদ মাহফিল, মুনাজাত ও তবাররুখ বিতরণ করা হয়।
Leave a Reply