1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
সুন্দরবনের লবণাক্ততার ছোবলে উপকূলজুড়ে বিলুপ্তির পথে বাঁশঝাড় - দৈনিক আমার সময়

সুন্দরবনের লবণাক্ততার ছোবলে উপকূলজুড়ে বিলুপ্তির পথে বাঁশঝাড়

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
    প্রকাশিত : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলে জলবায়ুর প্রভাবে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাঁশ ঝাড় ‌। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট ‌,সাতক্ষীরা,খুলনা ,পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল ,বরগুনা ,পিরোজপুর ,ভোলা, চাঁদপুর ,লক্ষ্মীপুর ,ফেনী ,নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ও কক্সবাজার এই সমস্ত জেলাগুলো লবণাক্ততা এলাকায় হওয়ায় লবণ পানিতে পিপিটি মারাত্মক আকারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিলুপ্তির পথে বাঁশ গাছ ‌।
দিনের পর দিন হারিয়ে যাচ্ছে এই সমস্ত জেলার উপকূল থেকে বাঁশঝাড় ‍।গ্রামীণ জনপদ মানেই ঝোপঝাড়, জঙ্গল আর বাঁশঝাড়ে ঢেউ খেলানো সবুজ প্রকৃতি। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ঐতিহ্য গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ। কিন্তু বর্তমানে নির্বিচারে বাঁশ কাটা, দেখভাল ও পরিচর্যার অভাবে বাঁশঝাড় ক্রমশই কমে যাচ্ছে। উজাড় হচ্ছে প্রকৃদতির দুর্যোগ প্রতিরোধক ও পরিবেশের পরম বন্ধু বাঁশঝাড়। কালের বিবর্তনে ও নগরায়নের ফলে বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্পও।
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী তার ‘কাজলা দিদি’ কবিতায় বাঁশ বাগান নিয়ে লিখেছেন, বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই/মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই? কবিতাটিতে ‘বাঁশ বাগান’ নিয়ে গ্রামীণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে বাঁশ বাগানের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। গ্রামীণ প্রত্যেকটি জনপদে বাঁশ ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব দান। সেই বাঁশ আজ উজাড় হচ্ছে। প্রকৃতি হারাচ্ছে ভারসাম্য।
এক সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশঝাড় ছিল। বিভিন্ন পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকত এসব বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়কে বাড়ির পর্দা মনে করা হতো। যেখানে গ্রাম, সেখানে বাঁশঝাড়- এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া রোধ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এ বাঁশঝাড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঁশগাছ অন্য যে কোনো গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম। এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে। তাই বাঁশঝাড় টিকিয়ে রাখার তাগিদ দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বাঁশের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাঁশ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা। সম্মিলিত প্রচেষ্টার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের ব্যবহার। এক সময় চারপাশে পর্যাপ্ত বাঁশের ঝাড় দেখা গেলেও বর্তমানে অনেক জেলায় তা বিলুপ্তির পথে।
গ্রামীন জনগোষ্ঠীর কাছে বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। ধানের গোলা তৈরি, বেড়া বা ঘর নির্মাণ, মঞ্চ নির্মাণ, মই, জোয়াল, ঝুড়ি, ঝাকা, চালুন, খাঁচা, পাটি, খাড়ি, ঝাড়ু, কুলা, হাতপাখা, মাদুর, বাঁশের দোচালা ও চারচালা ঘর, ঘরের খুঁটি, ঘরের ঝাপ, বেলকি, ঘরের মাচা, ঘরের আসবাব হিসেবে মোড়া, চাটাই, সোফা, বুকসেলফ, ছাইদানি, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, সিগারেট রাখার ছাইদানি, নুনদানি, পানদানি, চুনদানি ইত্যাদিসহ নিত্যদিনের ব্যবহার্য বিবিধ জিনিসপত্র তৈরির কাজে বাঁশের রয়েছে বহুল ব্যবহার। গ্রামের প্রতিটি কৃষক তার ফসলের ক্ষেতে বাঁশের বেড়া দিয়ে ফসল রক্ষা করত। আদিকাল থেকেই বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার চলে আসছে।
বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন রকম পণ্য (যেমন- প্লাইবোর্ড, পার্টিকেল বোর্ডসহ গৃহস্থালির আসবাবপত্র) তৈরি করা হচ্ছে। বাঁশ দিয়ে রকমারি আসবাবপত্র (যেমন- সোফা, চেয়ার, টেবিল, খাট, ওয়্যারড্রব) তৈরি করে কাঠের চাহিদা পূরণ করা হয়। বাঁশের তৈরি এসব আসবাবপত্র ও শৌখিন গৃহসামগ্রী বিদেশেও রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে। তাছাড়া মুলি বাঁশ দিয়ে গ্রামীণ জনপদে বাড়িঘর নির্মাণ, বাড়ির বেড়া, সিলিং তৈরি ও বাঁশের বেত দিয়ে চাটাই তৈরি করে ঘরের পার্টিশন দেয়া হয়। বাজালি বাঁশ দিয়ে বাঁশি তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশের বাঁশির কদর যুগ যুগ ধরেই শিল্পী সমাজে সমাদৃত হয়ে আসছে। শক্ত প্রকৃতির বরাগ বাঁশ দিয়ে বাড়িঘরের খুঁটি, সাঁকো নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়।
দেশের প্রায় অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে এক সময় তৈরি হতো হাজারো বাঁশের পণ্যসামগ্রী। ঘরের কাছের ঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ কেটে গৃহিণীরা তৈরি করতেন হরেক রকম জিনিস। অনেকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু বাঁশঝাড় নির্বিচারে কেটে ফেলার কারণে বর্তমানে প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য আর গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্য কুটির শিল্প আজ হারিয়ে যাচ্ছে। আগের মতো পর্যাপ্ত বাঁশ না থাকায় দিন দিন বেকার হয়ে পড়ছে কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলো। বাঁশের দরদাম অধিক হওয়ায় তারা কুটির শিল্পসামগ্রী বানাতে বিপাকে পড়ছেন।
প্রতিটি জনপদে আগের মতো আর বাঁশঝাড় নেই। কারণে-অকারণে কাটা হচ্ছে বাঁশ। শীতল ছায়া ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাঁশঝাড় না কেটে বেশি করে বাঁশ লাগানোর ওপর জোর দেয়া চাই।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com