1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
রাষ্ট্রের চোখ বন্ধ, আঙুলের ছোঁয়ায় হারাচ্ছে আস্থা - দৈনিক আমার সময়

রাষ্ট্রের চোখ বন্ধ, আঙুলের ছোঁয়ায় হারাচ্ছে আস্থা

মোঃ নজরুল ইসলাম
    প্রকাশিত : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আজ এক গভীর আস্থার সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। টাকা আর কাগজে নয়—ঘুরছে আঙুলের ছোঁয়ায়। বিকাশ, নগদ, রকেট, ব্যাংক ট্রান্সফার—সব মিলিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই টাকার কতটা বৈধ, কতটা রাষ্ট্রের নজরে?
বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্র জানে না, টাকাটা কোথা থেকে এলো, কার হাতে গেল, কী উদ্দেশ্যে গেল। একদিকে সাধারণ মানুষ কর দেয়, ব্যাংকে টাকা রাখে, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে; অন্যদিকে সেই অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডি, অবৈধ রেমিট্যান্স, ঋণ খেলাপি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রশ্নটি তাই আবেগী হলেও বাস্তব—রাষ্ট্র যাদের উপর আস্থা রাখতে পারছে না, তাদের উপর জনগণ কেন আস্থা রাখবে?
বায়োমেট্রিক লেনদেন ও KYC: আইন ও মামলার আলোকে বর্তমানে বাংলাদেশে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের KYC নির্দেশনা বিদ্যমান। কিন্তু উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে (বিশেষত অর্থপাচার সংক্রান্ত রিট মামলাগুলোতে) বারবার বলা হয়েছে—আইন থাকাই যথেষ্ট নয়, কার্যকর প্রয়োগই মূল।
মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকিং লেনদেনে প্রেরক-প্রাপকের এনআইডি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট বাধ্যতামূলক করা হলে এটি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের (যাতায়াতের স্বাধীনতা) পরিপন্থী নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণ হিসেবে গণ্য হবে—যেমনটি উচ্চ আদালত বিভিন্ন আর্থিক নিয়ন্ত্রণমূলক মামলায় বলেছেন।
জনগণের দৃষ্টিতে এটি শুধু প্রযুক্তি নয়—এটি আস্থার প্রশ্ন। একজন দিনমজুর যখন বিকাশে টাকা পাঠান, তিনি চান না সেই ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে কেউ কোটি টাকা পাচার করুক।
________________________________________
রাষ্ট্রের চোখ বন্ধ, আঙুল খোলা
বাংলাদেশে আজ ডিজিটাল লেনদেন একটি বাস্তবতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) দিয়েই প্রতিদিন গড়ে ২,৫০০–৩,০০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, RTGS, BEFTN ও কার্ড ট্রান্স্যাকশন। অথচ এই বিপুল অঙ্কের অর্থের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা এখনো খণ্ডিত, প্রতিক্রিয়াশীল ও অনেক ক্ষেত্রে কাগুজে।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন রয়েছে, ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) রয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতটা কার্যকর? সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে বলেছেন, অর্থপাচার শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ। তারপরও বাস্তবে দেখা যায়—হুন্ডি চক্র সক্রিয়, অবৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহমান, আর বড় অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
হুন্ডি: রাষ্ট্রের বাইরে আরেক রাষ্ট্র
হুন্ডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থা। প্রবাসী শ্রমিক ঘাম ঝরিয়ে টাকা পাঠান, কিন্তু বৈধ চ্যানেলের চেয়ে হুন্ডিতে বেশি টাকা পাওয়ার লোভে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে আসে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বছরে ১৫–২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হতে পারে—যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে মন্তব্য করেছেন, “হুন্ডি কার্যত রাষ্ট্রের আর্থিক শিরায় বিষ ঢালার মতো।” কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিষ ঢালার পথগুলো কে বন্ধ করবে? আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; নজরদারি আছে, কিন্তু জবাবদিহি নেই।
KYC: কাগজে শক্ত, বাস্তবে দুর্বল
Know Your Customer (KYC) নীতিমালা বাংলাদেশের ব্যাংক ও MFS–এর জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে KYC অনেক সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে ফরমালিটি। ভুয়া এনআইডি, অন্যের সিম, একাধিক অ্যাকাউন্ট—সবই চলছে প্রকাশ্যেই। উচ্চ আদালত একাধিক রিট মামলায় পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, KYC–এর নামে যদি চোখ বুজে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, তবে সেটি আইনের সঙ্গে প্রতারণা।
বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন—ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও এনআইডি—ব্যবহার করলে এই ফাঁক অনেকটাই বন্ধ করা সম্ভব। এটি কোনো মৌলিক অধিকারের হরণ নয়; বরং সংবিধানের ১৫ ও ২০ অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ।
“গোপনীয়তা” বনাম “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা”—ভ্রান্ত বিতর্ক
অনেকে বলেন, বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক করলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা স্পষ্ট—যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করতে পারে, যদি তা বৃহত্তর জনস্বার্থে হয়। ব্যাংকিং লেনদেন কোনো ব্যক্তিগত ডায়েরি নয়; এটি একটি নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
যে দেশে ভোট দিতে আঙুলের ছাপ লাগে, পাসপোর্ট করতে লাগে, সিম নিতে লাগে—সেই দেশে কোটি কোটি টাকার লেনদেনে বায়োমেট্রিক চাওয়া কি অযৌক্তিক?
দিনমজুরের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের উত্তর কোথায়?
একজন দিনমজুর বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠান—তার জন্য KYC, সীমা, চার্জ সব আছে। অথচ কোটি টাকা কয়েক মিনিটে ঘুরে যায়—রাষ্ট্র জানে না, প্রশ্ন করে না। এখানেই আস্থার ভাঙন। সাধারণ মানুষ ভাবে, “আইন কি শুধু আমাদের জন্য?”
এই অনুভূতিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে আস্থার উপর, শুধু পুলিশের উপর নয়।
সুপ্রিম কোর্টের সতর্কবার্তা: কাগজে আইন, বাস্তবে নীরবতা
অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলাগুলোতে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট ডিভিশন বারবার বলেছেন—আইন প্রয়োগে গাফিলতি হলে সেটি নিজেই অসাংবিধানিক আচরণে পরিণত হয়। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, সন্দেহজনক লেনদেনে রিয়েল-টাইম মনিটরিং, আন্তঃসংস্থাগত তথ্য আদান-প্রদান ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। বড় অপরাধীরা প্রভাবশালী, তদন্ত দীর্ঘসূত্রতা, মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে আইনের ভীতি নয়, জন্ম নেয় আইনের প্রতি অবজ্ঞা।
পথ কোনটি?
সমাধান অসম্ভব নয়—
১. সব MFS ও ব্যাংকিং লেনদেনে শক্তিশালী বায়োমেট্রিক KYC
২. এক ব্যক্তি–একাধিক অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ
৩. BFIU–এর ক্ষমতা ও স্বাধীনতা বৃদ্ধি
৪. সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন
৫. ছোট গ্রাহক নয়, বড় অর্থপ্রবাহে অগ্রাধিকারভিত্তিক নজরদারি
শেষ কথা: রাষ্ট্র কি তার জনগণের পাশে দাঁড়াবে?
এই লেখা কোনো প্রযুক্তিবিরোধী আর্তনাদ নয়, এটি একটি দেশপ্রেমিক দাবি। রাষ্ট্র যদি তার অর্থনৈতিক শিরায় অবাধে রক্তক্ষরণ হতে দেয়, তবে একদিন সেই রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়বেই।
জনগণ রাষ্ট্রকে শত্রু ভাবে না। তারা শুধু চায়—আইন যেন সবার জন্য সমান হয়। আঙুলের ছোঁয়ায় টাকা ঘুরুক, কিন্তু রাষ্ট্রের চোখ যেন বন্ধ না থাকে।
কারণ আস্থা হারালে শুধু টাকা নয়—রাষ্ট্রও হারিয়ে যায়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com