বিভাগীয় শহর রংপুরের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল, সড়কের ওপর পণ্য প্রদর্শন এবং যত্রতত্র মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। নগরীর জাহাজ কোম্পানির মোড়, বেতপট্টি রোড, সিটি বাজারসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা এবং সড়কের একাংশে মোটরসাইকেল পার্কিং এখন নিত্যদিনের দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জাহাজ কোম্পানির মোড় থেকে বেতপট্টি রোড এবং সিটি বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে দোকানিরা ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়কের ওপর প্লাস্টিক সামগ্রী, বালতি, হার্ডওয়্যার পণ্য, মাছ ধরার জাল, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য সাজিয়ে বিক্রি করছেন। কোথাও কোথাও টিনের ছাউনি ও অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করে দোকানের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। এতে ফুটপাত প্রায় সম্পূর্ণভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত যানবাহনের চাপের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন,
“প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করতে হয়। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে গাড়ির ফাঁক দিয়ে চলতে হয়। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
নারী পথচারী শিউলি বেগম বলেন,
“শিশুকে নিয়ে হাঁটা খুবই কষ্টকর। মোটরসাইকেল আর দোকানের মালামালে ফুটপাত বন্ধ থাকে। বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়।”
রিকশাচালক রহিম মিয়া বলেন,
“দোকান আর মোটরসাইকেলের কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। যানজট লেগেই থাকে। যাত্রী নিয়ে চলতে গেলে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়।”
শুধু ফুটপাত দখলই নয়, সড়কের দুই পাশে এবং কোথাও কোথাও মাঝামাঝি অংশেও সারিবদ্ধভাবে মোটরসাইকেল পার্কিং করায় যান চলাচল আরও ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা রাস্তার ওপরই মোটরসাইকেল রেখে যাচ্ছেন। এতে রিকশা, অটোরিকশা, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবার যানবাহনও চলাচলে বাধার মুখে পড়ছে।
একজন মোটরসাইকেল আরোহী বলেন,
“এখানে নির্দিষ্ট কোনো পার্কিং নেই। বাধ্য হয়েই রাস্তার পাশে মোটরসাইকেল রাখতে হয়। প্রশাসন পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করলে আমরা অবশ্যই সেখানে রাখব।”
এদিকে বিভিন্ন স্থানে ঝুলে থাকা জরাজীর্ণ বৈদ্যুতিক তারের জটলা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ী আবু তালেব বলেন,
“এত তার ঝুলে আছে যে কখন শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লাগে, বলা যায় না। এই এলাকায় অগ্নিকাণ্ড হলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকাও কঠিন হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ে সময়েই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। কয়েক ঘণ্টা কিংবা এক-দুই দিনের মধ্যেই আবার ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়ে যাচ্ছে।
সচেতন নাগরিক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন,
“শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, নিয়মিত তদারকি, নির্ধারিত পার্কিং জোন এবং ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল বিভাগীয় শহর হিসেবে রংপুরে সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং নির্ধারিত পার্কিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। অন্যথায় যানজট, দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
নগরবাসীর দাবি, রংপুর সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সমন্বিতভাবে নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্থায়ী পার্কিং ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করলে নগরীর চলাচল ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
Leave a Reply