1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়: উত্তরণের সহজ সমীকরণ - দৈনিক আমার সময়

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়: উত্তরণের সহজ সমীকরণ

আলামীন, রংপুর
    প্রকাশিত : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
শিক্ষার মানোন্নয়নে অনলাইন আসক্তি কমিয়ে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান ও মৌলিক শিক্ষার বিকল্প নেই
লেখক: এম আলমগীর কবির
প্রভাষক
আরসিসিআই পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নতুন করে উদ্বেগের বার্তা দিয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে সারা দেশে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জাতীয় পর্যায়ে ফলাফলের এই অবনতি নিছক পরিসংখ্যান নয়; বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পাঠদান, মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বাস্তব চিত্র নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল আরও উদ্বেগজনক। এ বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৭৮৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৩৯৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯৫৩ জন। গত সাত-আট বছরের মধ্যে এবারই বোর্ডটির পাসের হার সর্বনিম্ন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বোর্ডের অধীন ৬৬৮টি কলেজের মধ্যে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এই পরিসংখ্যান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠদানের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে যথাযথ নিয়ম অনুসরণের বিষয়ে পরীক্ষকদের প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা ছিল। ফলে আগের তুলনায় মূল্যায়নে শিথিলতার সুযোগ কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফলাফল বিপর্যয়ের দায় কেবল শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না। বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
ইংরেজি ও আইসিটিতে দুর্বলতা, কোথায় ঘাটতি?
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। বিশেষ করে ইংরেজিতে ব্যর্থতার পেছনে মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতি, না বুঝে উত্তর লেখার প্রবণতা এবং সিলেবাসের পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিমত।
২০১৯ সালের পর এবারই প্রথম ইংরেজি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেনি। ফলে পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পরীক্ষার পরিবেশে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরীক্ষার পরিবেশের পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতিতে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, সেটিও গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে নজরদারিকেই ফলাফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংকট আরও প্রকট
ফলাফলের অবনতি বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি দৃশ্যমান। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক কলেজে পাসের হার ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন জেলাগুলোর ফলাফলেও বৈষম্যের চিত্র পাওয়া যায়। রংপুরে পাসের হার ৫৬, নীলফামারীতে ৪৯, লালমনিরহাটে ৪৬, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৫, দিনাজপুরে ৪৩, কুড়িগ্রামে ৪০, গাইবান্ধায় ৩৮ এবং পঞ্চগড়ে ৩৬ শতাংশ।
এই বৈষম্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুযোগ, দক্ষ শিক্ষক, পাঠদানের পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের সমতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
অনলাইন আসক্তি কি শিক্ষার পথে বড় বাধা?
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে। অনলাইন ক্লাস, ভিডিও লেকচার ও ডিজিটাল কোর্সের ইতিবাচক দিক থাকলেও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে তা পড়াশোনার পরিবর্তে মনোযোগ বিচ্যুতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাসকে ব্যাহত করছে। একজন শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে পড়তে বসে কখন যে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করছে, তা অনেক সময় নিজেও বুঝতে পারে না। ফলে পড়াশোনার জন্য বরাদ্দ সময়ের বড় অংশ অনর্থক কাজে চলে যাচ্ছে।
এ ছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অনেক শিক্ষার্থী কম মূল্যের বিভিন্ন প্যাকেজ ও শর্টকাট কোর্সের ওপর নির্ভর করছে। ইংরেজির মতো মৌলিক দক্ষতানির্ভর বিষয়ে বেসিক জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে সুপার শর্টকোর্স ও সাজেশননির্ভর প্রস্তুতি দীর্ঘমেয়াদে দুর্বলতা তৈরি করছে। পরীক্ষায় নতুন ধরনের প্রশ্ন কিংবা সিলেবাসের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু সামনে এলে তখন সেই দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে।
অন্যদিকে, অনেক কলেজে আইসিটি বিষয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক—দুই ক্ষেত্রেই কাঠামোগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কলেজবিমুখতা ও প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও শিক্ষাবান্ধব করে তুলতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে কলেজে নিয়মিত পাঠদানের চেয়ে প্রাইভেট ও কোচিংনির্ভর শিক্ষার প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত ক্লাস কিংবা কোচিংয়ের চাপ শিক্ষার্থীদের কলেজের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
একজন শিক্ষার্থী যদি কলেজের শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পাঠদান না পায়, তাহলে তার মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠ পরিকল্পনা, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
উত্তরণের সহজ সমীকরণ কী?
এই ফলাফল বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শিক্ষার্থীদের অনলাইননির্ভরতা কমিয়ে পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও শিক্ষাবান্ধব ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইংরেজি ও আইসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান অর্জনের ওপর জোর দিতে হবে। শর্টকাট পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়মিত অনুশীলন, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কলেজগুলোতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত মডেল টেস্ট, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং বিশেষ সহায়ক ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে যারা ইংরেজি ও আইসিটিতে দুর্বল, তাদের জন্য আলাদা শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
পঞ্চমত, অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে এবং নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না, সেদিকে নজর দিতে হবে।
ষষ্ঠত, শিক্ষা প্রশাসনকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর নয়, সারা বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
শেষ কথা
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। পরীক্ষার ফলাফল ভালো করার জন্য শুধু পরীক্ষার আগে সাজেশন, কোচিং কিংবা অনলাইন প্যাকেজের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং মৌলিক জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ তৈরি করতে হবে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ফলাফলকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত ও সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রশাসন—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনলাইন প্রযুক্তি হবে শিক্ষার সহায়ক, বিকল্প নয়; শ্রেণিকক্ষ হবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, আর পাঠ্যবই হবে মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি। আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের সহজ সমীকরণ আসলে এখানেই।
লেখক: এম আলমগীর কবির
প্রভাষক
আরসিসিআই পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com