চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে দেশের শিল্প খাতে এক নতুন ও ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও গণচীন সরকারের (জি-টু-জি) যৌথ উদ্যোগে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর নীতিমালার আলোকে গৃহীত এই প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈচিত্র্যময় শিল্পায়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সহজীকরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই অংশ হিসেবে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে সরকারের নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ও সহজ সেবা নিশ্চিত করতে সরকার খুব শিগগিরই শতভাগ কার্যকর সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস চালু করবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার ও মূলধনী খাতে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের আবাসন, আধুনিক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, সাপ্লাই চেইন শক্তিশালীকরণ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে একটি আধুনিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি চীনা অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আজ আনোয়ারার এই উর্বর মাটিতে সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমরা কেবল এক কোদাল মাটিই তুলছি না, বরং বাংলাদেশের শিল্প রূপান্তরের এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা করছি। তিনি বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস, গভীর বন্ধুত্ব এবং যৌথ সহযোগিতার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত এই জি-টু-জি প্রকল্প বাংলাদেশ-চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি জানান, প্রায় ৭৭৬ একর (৩১৪.৩৯ হেক্টর) এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এই বৃহৎ শিল্পাঞ্চলের মাধ্যমে শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা স্থানীয় যুবসমাজের কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের পাশাপাশি এখানে বায়ো-ফার্মাসিউটিক্যালস, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রসেসিং এবং চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী উচ্চ-মূল্যের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যা দেশের রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী করবে।
ভৌগোলিক ও লজিস্টিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিইআইজেড কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র ৭০০ মিটার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এছাড়া জাতীয় মহাসড়ক এন-১-এর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় পণ্য পরিবহন হবে সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এখানে আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যা টেকসই শিল্পায়নের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সিইআইজেড-এর সার্বিক নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন করিডোর এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। একই সঙ্গে বেজা-এর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস)-এর মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেজা, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি), ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস এবং বিশেষ করে আনোয়ারা ও চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সিইআইজেড বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের একটি স্থায়ী ও টেকসই সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন (Yao Wen), চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সারোয়ার জামাল নিজাম, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান লি চ্যাংগুই (Li Changgui) এবং Bangladesh CEIZ Company Ltd (BCCL)-এর চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান (Wang Benqian) স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply