দেশের সর্ব দক্ষিণে সমুদ্র নগরী পর্যটন জেলা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ঢেউ ঝুঁকির মাঝেও ভ্রমণপিপাসুদের উচ্ছ্বাস। ঢেউ বৈরী আবহাওয়া আর উত্তাল সাগরকে উপেক্ষা করে দেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে শুক্রবার (৮ আগস্ট) উপচে পড়া ভিড় জমিয়েছেন হাজারো পর্যটক। সাপ্তাহিক ছুটিকে ঘিরে ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত ভ্রমণপিপাসুরা সমুদ্রস্নান, বৃষ্টিভেজা বালিয়াড়ি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মেতে উঠেছেন।
সকালের দিকেই সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ভিড় জমতে শুরু করে। বৈরী আবহাওয়ায় সাগর ছিল বেশ উত্তাল, থেমে থেমে হয়েছে বৃষ্টি। কিন্তু প্রকৃতির এমন বৈরীতাও দমিয়ে রাখতে পারেনি পর্যটকদের উচ্ছ্বাস।
ঢাকার মতিঝিল থেকে পরিবারসহ কক্সবাজার ঘুরতে আসা পর্যটক ইব্রাহীম কাদের বলেন, “চমৎকার একটা আবহাওয়া! বৃষ্টির মধ্যে বড় বড় ঢেউ-এমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সবসময় হয় না। তাই আমরা ১০ জন মিলে আজ সাগরপাড়ে দারুণ সময় কাটাচ্ছি।”
আরেক পর্যটক সুমাইয়া ইয়াছমিন বলেন, “এই বৃষ্টিতে কক্সবাজার এসে মনে হচ্ছে স্বপ্নপূরণ হয়েছে। বালিয়াড়িতে ছুটোছুটি করছি, আবার সাগরের পানিতেও নেমেছি। খুবই মজা লাগছে।”
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, কিন্তু মানা হচ্ছে না সতর্কতা
বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রস্নানে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সৈকতের প্রতিটি পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি লাইফ গার্ড কর্মীরা মাইকিংয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের সতর্ক করছেন। তবুও অনেক পর্যটকই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ ঢেউয়ের মাঝে নামছেন।
‘সী-সেফ লাইফ গার্ড’ সংস্থার টিম লিডার মোহাম্মদ ওসমান বলেন, “সাগর গত কয়েকদিন ধরেই উত্তাল। প্রতিটি পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে, এবার পতাকার মাঝখানে বিপদজনক এলাকা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও বহু পর্যটক নির্দেশনা মানছেন না।”
তিনি জানান, প্রতিটি পয়েন্টে টাওয়ার থেকে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি লাইফ গার্ড সদস্যরা সরাসরি সাগরে নেমে পর্যটকদের সতর্ক করছেন, বালিয়াড়িতে টহল ও মাইকিংও অব্যাহত রয়েছে।
সিলেট থেকে আসা পর্যটক রায়হান উদ্দিন বলেন, “প্রশাসন চেষ্টা করছে, কিন্তু আমরা অনেকেই সেটি মানছি না। এখানে এসে যেন সতর্কতা ভুলে যাই। তবে বিপদ যে কোনো সময় আসতে পারে, তাই সাবধান থাকা উচিত।”
একই মত প্রকাশ করেন পর্যটক ছৈয়দুল আমিন। তিনি বলেন, “সাগরের ঢেউ অনেক বড়। ভয় করছে। কিছুক্ষণ দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেব, গোসল করব কিনা।”
পর্যটকদের ভিড়, জমে উঠেছে স্থানীয় ব্যবসা
সৈকতে পর্যটকদের এমন ঢলের প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের হোটেল মোটেল জোন এলাকাসহ শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকায়। হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউজগুলোতে দেখা যাচ্ছে পর্যটকদের নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ব্যস্ততা। জনপ্রিয় রেস্তোরাঁগুলোতে পর্যটকদের ভিড়, চারপাশে জমজমাট কেনাকাটা, বিচ বাইক, ঘোড়ার পিঠে চড়া ও ফটোগ্রাফির ধুম-সব মিলিয়ে যেন উৎসবের আমেজ।
সুগন্ধা পয়েন্টে বার্মিজ পণ্যের দোকানদার আব্দু সালাম বলেন, “যখন পর্যটক আসে তখনই আমাদের আয় হয়। আজ সকাল থেকেই বেচাবিক্রি ভালো যাচ্ছে। এমন হলে অন্তত কিছু দিন ভালোভাবে চলতে পারব।”
শুটকি পল্লি থেকে শুরু করে শামুক-ঝিনুক বিক্রেতা, হকার, জেট স্কী চালক, বিচ বাইক চালক, ফটোগ্রাফারসহ স্থানীয় কর্মজীবীরা খুশি পর্যটকদের আগমনে।
আনন্দের সঙ্গে চাই সচেতনতা
‘সী-সেফ লাইফ গার্ড’ সংস্থার টিম লিডার মোহাম্মদ ওসমান বলেন, “বৃষ্টিভেজা ছুটির দিন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর উত্তাল ঢেউ-সব কিছু মিলিয়ে কক্সবাজারে ছিল প্রাণবন্ত পরিবেশ। তবে এই আনন্দে যেন কোনো বিপদ ছায়া না ফেলে, সেজন্য প্রয়োজন আরও বেশি সচেতনতা।”
প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পর্যটকদেরও উচিত লাইফ গার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলা। এক মুহূর্তের অসতর্কতা হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনার কারণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ-ঝুঁকি উপেক্ষা করে কক্সবাজারে যে পর্যটকদের ঢল নেমেছে, তা যেমন প্রমাণ করে সমুদ্রের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা, তেমনি মনে করিয়ে দেয়-ভালোবাসা যত গভীরই হোক না কেন, তাতে মিশে থাকতে হবে দায়িত্ববোধ আর সচেতনতা।
Leave a Reply