1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
রেলওয়ের অঘোষিত সম্রাট বেলাল ওএসডিঃ চেয়ার ফিরে পেতে মন্ত্রীর দুয়ারে তদবির - দৈনিক আমার সময়

রেলওয়ের অঘোষিত সম্রাট বেলাল ওএসডিঃ চেয়ার ফিরে পেতে মন্ত্রীর দুয়ারে তদবির

‎জাকারিয়া হোসেন, চট্টগ্রাম
    প্রকাশিত : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের অঙ্গনে বহুল আলোচিত নাম প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) বেলাল হোসেন সরকার। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে তার একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা। অনেকের কাছে রেলওয়ে দপ্তর যেন বেলাল সরকার দপ্তর হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

‎দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট, এমন অসংখ্য অভিযোগ এবং দুদকের মামলা থাকা সত্ত্বেও বেলাল হোসেন সরকার বহাল তবিয়তেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। একাধিকবার সাময়িক বরখাস্ত হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় স্বপদে ফিরে আসার নজির স্থাপন করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় তার জন্য ছিল একপ্রকার স্বর্ণযুগ, যেখানে কোনো অভিযোগই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

‎রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রভাবশালী নেতা ফজলে করিম চৌধুরী এবং তার ছেলে ফরাজ করিম চৌধুরীর আশীর্বাদে তিনি এসব অপকর্ম থেকে রেহাই পেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে টেন্ডারের কাজ সম্পন্ন না করেই প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বরখাস্ত হলেও পরে আবার চাকরিতে ফিরে আসেন। সে সময় তার বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতির খবরও প্রকাশিত হয়, তবে শেষ পর্যন্ত পুনরায় দায়িত্বে যোগ দেন।

‎১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ৮ কোটিতে ক্রয়, তদন্তে তোলপাড়ঃ

‎২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর ১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ৮ কোটিতে ক্রয় শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। প্রথমে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তারা অপারগতা প্রকাশ করে। পরে দুই সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

‎২০২৬ সালের ১১ মার্চ একই বিষয়ে আরও কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরই প্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বেলাল হোসেন সরকারকে ওএসডি করে মহাপরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তার স্থলে রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মো. আনোয়ারুল ইসলামকে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে পদায়ন করা হয়।

‎এই খবরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ক্যান্টিন থেকে অফিস সব জায়গায় আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশও লক্ষ্য করা গেছে।

‎বিলাসবহুল জীবন ও অঢেল সম্পদের মালিক

‎২২ তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা বেলাল হোসেন সরকার ২০০৩ সালে চাকরিতে যোগ দেন। গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা এই কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে জানা যায়।

‎অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৫ বছরে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে প্রায় ১০ বিঘা জমি, জেলা শহরে আরও ৮ বিঘা সম্পত্তি, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং একটি প্রায় ৪ হাজার বর্গফুটের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এছাড়া পরিবারের জন্য নিয়মিত দামী গাড়ি (প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মিতসুবিশি) উপহার দেওয়ার তথ্যও জানা গেছে।

‎সরকারি চাকরির পাশাপাশি ঠিকাদারি সিন্ডিকেট

‎শুধু সরকারি কর্মকর্তা হিসেবেই নয়, অভিযোগ রয়েছে, বেলাল হোসেন সরকার গোপনে ঠিকাদারি ব্যবসার সাথেও জড়িত। রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে আঁতাত করে Next Generation Graphics Ltd (NGGL) ও Fav Diesel Sales & Service-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ঢাকা কমলাপুর ও রাজশাহী রেলস্টেশনে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ওয়াশিং প্ল্যান প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে। এই প্রকল্পের পিডি ফকির মুহিউদ্দীন এবং বেলাল হোসেন সরকারের নেতৃত্বে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়িত হয়। বর্তমানে প্রকল্পটি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনার অভাব ও নিম্নমানের কাজের কারণে সরকারি বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে।

‎কমিশন বাণিজ্য ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগঃ

‎রেলওয়ে দপ্তরে টেন্ডার পেতে হলে আগেই ১০% থেকে ২০% কমিশন দিতে হতো, এমন অভিযোগ রয়েছে। এই প্রথা চালুর পেছনে বেলাল হোসেন সরকারের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎রাজশাহী ও চট্টগ্রামের কর্মকর্তাদের নিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। কেউ তার শর্তে রাজি না হলে কাজ চলে যেত তার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের হাতে। এমনকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের সাথে যোগাযোগ করে সিন্ডিকেট ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

‎ওএসডি হওয়ার পর মন্ত্রীর দুয়ারে তদবির

‎হঠাৎ ওএসডি হওয়ায় বেলাল হোসেন সরকার যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। নিজের পদ ফিরে পেতে তিনি মন্ত্রণালয়ে তদবির শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।

‎তিনি মন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার এবং অতীতে ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। এ উদ্দেশ্যে ফকির মুহিউদ্দীনসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে নতুন করে একটি লবিং গ্রুপও গঠন করেছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

‎শেষকথাঃ

‎দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার, সিন্ডিকেট—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বেলাল হোসেন সরকারের ওএসডি হওয়া রেলওয়ে অঙ্গনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তিনি আবারও নিজের অবস্থান ফিরে পেতে কতটা সফল হন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com