কাঁঠালের রাজধানী খ্যাত গাজীপুরে শ্রীপুরে এবার ‘কাঁঠাল বিস্কুট’ তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। পচনশীল এফলের অপচয়রোধ এবং বহুমুখী ব্যবহারের চিন্তা থেকেই “কাঁঠাল বিস্কুট” উৎপাদন ও বাজারজাত করে তিনি এই সাফল্য পেয়েছেন।
উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর নিজের কারখানায় কাজ করছে কাঁঠাল দিয়ে খাদ্য উৎপাদনে অভিজ্ঞ একটি কর্মীদল।এদিকে “কাঁঠাল বিস্কুট” উৎপাদনের খবরে স্থানীয় কাঁঠাল বাগান মালিকেরা জাতীয় এ ফল চাষ থেকে আশার আলো দেখছেন। এ ফলের উপযুক্ত বাজারমুল্য পাওয়ার আশাও করছেন তারা।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরের দিকে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়,কাঠালের রাজধানী শ্রীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টন কাঁঠাল গাছেই পঁচে গলে নষ্ট হয়। ভর মৌসুমে গাছ পাকা কাঁঠালে সয়লাব হয়ে থাকে বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলো। এসময় কাঁঠালের দামও কম থাকে। পুষ্টি সমৃদ্ধ জাতীয় এ ফলটি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় এ কাঁঠালের পঁচনরোধ করা সম্ভব হয় না। বৈশাখ থেকে ভাদ্র এই মাসে শ্রীপুরের গাছে গাছে শোভা পায় জাতীয় ফল কাঁঠাল। এসব বিবেচনায় আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কাঁঠালের রসে তৈরী করছেন বিস্কুট। যাতে ফলের পুষ্টি ও স্বাদ দুটোই ধরে রাখছে। কোনো কৃত্রিম ফ্লেভার ছাড়াই তৈরী এই কাঁঠালের বিস্কুট বাজারে আসতেই অনলাইনে তৈরী হয়েছে ব্যাপক চাহিদা।
কারখানায় কাঁঠাল বিস্কুট তৈরির প্রধান কারিগর মানিক মিয়া বলেন, ‘পাকা কাঁঠালের কোষ বের করে ব্লেন্ডারের পর স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোনো প্রকার ক্যামিকেল ছাড়াই মিক্সার মেশিনে দেই। এর রসের সাথে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ একসাথে মিক্সার করি। সব উপকরনে মিক্সারের পর মন্ড তৈরী করি। পরে টেবিলে উঠিয়ে ডাইস দিয়ে কেটে বিস্কুট তৈরি করে ট্রে’তে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। একটি ট্রেতে ৩৬পিছ বিস্কুট দেওয়া যায়। এরকমভাবে ট্রলিতে ৩৬টি ট্রে একসাথে রেখে তারপর ওভেনে ঢুকানোর ২৫ মিনিট পর বিস্কুট হয়।গরম কমে গেলে বা ঠান্ডা হলে বক্স করা শেষে বাজারজাত করা হয়। একটি বক্সে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দেওয়া থাকে।’
কৃষি অফিস জানায়, শ্রীপুরের উঁচু লাল মাটির কারণে এখানকার কাঁঠাল সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং মানসম্মত। উপজেলায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরেরও বেশি কাঁঠাল উৎপাদন হয়। তারমধ্যে, উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের জৈনা, রাজাবাড়ি ইউনিয়নের মিটালু, চাওবন,শাহজাহানপুর,পৌর এলাকার কেওয়া, উজিলাব, গোসিংগা ইউনিয়নের বাউনি,কর্নপুর,লতিফপুর এলাকা উল্লেখযোগ্য।
কেওয়া গ্রামের কাঁঠালচাষী ফরিদ মিয়া বলেন,’ প্রতি মৌসুমে শ্রীপুরে লাখ টাকার কাঁঠাল সঠিক সংরক্ষণের অভাবে পঁচে গলে নষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে তা বাজারজাত করলে আমাদের মতো অনেক চাষী অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।’
উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, ‘শ্রীপুরসহ দেশে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল উৎপাদন হয় এবং প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল অপচয় হয়ে থাকে। আমাদের জাতীয় ফলের এমন অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরির কোনো বিকল্প নেই। আমি চেষ্টা করছি। সকলের সহযোগিতা পেলে সামনে ব্যাপক পরিসরে এমন পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য আছে আমার।’
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন,’ কাঁঠাল দিয়ে বিস্কুট তৈরির উৎসাহ জোগাতে আমরা ওই উদ্যোক্তাকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা করে আসছি। কাঁঠালের নানামুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের হাতেকলমে প্রশিক্ষনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন,কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ’ ইতিমধ্যেই প্রায় ২০টিরও অধিক প্রযুক্তি এবং উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এ ধরনের প্রযুক্তি বিশেষ করে কাঁঠালের বীজ, কাঁচা কাঁঠাল এবং পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে যে পাউডার তৈরি করা যায় এতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে। এতে থাকা প্রোটিন,মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,ফাইবার— আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। উদ্যোক্তারা কাঁঠাল দিয়ে নানা খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে বিক্রির মাধ্যমে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবেন তেমনই পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
Leave a Reply