বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের (বেরোবি) উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সভাকক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষার্থী কল্যাণ এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগ ও অর্জনের কথা তুলে ধরেন।
উপাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীবান্ধব, গবেষণামুখী ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা। দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ক্লাস ও পরীক্ষা পুনরায় চালুর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনা হয়।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে প্রথমবারের মতো ডিনস ও মেরিট অ্যাওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদ ও ২২টি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে রংপুর জেলার আটটি উপজেলা শহরে বাস চলাচলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
গবেষণা কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, ২০২৫ সালের Nature Index তালিকায় বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছে। একই সময়ে বিশ্বসেরা গবেষকদের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষক স্থান পেয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষণা কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে এমএসসি থিসিস শিক্ষার্থীদের জন্য ফান্ডিং, আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশে উৎসাহ এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ‘ইন্সটিটিউট অব রিসার্চ এক্সিলেন্স’-এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান উপাচার্য।
অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ভাণ্ডার ভবন, একাডেমিক ভবন-১-এর সম্প্রসারণ, একাডেমিক ভবন-৪-এর পঞ্চম তলার ক্লাসরুম উইং, ছাত্রীদের আধুনিক গার্লস কমনরুম এবং শহীদ ফেলানী হলের প্রভোস্ট ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা উদ্বোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রী হল ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজ পুনরায় চালু হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনটি আবাসিক হলে এসি সুবিধাসহ আধুনিক রিডিং রুম স্থাপন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে সেলুন, লন্ড্রি ও স্টেশনারি দোকান চালুর পাশাপাশি ক্যাফেটেরিয়ার তৃতীয় তলা এবং ২ নম্বর গেটের কৃষ্ণচূড়া সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান ও ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদনের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। এসব পরিকল্পনার আওতায় ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আবাসিক হল, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন, নতুন একাডেমিক ভবন, টিএসসি/অডিটরিয়াম, প্রশাসনিক ভবন এবং লাইব্রেরির সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ডিজিটাল হাজিরা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক, ডরমেটরি, পরিবহন ও শিক্ষাছুটি নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন আপগ্রেডেশন ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ৩০০ কর্মচারীকে আপগ্রেডেশন ও পদোন্নতি দেওয়ার কথাও জানান উপাচার্য।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে কম্পিউটার বেসিক ও ইংরেজি ভাষা কোর্স চালুর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি বিষয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। অস্বচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেধাবৃত্তি এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের মাধ্যমে বৃত্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে শহীদ আবু সাঈদ আন্তঃবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। এছাড়া ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শহীদ আবু সাঈদ বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়াতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন উপাচার্য। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে জানান তিনি।
আগামী দিনের পরিকল্পনা তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিকল্পিত ক্যাম্পাস উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের আবাসিক ও একাডেমিক সুবিধা সম্প্রসারণ, গবেষণার মান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করাই হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, গত দুই বছরের অর্জনকে তিনি চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখছেন না; বরং এগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নযাত্রার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবক, স্থানীয় জনগণ ও গণমাধ্যমসহ সব অংশীজনের সম্মিলিত সহযোগিতায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পরিকল্পিত, আধুনিক, গবেষণামুখী ও শিক্ষার্থীবান্ধব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
Leave a Reply