বিশ্বব্যাংকের ইন্সপেকশন প্যানেলে আইনজীবীর জরুরি অভিযোগ, তদন্ত ও সরেজমিন অনুসন্ধানের দাবি।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই ম্যানগ্রোভ বনই এখন চিংড়ি ঘের ও লবণ মাঠ তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া-ঘটিভাঙ্গা এলাকায়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে প্যারাবন উজাড়ের পাশাপাশি কোথাও কোথাও আগুন দিয়ে ম্যানগ্রোভ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে উপকূলীয় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং স্থানীয় বিপুল জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ ঘটনায় তদন্ত, সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ চেয়ে বিশ্বব্যাংকের ইন্সপেকশন প্যানেলে অভিযোগ করেছেন লন্ডনভিত্তিক ফরেন ল’ইয়ার ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া এডভোকেট ফারুক ইকবাল।
অভিযোগপত্রে বিষয়টিকে “Destruction of Coastal Mangrove Greenbelts and Imminent Threat to Life and Environment at Sonadia-Gotibhangha, Maheshkhali, Cox’s Bazar, Bangladesh” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে সোনাদিয়া, ঘটিভাঙ্গা, মহেশখালী ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী ও ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে গড়ে ওঠা উপকূলীয় বনাঞ্চলের একটি অংশ বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ ও লবণ উৎপাদনের জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০০১ সালের পর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে বন উজাড়ের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ২০০৭ সালে GR 192/2007 নম্বরের একটি মামলা বা আইনগত পদক্ষেপের কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদের পুনর্নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে এবং অবশিষ্ট সবুজ বেষ্টনীর কিছু অংশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।
এখানেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের কাছে দেওয়া অভিযোগে ফারুক ইকবাল দাবি করেছেন, ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে মানববন্ধন, নাগরিক আবেদন ও বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ করা হলেও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এমনকি অভিযোগকারী দাবি করেছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে উপকূলীয় জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রকল্পে ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনায়নের ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রকৃতিনির্ভর সমাধান এবং উপকূলীয় বনায়ন ব্যবহার করা হয়েছে। Coastal Embankment Improvement Project-1-এর আওতায় ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৭৩.৮ হেক্টর এলাকায় উপকূলীয় বনায়নের তথ্যও বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের একটি বাংলাদেশবিষয়ক জলবায়ু নথিতে আরও বলা হয়েছে, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও সবুজ বেষ্টনী ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসের প্রভাব কমাতে কার্যকর এবং বাংলাদেশে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সম্প্রসারণে বিভিন্ন অর্থায়নের কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
তবে আপনার দেওয়া অভিযোগপত্রে Green Climate Fund (GCF)-এর অর্থায়ন এবং World Bank Inspection Panel—দুই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ এসেছে। এগুলো একই অর্থায়ন ব্যবস্থা নয়। তাই প্রকাশের আগে কোন প্রকল্পে, কোন অর্থায়নকারী সংস্থার অর্থে এবং সোনাদিয়া-ঘটিভাঙ্গায় ঠিক কোন বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল—তা প্রকল্পের নাম ও ডকুমেন্ট দিয়ে নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে GCF-এর অভিযোগ ব্যবস্থার জন্য আলাদা Independent Redress Mechanism (IRM) রয়েছে। GCF-এর অফিসিয়াল কেস রেজিস্টারেও বাংলাদেশ-সংক্রান্ত অভিযোগের নথি রয়েছে।
ফারুক ইকবালের অভিযোগে সোনাদিয়া-ঘটিভাঙ্গা-মহেশখালী এলাকায় স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত দল পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের প্রকৃত পরিমাণ, স্থানীয় মানুষের দুর্যোগঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি সরেজমিনে যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যৎ জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়নের সঙ্গে পরিবেশগত সুরক্ষা, আইন প্রয়োগ এবং ধ্বংস হওয়া ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের শর্ত যুক্ত করারও অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ধ্বংস হওয়া ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের কথাও বলা হয়েছে।
অভিযোগকারী জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের ইন্সপেকশন প্যানেল তাঁর অভিযোগ গ্রহণের বিষয়টি জানিয়ে তাঁকে চিঠি দিয়েছে এবং S2609-0018 রেফারেন্স নম্বর দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বিষয়টি যাচাই করতে পারেন।
তবে অভিযোগ গ্রহণ, প্রাথমিকভাবে রেজিস্টার করা এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সিদ্ধান্ত, এই তিনটি আলাদা প্রক্রিয়া। তাই বিশ্বব্যাংক সরেজমিন তদন্তে চূড়ান্তভাবে গিয়েছে বা বাংলাদেশে কোনো জলবায়ু তহবিল স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আনুষ্ঠানিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংক নিজেই বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ও ম্যানগ্রোভ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তাদের গবেষণায় ম্যানগ্রোভকে উপকূলীয় সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ফলে সোনাদিয়া-ঘটিভাঙ্গায় ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে যে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছিল, সেটি যদি বাণিজ্যিক স্বার্থে ধ্বংস হয়ে থাকে, তাহলে এর দায় কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব কে নেবে?
এখন বিশ্বব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থার নথিভুক্ত পরবর্তী পদক্ষেপ, সরকারি তদন্ত এবং সরেজমিন পরিবেশগত যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা কতটা, সেটিই নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।
গেল কয়েকদিন আগে বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর জনসভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদ প্যারাবন ধ্বংসকারীদের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা ম্যানগ্রোভ কেটে চিংড়ি ঘের করেছেন তাদেরকে বলছি আপনারা যে বাইগাছগুলো কেটে ঘের করেছেন এগুলো উচ্ছেদ করা হবে । আমাদের বাঁচতে হলে প্যারাবনকে বাচাতে হবে ।
Leave a Reply