প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গভীরভাবে আশা করছিলেন যে ২০২৫ সালে শান্তি পুরস্কার তিনিই পাবেন। দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নোবেল পাওয়ার জন্য অনেকটা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। নিজেকে শান্তির এক মহান দূত হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে বেশ কিছু ভালো কাজও তিনি করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পাঁচ মাসের মাথায় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার চার দিনের সংঘাত থামাতে সক্রিয় অবদান রাখেন। সচেষ্ট হন ইউক্রেন বিরোধ নিরসনে। তেহরান-তেলআবিব যুদ্ধের শুরুতে তিনি ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধংদেহি মনোভাব গ্রহণ করেন এবং ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলাও চালান। শেষের দিকে এসে ইসরায়েলের পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত তখন তিনি হয়ে যান শান্তির দূত। নোবেল পাওয়ার জন্য এটাও তাঁর প্লাস পয়েন্ট হয়ে যায়। ফিলিস্তিনে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতিতে তিনি ভূমিকা রাখেন যদিও তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষপাতী নন। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করার প্রস্তাবও করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ধরেই নিয়েছিলেন যে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন। সাধারণ একটা ধারণাও তৈরি হয় গিয়েছিল যে ২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পের গলায় ঝুলবে, কেবল ঘোষণার অপেক্ষা। যে শর্তগুলো পূরণ করলে কেউ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন, তাতেও তিনি এগিয়ে ছিলেন। স্কোর ভালো ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরস্কারের শিকেটি তাঁর ভাগ্যে যে ছিঁড়বে না, তা কি ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকে জানতেন? হয়তো জানতেন বা জানতেন না।
কিন্তু সে খবর নিশ্চয়ই ছিল আমেরিকান ডিপস্টেটের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে। এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সিআইএ, এফবিআই, পেন্টাগন ও আমলাকুলের একাংশ উল্লেখযোগ্য। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টেরও এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ডিপস্টেটের কোনো আনুষ্ঠানিক রূপকাঠামো নেই। এটি একটি ধারণা, কিন্তু বহুবার কার্যে প্রমাণিত। এই ডিপস্টেটের ব্যাপারে ইলেকশনের আগে থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বস্তি ছিল। তিনি একাধিকবার বলেছেন যে আমেরিকার ডিপস্টেট তার নীতি-পলিসির বিপক্ষে কাজ করছে। সে হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে জানতেনই না যে তিনি নোবেল পুরস্কারের মিছে আশায় বসে আছেন।
ডিপস্টেটের লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ভান্ডার দখল করা। সেজন্য তারা এজেন্ট হিসেবে বেছে নেয় করিনা মাচাদোকে, যিনি নিজেকে ভেনেজুয়ালার গণতন্ত্রের নেত্রী বলে দাবি করে থাকেন। নোবেল পাওয়ার আগে পর্যন্ত মাচাদো সম্পর্কে ট্রাম্প মনে হয় বিশেষ কিছু জানতেন না। এই অপরিচিতার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরে তিনি বিস্মিত হন, খানিকটা ক্ষোভও প্রকাশ করেন। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতেও সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
বিবৃতিতে বলা হয়, নরোজিয়ান নোবেল কমিটি যোগ্যতার ওপরে রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর এদিকে নোবেল জিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে মাচাদো বলেন, প্রকৃতপক্ষে আপনিই এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, মাচাদো তাঁর নোবেল পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করকমলে। সেয়ানা মহিলা! একমেরু বিশ্বের মোড়ল আমেরিকার দালালির স্বীকৃতির জায়গাটা ষোলকলায় পূরণ করে নিতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও হয়তো বুঝে গেলেন যে ডিপস্টেট যা করেছে, তা মন্দ করেনি। মাদুরোর পতন ঘটিয়ে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ কবজা করে নিতে এই মহিলাটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো পছন্দ। এই ভেবে তিনি অচিরেই না পাওয়ার বেদনা বিস্মৃত হন।
মাচাদো পূর্বাপর বিশ্বকে বোঝাবার চেষ্টা করেন, ভেনেজুয়েলার মানুষ মোটেও ভালো নেই। সাধারণ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মাদুরো ভেনেজুয়েলায় কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করেছেন। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা কখনই অতটা খারাপ ছিল না।
মাদুরোর পূর্বসূরি বিপ্লবী হুগো শাভেজের কাল থেকে ভেনেজুয়েলার মানুষ ভালোই ছিল। তেলের টাকায় জনগণের প্রকৃত কল্যাণ ও উন্নতি হয়েছিল। গড়ে ওঠে বহু হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি করা হয় কর্মসংস্থান। শিক্ষিতের হার দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। জ্ঞানভিত্তিক সোসাইটি গড়ে তুলতে হুগো শ্যাভেজ নিজে রাজপথে দাঁড়িয়ে জনগণের মধ্যে বই বিতরণ করেছেন। লাতিন আমেরিকার সতেরো শতকের মহান নেতা, যাঁকে মানুষ মুক্তির দূত মনে করে থাকে সেই সিমন বলিভারের জাতীয়তাবাদী ঐক্য, ঔপনিবেশবাদবিরোধী এবং জনগণের জন্য কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন হুগো শ্যাভেজ। তিনি মার্কসবাদী বা কমিউনিস্ট ছিলেন না। তবে কমিউনিস্ট দেশগুলোর সাম্যবাদী নীতির সমর্থক ছিলেন। সে কারণে কমিউনিস্ট দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল। সিমন বলিভারের জন্ম কারাকাসে। তিনি স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে লাতিন আমেরিকাকে মুক্ত করেন। তিনিই ছিলেন ঔপনিবেশবাদবিরোধী লাতিন আমেরিকান সংগ্রামের নেতা ও প্রাণপুরুষ। তাঁরই নেতৃত্বে বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলাসহ কমপক্ষে পাঁচটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। বলিভার লাতিন আমেরিকার মুক্তি ও ঐক্যের ডাক দেন। জাতীয়তাবাদ, ন্যায়বিচার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন ও কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েম ছিল তাঁর আদর্শ। হুগো শ্যাভেজ ছিলেন সিমন বলিভারের সাচ্চা অনুসারী। লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ দেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবায়নে সক্ষম না হলেও হুগো শ্যাভেজের ভেনেজুয়েলা তা বহুলাংশে পেরেছিল। নিকোলাস মাদুরো হুগো শ্যাভেজের আদর্শিক উত্তরসূরি। কাজেই মাদুরোর শাসনামলে মানুষ খারাপ অবস্থায় ছিল-এটা পশ্চিমা প্রচারণা। আর এ কথাটাও বুঝতে হবে যে বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো জনগোষ্ঠীর ভালো থাকা আর জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মানুষের ভালো থাকার ধরন এক নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জায়গা এটা নয়। হুগো শ্যাভেজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিকোলাস মাদুরো কতটা বহন করতে পেরেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে তার বিচ্যুতি ঘটে থাকা বিচিত্র নয়। কেননা হুগো শ্যাভেজের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুণাবলি মাদুরোর মধ্যে ছিল না। তদুপরি মাচাদো ও অন্য আরও কিছু প্রক্সি পলিটিশিয়ানের অব্যাহত চক্রান্ত মাদুরোর প্রশাসনিক শক্তি দুর্বল করে দেয়। কিন্তু মাদুরো অজনপ্রিয় নেতা ছিলেন না। অন্তত মাচাদোর চেয়ে অনেক গুণে বেশি জনপ্রিয়তা ছিল ও আছে। ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন করিনা মাচাদোরা। মাঠ তৈরির প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করা হয়।
বলা হয়ে থাকে শান্তি পুরস্কারসহ সবগুলো নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয় আমেরিকা ও পশ্চিমা জোটের স্বার্থ বিবেচনা করে। বিশেষ করে শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে নরোজিয়ান পার্লামেন্ট আমেরিকার ডিপস্টেটের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে। নরওয়ে আমেরিকার বিশ্বস্ত সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মিত্র। অতঃপর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।”
বস্তুত নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেত্রী এবং কসাই নেতানিয়াহুর অনুরাগী করিনা মাচাদো বিকিয়ে দিলেন মাতৃভূমির স্বাধীনতা। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে গেছে, এ খবর সুবিদিত। আমেরিকার হাতে এখন ভেনেজুয়েলার প্রশাসন। বিশ্বের তেলের সর্ববৃহৎ মজুত আমেরিকার কবজায়। এই পরিস্থিতিতে খুশিতে আটখানা হয়ে উঠেছিলেন নোবেল লরিয়েট মারিয়া করিনা মাচাদো। তিনি এই আগ্রাসনকে ভেনেজুয়েলার জন্য বিরাট সুযোগ বলে দাবি করেন। ভেনেজুয়েলা নাকি স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। তিনি বলেছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিয়েছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, এখন কি তাহলে করিনা মাচাদোর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার সরকার পরিচালিত হবে? ট্রাম্পের সাফ জবাব, সরকার চালাবার যোগ্যতা মাচাদোর নেই। তাঁর কোনো জনপ্রিয়তাও নেই। তাঁর মানে মাচাদোর কোনো আশা নেই।
বিশ্ব-ইতিহাসে দালাল-বিশ্বাসঘাতকদের কলার খোসার মতো ছুড়ে ফেলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ব্যবহারের পর অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যাওয়াই বিশ্বাসঘাতকদের ললাটলিখন। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার হিসেবে মীর জাফর আলী খানকে উপঢৌকন দেওয়া হয়েছিল বাংলার মসনদ। তিনি হয়েছিলেন পুতুল নবাব। তারপর ১৭৬০ সালে মীর জাফরকে সরিয়ে মসনদে বসানো হয় তাঁরই জামাতা মীর কাসিমকে। মীর কাসিমও ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশ্বস্ত দালাল। মসনদে বসার পর মীর কাসিম যখন দেখলেন যে তিনি তো নেহায়েত এক পুতুল নবাব। তাঁর বোধোদয় হলো। তিনি কোম্পানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। কিন্তু তিনি হয়তো জানতেন না যে দালালের আস্ফালন মনিব পছন্দ করে না। মীর কাসিমকে সরিয়ে আবারও মসনদে ডেকে আনা হলো বুড়ো অপদার্থ মীর জাফরকে। ১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যু হয় অসহায় অবস্থায়। ইংরেজ প্রভু এই অসহায় বিশ্বাসঘাতকটির দিকে ফিরেও তাকায়নি। মীর জাফর দ্বিতীয়বার নবাব হওয়ার পর মীর কাসিম পালিয়ে যান। ১৭৭৭ সালে কপর্দকহীন অবস্থায় রোগেশোকে জর্জরিত হয়ে মীর কাসিম মৃত্যুবরণ করেন।”
এগুলো বাঙালির জানা ইতিহাস। দূরে পানামার দিকে তাকাই। পানামার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন সেনা কর্মকর্তা ম্যানুয়েল নরিয়েগা। নরিয়েগা ছিলেন সিআইএর এজেন্ট। নিয়মিত গোপন তথ্য সরবরাহ করে তিনি ওয়াশিংটনের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। মার্কিন সমর্থন সহযোগিতায় তিনি হয়ে উঠলেন পানামার একচ্ছত্র ক্ষমতাধর। হাতে ক্ষমতা পেয়ে তিনি আমেরিকাকে পরোয়া না করার চেষ্টা করেন। ক্রমান্বয়ে আমেরিকাবিরোধী হয়ে ওঠেন। কার্যত তিনি আমেরিকাকে শত্রুরাষ্ট্র বিবেচনা করতে লাগলেন। যুক্তরাষ্ট্র তার এত বিশ্বস্ত দালালের ঔদ্ধত্য সহ্য করেনি। সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রথমে নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। নরিয়েগা পালিয়ে ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। দূতবাস থেকেই নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। মার্কিন আদালতে তাঁর বিচার হয়। সাজাভোগের পর পানামার এই দুষ্ট শাসককে স্বদেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন নরিয়েগা। এই হচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক”
Leave a Reply