গরিবের ভরসা সেই ‘১০ টাকার ডাক্তার’ এবাদুল্লাহ এবার সাড়া পেলেন বিদেশি বন্ধুদের। সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এবাদুল্লাহকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তার সঙ্গে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে করে গরিবের ভরসা ডা. এবাদুল্লাহ নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়েছেন। মানবসেবায় চির উদ্দীপ্ত ডা. এবাদুল্লাহ বিদেশি বন্ধুদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এই প্রতিবেদককে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতা।
এই প্রতিবেদকের সংবাদ প্রকাশের পর তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, যৌবনের উদ্দীপনাকে উপেক্ষা করে গরিব, দুঃখী, অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি। টাকার পেছনে ছুটিনি, ছুটেছি আর্তপীড়িত মানুষের পেছনে। এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেকে অনেক রকম টিপ্পনী কেটেছেন, ‘৫ টাকার ডাক্তার’ বলে বিদ্রুপ করেছেন। তারপরও আমি থেমে থাকিনি। শুধু গরিব মানুষের কথা ভেবে আমি আমার ফি বাড়াইনি। এখন সব কিছুর খরচ প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যাওয়ায় অল্প কিছুদিন ধরে রোগীদের কাছে ফি নেই মাত্র ১০ টাকা।
এই দীর্ঘ চিকিৎসা জীবনে আমার পাশে সেভাবে কেউ কখনও দাঁড়ায়নি। কখনও কেউ আমাকে নিয়ে লেখালেখিও করেনি। আমিও নির্মোহ মানুষ, কারও কাছে কখনও কিছু চাইনি। তবে এই প্রতিবেদ হঠাৎ আমাকে নিয়ে ফিচার করলো। আমার পাশে দাঁড়ালো। এর যে এমন প্রতিক্রিয়া পাবো স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন দেশ-বিদেশ থেকে আমার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী, অনেক রোগী যাদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছিলাম তারা ফোন করে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন, সহযোগিতা করতে চাইছেন। এজন্য এই প্রতিবেদককে আমি কী বলে যে ধন্যবাদ দেবো তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আশা করছি, যারা আমাকে সহযোগিতা করতে চেয়েছেন তারা সবসময় পাশে থাকবেন। আশা করছি এইপতিবেদকআমার পাশে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, যে দেশের মানুষ দু’বেলা দু মুঠো অন্ন জোগাড় করতে পারে না, বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় তাদের চিকিৎসা না পাওয়াটা আমাকে ভীষণ ভাবাতো। তাই তাদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছি। এ কাজ করার জন্য কেউ আমাকে স্বীকৃতি দেবে বা কোনও মেডেল দেবে এমন কথা কখনও ভাবিনি। সরকারি বা বেসরকারি স্বীকৃতির আশাও করি না। চাকরি জীবন শেষে নিজের অবসরটা তাদের সেবা করেই কাটিয়ে দিতে চাই। আসলে রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দেওয়াটাই ছিল আমার লক্ষ্য। কিন্তু আমার তো জমিদারি নেই, যে বাড়িতে রোগী দেখি তার ভাড়া, বিদ্যুৎ খরচ, অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম খরচ, নার্স আছেন তার বেতন এসব কারণে তাদের কাছ থেকে নামমাত্র ফি-টা নিতে হয়। যদি এ বিষয়ে আর কিছু সহযোগিতা পাওয়া যেতো তাহলে হয়তো রোগীদের আরও কিছু ওষুধপত্র দিয়েও সাহায্য করা যেতো।
এই প্রতিবেদন পড়ার পরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এবং কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকেও আমার চিকিৎসা পেয়ে অনেকে সুস্থ হয়েছেন এমন অনেকেই আমাকে ফোন করেছেন, খোঁজ খবর নিয়েছেন। এজন্য আজ গর্বে আমার বুক ভরে গেছে। একটা মানুষ এক জীবনে আর কী চায়! আমার মনে হয়েছে, চাকরি জীবন শেষে আজ আমার স্বপ্নপূরণ হতে যাচ্ছে। বিশ্ববাসীর কাছে আমাকে যেভাবে তুলে ধরেছে তাতে আমার জীবন ধন্য।
আমার স্বপ্ন গরিব দুঃখী মানুষের মাঝে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাবে যেসব অসহায় মানুষ সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা পান না তাদের জন্য আমি স্বল্প খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু সেটি বিশ্বমানের নয়। এ ব্যাপারে আরেকটু সহযোগিতা পেলে কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, খেটে খাওয়া দিনমজুররা স্বল্প খরচে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে এসব ছিন্নমূল মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যাবে।
এদিকে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ নিমাই চন্দ মণ্ডল বলেন, আমি একদিন তার চিকিৎসা সেবা নিয়ে ধন্য হয়েছি। এবাদুল্লা সাহেব একজন অসাধারণ ডাক্তার। তিনি বলেন, সাতক্ষীরা শহরে তখন ভালো ডাক্তার ছিল না, কিন্তু আমার সমস্যাটা ছিল প্রকট। ডা. এবাদুল্লাহ তখন ফি নিতেন পাঁচ টাকা। বিশ্বাসই করতে পারিনি। তারপর ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে সেবা নেওয়ার পর আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। ডা. এবাদুল্লাহকে সহযোগিতা করে গরিব মানুষদের চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করতে সাবেক এই উপাধ্যক্ষও সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
দিন দিন মূল্য বেড়েছে সবকিছুর, তবে বাড়েনি একজন এমবিবিএস ডাক্তারের চিকিৎসা ফি। সিভিল সার্জন থাকাকালীন চিকিৎসা ফি নিতেন ৫ টাকা, ২০১০ সালে অবসরে গিয়ে ফি নির্ধারণ করেন ১০ টাকা। সেই ১০ টাকা ফিসেই এখনো দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসা। ৪৩ বছর ধরে এভাবেই রোগীদের সেবা দিচ্ছেন সাতক্ষীরার গরীবের ডাক্তার খ্যাত ডা. এবাদুল্লাহ। অল্প খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবায় সুস্থ হয়ে খুশি রোগী ও তার স্বজনরাও।
জানা গেছে, সাতক্ষীরা শহরের খান মার্কেটের নওয়াব মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসেন ডা. এবাদুল্লাহ। সেখানেই মাত্র ১০ টাকা ফিতে নানা বয়সী রোগীর চিকিৎসা সেবা দেন তিনি। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ শরণাপন্ন হন তার চেম্বারে। টানা ৫ দশক ধরে এভাবেই সেবা দিচ্ছেন গরীব-অসহায় রোগীদের।
ডা. এবাদুল্লাহর প্রতিষ্ঠা করা নওয়াব মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিভিন্ন পদে কাজ করছেন ১০ জন। তাদের বেতন ভাতাও দেয়া হয় এখনকার আয় থেকেই। দেশের চরম মূল্যবৃদ্ধির এই সময়েও ফি বাড়াননি ডা. এবাদুল্লাহ। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নামে বাড়তি টাকা আদায়ের প্রবণতা। প্রয়োজনের তাগিদে পরীক্ষার দরকার পড়লে সেটির ফিও তুলনামূলক অনেক কম।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানায়, ফি নেয় মাত্র ১০ টাকা। আগে নিতো ৫ টাকা। সেবার মান ভালো। অন্য জায়গায় গেলে বহু ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেয়। কিন্তু স্যারের এখানে এসব দেয় না। পরীক্ষা কিছু দিলেও সেগুলো খুবই স্বল্প খরচে করা যায়।
সাতক্ষীরা নওয়াব মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব ইনচার্জ মাহমুদুল হক বলেন, আমরা সব পরীক্ষার ফিসও ন্যূনতম রাখি। একটা সিবিসি পরীক্ষা বাইরে ৪০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত নেয়। কিন্তু আমাদের এখানে মাত্র ১৮০ টাকায় করা হয়। রিপোর্টের মানও ভালো।
চিকিৎসকের সহকারী নন্দ দুলাল রায় বলেন, গরীব রোগীদের জন্য প্যাথলজি স্বল্প মূল্যে করা হয়। আর স্টাফদের বেতন-ভাতা স্যারের ফিস এবং প্যাথলজি থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকেই বহন করা হয়।
ডা. এবাদুল্লাহর এমন মহৎ কাজে গর্বিত তার সন্তানরা। চিকিৎসক নেতারা বলছেন, একটি অন্যদের জন্য শিক্ষণীয়।
এ নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সাতক্ষীরা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, ডা. এবাদুল্লাহর উদ্যোগ আমাদের সমস্ত ডাক্তারদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ যে, কতটা নিঃস্বার্থভাবে জনগণের সেবা করা যায়।
ডা. এবাদুল্লাহর ছেলে নিয়াজ ওয়াহিদ জিমি বলেন, আমাদের হয়তো অনেক টাকা-পয়সা নেই কিন্তু আমার বাবার কাজ যখন সমাজের সর্বস্তরের লোক ভালো বলে, তার সুনাম করে; তখন গর্বে আমাদের বুকটা ভরে যায়।
স্বল্প মূল্যে মানুষের চিকিৎসা সেবা দেয়ার কারণ জানিয়ে গরীবের ডাক্তারখ্যাত সাতক্ষীরার অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. এবাদুল্লাহ বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দেখতাম সকালে এ পাড়ায় একজন মারা গেছেন, আর বিকেলে ওই পাড়ায় আরেকজন। সেই সময় ডায়রিয়া আর গুটি বসন্তের ব্যাপক প্রকোপ ছিল। চিকিৎসা করার মতো ডাক্তারও ছিল না, তাদের সামর্থ্যও ছিল না। তখন থেকেই মনে হতো আমি এই ডাক্তারি পেশাটাই নেবো। আর দশ টাকা ফি আমি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নিই।
Leave a Reply