৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকান্ড কলঙ্কজনক এবং বেদনাদায়ক

এইচ এম মেহেদী হাসানঃ পৃথিবীর ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকান্ড কলঙ্কজনক এবং বেদনাদায়ক বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃৎ এবং বাঙালি জাতির এক অবিসংবাদিত নেতা । বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাহস,বাগ্মিতা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এদেশের সর্বশ্রেণীর মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে । দীর্ঘ নয়মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা, মহাকালের মহানায়ক এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান । তিনি উনিশশো বায়ান্ন ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠন, আটান্নর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ছিষট্রির ৬-দফা, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ এদেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে এই জাতিকে নেতৃত্ব দেন । এজন্যে তাঁকে বারবার কারাবরণসহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় । সকল প্রকার অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন । বঙ্গবন্ধুু আমাদের স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক । বঙ্গবন্ধুুর মতো আদর্শ নেতৃত্ব পেয়ে যে কোন জাতি গর্ব করতে পারে এবং বদলে দিতে পারে তার ভাগ্য । কিন্তু বাঙালি জাতির চরম দুর্ভাগ্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত নব্য স্বাধীন একটি দেশে শত প্রতিকূলতা কাটিয়ে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুু যখন সকল জাতীয় শক্তিকে একত্রিত করে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিলেন তখনই আমাদের অসতর্কতা ও অনৈক্যের সুযোগে ‘ ৭১-এর পরাজিত স্বাধীনতা-বিরোধীচক্র ও দেশী -বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ‘ ১৯৭৫ -এর ১৫ আগস্ট কালোরাত্রিতে জাতির পিতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মাত্র বিরাশি দিন ক্ষমতায় ছিল পাকিস্তানের চর, ঠান্ডা মাথার খুনী, মাস্টারমাইন্ডেট খুনি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠজন, বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ইতিমধ্যে পিতা মুজিবের সোনার বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের দিকে এগিয়ে নিতে বড় দু’টি কুর্কীতি ঘটায় সে । তার মধ্যে একটি হলো, পৃথিবীর সবচাইতে নিরাপদ জায়গা জেলখানা । আর সেই জেলে জাতীয় চার। নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা । অন্যটি ১৫ আগস্টের খুনীদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করা। পঁচাত্তরের ২৬ সেপ্টেম্বর খুনি মোশতাক এই অধ্যাদেশ জারি করে আর পরবর্তীতে খুনি জিয়াউর রহমান আইনে পরিণত করে পাকাপোক্ত করে, যাহাতে কোনোদিন আর খুনিদের বিচার না হয় । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের চার ঘনিষ্ঠসহচর, চার সিপাহশালা, বঙ্গবন্ধুুর আদেশ নির্দেশ তাঁরা হুবহু অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ,এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন এম মুনসুর আলীকে সেদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিদের বিশেরকাটা হয়ে উঠেছিলেন এই চারজন কেন? তা সহজেই অনুধাপন করা যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে-ই প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে এই জাতিকে মুক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন এই চারজন। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যাকান্ডের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তখন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। চারজন সিনিয়র নেতাসহ অনেকেই কারাগারে এবং অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন। অন্যান্য নেতারাও প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি মীরজাফর খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে সমঝোতা করে। অনেকে আবার রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সেই অবস্হাতেই জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভিতরে নৃশংসভাবে করা হয়। কারণ জাতির পিতার হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা ভেবেছিল খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে যে অভ্যুত্থান সেটা আওয়ামী লীগ বা বাকশালের পক্ষে হচ্ছে। ক্ষমতাসীন মোশতাক বা তার অনুসারীরা চায়নি যে তাদের বিরোধী আরেকটি শক্তি শাসন ক্ষমতায় পুর্নবহাল হোক। ঐ ধরণের একটা সরকার যদি হতো তাহলে জেলে থাকা চার নেতা ছিলেন সম্ভাব্য নেতা। এই সম্ভাবনা যেন বাস্তবায়িত না হয় মূলত সে জন্যেই জেল হত্যাকান্ড ঘটানো হয়। ক্ষমতাকে চিরস্হায়ী করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী একটি রাষ্ট্র গঠনের অপচেষ্টা থেকেই ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকান্ড । পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধুু হত্যার পর থেকেই হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তারা পাল্টা আরেকটি অভ্যুত্থানের আশংকায় ছিলেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল এক ধরণের বিশৃঙ্খলা। সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একদিকে ঠান্ডা মাথার খুনি, পাকিস্তানের চর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং অন্যদিকে মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ। জিয়াই মূলত তখন রাষ্ট্রপতি মীরজাফর মোশতাককে পরিচালনা করছিল। খন্দকার মোশতাক যে বেশিদিন টিকবেনা, এটা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে সিনিয়র অফিসাররা বুঝতে পারছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার বক্তৃতার কিছু অংশ কোর্ট করে লিখেছি, পাঠকদের বুঝার সুবির্ধার্থে ‘ খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্ত্র নিয়ে ঢোকা যায় না। কিন্তু, তারা অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছিল। বঙ্গভবন থেকে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যেভাবে ঢুকতে চায়,সেভাবেই যেন ঢুকতে দেওয়া হয়। ” মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ” অনুমতি ছাড়া কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করা যায় না। তাই বাঁধা দেওয়া হয়। তখন বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন যায়, খুনি মোশতাক টেলিফোন দিয়ে নির্দেশ দেয়। এরা যখন অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে যায়, তখনও বাঁধা দেওয়া হয়েছিল। তখন বঙ্গভবন থেকে বলা হয়েছিল, আলোচনা করতে যাচ্ছে। যেভাবে ঢুকতে চায়, সেভাবেই ঢুকতে দেওয়া হোক। তিনি

আরও বলেন” মোশতাকের পতন যখনই অনিবার্য হয়ে পড়লো, সাথে সাথে ওই খুনিদেরকে একটি প্লেনে করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। প্রথমে তারা তাদেরকে ব্যাংককে নিয়ে যায়। সেখানে বসে তাদেরকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। তাদের ভিসার ব্যবস্হা করে কোন দেশে যাবে সেটাও ঠিক করে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, সেটাও কিন্তু ইতিহাসে আছে। ” যারা বঙ্গবন্ধুুর নির্দেশিত পথেই পরিচালিত হয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করে জাতির জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। আর তাঁদেরকেই ক্ষমতালোভী, স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুুরা নির্মমভাবে জেলের ভিতরে হত্যা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকান্ড কলঙ্কজনক ও বেদনাদায়ক । জেলখানায় সেই রাতে কী ঘটেছিল তার বর্ণনা পাওয়া যায় তৎকালীন আইজি প্রিজনস এন নুরুজ্জামান ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্তব্যরত ডিআইজি প্রিজন আবদুল আউয়ালের প্রতিবেদন থেকে। ৫ নভেম্বর এই প্রতিবেদন তারা জমা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। তারা দুজন ছাড়াও জেলে কর্তব্যরত আরও কয়েকজন এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামনান ও এম মনসুর আলীসহ আরও অনেক রাজনৈতিক নেতাকে আটক করে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল। নিউ জেলের পাশাপাশি তিনটি রুমে তাদের রাখা হয়। এক নম্বরে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদসহ আটজন বন্দী। দুই নম্বর রুমে ছিলেন এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ ১৩ জন। তিন নম্বর রুমে ছিলেন এম মনসুর আলীসহ ২৬ জন। সেই রাতে এক নম্বর রুমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদকে রেখে বাকি ছয়জন বন্দীকে অন্য রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই নম্বর রুম থেকে এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও তিন নম্বর রুম থেকে এম মনসুর আলীকে এক নম্বর রুমে নেওয়া হয়। এই রুমেই তাঁদের চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়। আইজি প্রিজনস এন নুরুজ্জামানের প্রতিবেদন : ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর রাত ৩টায় আমি বঙ্গভবন থেকে মেজর রশিদের একটি ফোন পাই। তিনি আমার কাছে জানতে চান, ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কোনো সমস্যা আছে নাকি। আমি জানালাম, ঠিক এই মুহূর্তের অবস্হা আমার জানা নাই। এরপর তিনি আমাকে জানালেন, কয়েকজন বন্দীকে জোর করে নিয়ে যেতে কয়েকজন সেনা সদস্য জেল গেটে যেতে পারে, আমি যেন জেল গার্ডদের সতর্ক করে দিই। সে অনুযায়ী আমি সেন্ট্রাল জেলে ফোন করি জেল গেটে দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডারকে মেসেজটি জেলারকে পৌছে দিতে বলি, যাতে নিরাপত্তা ব্যবস্হা জোরদার করা হয়। ৩/৪ মিনিট পর বঙ্গভবন থেকে আরেকজন আর্মি অফিসারের ফোন পাই। তিনি জানতে চান আমি, ইতিমধ্যেই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গার্ডদের সতর্ক করে দিয়েছি কিনা। আমি ইতিবাচক জবাব দেওয়ার পর তিনি আমাকে নিরাপত্তা ব্যবস্হা স্বচক্ষে দেখার জন্য জেল গেটে যেতে বলেন। আমি তখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ডিআইজি প্রিয়জনকে ফোন করি। খবরটি জানিয়ে আমি তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে জেলগেটে চলে যেতে বলি। দেরি না করে আমিও জেল গেটে চলে যাই এবং ইতিমধ্যেই সেখানে, পৌঁছে যাওয়া, জেলারকে আবার গার্ডদেরকে সতর্ক করে দিতে বলি। এর মধ্যে ডিআইজিও জেলগেটে পৌঁছেন। বঙ্গভবন থেকে পাওয়া খবরটি আমি আবার তাঁকে জানাই। এর পরপরই মেজর রশিদের আরেকটি ফোন পাই। তিনি আমাকে জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই জৈনিক ক্যাপ্টেন মোসলেম জেলগেটে যেতে পারেন। তিনি আমাকে কিছু বলবেন। তাকে যেন জেল অফিসে নেওয়া হয় এবং ১. জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ২. জনাব মুনসুর আলী, ৩. জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম ৪. জনাব কামারুজ্জামান এই চারজন বন্দীকে যেন তাকে দেখানো হয়। এ খবর শুনে আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চাই এবং টেলিফোন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়। আমি কিছু বলার আগেই প্রেসিডেন্ট জানতে চান, আমি পরিষ্কারভাবে মেজর রশিদের নির্দেশ বুঝতে পেরেছি কিনা। আমি ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি আমাকে তা পালন করার আদেশ দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারজন সেনা সদস্যসহ কালো পোশাক পরা ক্যাপ্টেন মোসলেম জেল গেটে পৌঁছান। ডিআইজি প্রিজনের অফিস কক্ষে ঢুকেই তিনি আমাদের বলেন, পূর্বোল্লিখিত বন্দীদের যেখানে রাখা হয়েছে, সেখানে তাকে যেতে। আমি তাকে বলি, বঙ্গভবনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আমাকে কিছু বলবেন। উত্তরে তিনি জানান, তিনি তাদের গুলি করবেন। এ ধরণের প্রস্তাবে আমরা সবাই বিমূঢ় হয়ে যাই। আমি নিজে ও ডিআইজি প্রিজন ফোনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই। সে সময় জেলারের ফোনে বঙ্গভবন থেকে মেজর রশিদের আরেকটি কল আসে। আমি ফোনটি ধরলে মেজর রশিদ জানতে চান, ক্যাপ্টেন মোসলেম সেখানে পৌঁছেছেন কিনা। আমি ইতিবাচক জবাব দিই এবং তাকে বলি, কি ঘটছে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। তখন মেজর রশিদ আমাকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আমি প্রেসিডেন্টকে ক্যাপ্টেনের বন্দীদের গুলি করার ইচ্ছার কথা জানাই। প্রেসিডেন্ট জবাব দেন,সে যা বলছে তাই হবে। তখন আমরা আরও উত্তেজিত হয়ে যাই। ক্যাপ্টেন মোসলেম বন্দুকের মুখে আমাকে, ডিআইজি প্রিজন, জেলার ও সে সময় উপস্হিত অন্যান্য কর্মকর্তাদের সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যেখানে উপরোল্লিখিত বন্দীদের রাখা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও তার বাহিনীকে তখন উন্মাদের মতো লাগছিল এবং আমাদের কারও তাদের নির্দেশ অমান্য করার উপায় ছিল না। তার নির্দেশ অনুযায়ী পূর্বোল্লিখিত চারজনকে অন্যদের কাছে থেকে আলাদা করা হয় এবং একটি রুমে আনা হয়, সেখানে জেলার তাদের শনাক্ত করেন। ক্যাপ্টেন মোসলেম এবং তার বাহিনী তখন বন্দীদের গুলি করে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর নায়েক এ আলীর নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদল সবাই মারা গেছে কিনা তা নিশ্চিত হতে জেলে আসে। তারা সরাসরি সেই ওয়ার্ডে চলে যায় এবং পুনরায় তাদের মৃতদেহে বেয়নেট চার্জ করে। এই হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নির্মম হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুু হত্যাকান্ডসহ জেলহত্যার বিচার আওয়ামী লীগ সরকার করে । একটু পিছনে ফিরে গেলে দেখা যায়, হত্যাকান্ডের ২৩ বছর পর আওয়ামী লীগ মামলাটি সচল করে এবং ১৯৯৮ সালের ১৫ই অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত এ মামলার রায়ে আসামি তিন জনকে মৃত্যুদন্ড

এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার আবুল হাশেম মৃধা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন,খন্দকার আবদুর রশিদ,শরিফুল হক ডালিম, এমএইচএম বি নূর চৌধুরী, এএম রাশেদ চৌধুরী, আবদুল মাজেদ,আহমদ শরিফুল হোসেন, মো. কিসমত হোসেন, নাজমুল হোসেন আনসার, সৈয়দ ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন। এই মামলায় সাবেক মন্ত্রী কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে খালাস দেয়া হয়। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট রিসালদার মোসলেম জ উদ্দিনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখলেও মৃত্যুদন্ড পাওয়া অন্য দুই আসামি মারফরত আলী ও হাশেম মৃধাকে খালাস দেন। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেয়া হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের দেয়া তিন জনের মৃত্যুদন্ড এবং ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে। তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে সৈয়দ ফারুক, শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকারী (পলাতক) আসামীদের দ্রুত দেশে এনে রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতি সম্পূন্নরুপে কলঙ্কমুক্ত হবে এটাই জাতির প্রত্যাশা