১৫ আগস্ট ট্রাজেডির নেপথ্য কুশীলব

এইচ এম মেহেদী হাসান : বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃত এবং বাঙালি জাতির এক অবিসংবাদিত নেতা। খোকা মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের মাটি ও মানুষের প্রাণের হৃদস্পন্দন হয়ে ওঠেন। তিনি এদেশের মানুষের আশা-আকাঙক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনিই জাতি রাষ্ট্রের স্রষ্টা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ চব্বিশ  বছরের লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির  কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধুর পঞ্চান্ন বছরের জীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ চব্বিশ বছরের রাজনীতির জীবনের মধ্যে চার হাজার ছয়শত বিরাশি দিন এদেশের মানুষের জন্য জেলে কাটিয়েছেন। সকল প্রকার অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাহস,বাগ্মিতা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এদেশের সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও অবিচ্ছেদ্য। ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে লন্ডন হয়ে ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি তিনি তাঁর আজীবনের লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি দেশে ফিরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে সদ্যস্বাধীন দেশের স্বীকৃতি  আদায় লাভ করতে সমর্থন হন, তিনি অতিদ্রুত বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধু সরকার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের তালিকায় নিয়ে যান এবং পররাষ্ট্রনীতির ঈশ্বর্ণীয় সাফল্য দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় বিদ্যুৎ গতিতে। আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘স্বপ্ন’  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই দেখেছিলেন। তিনি বেতবুনিয়া ভূ-উপকেন্দ্র স্টেশন উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে রচিত করেছিলেন  আজকের ডিজিটাল বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশের। যে, বাংলাদেশ আজকে তাঁর-ই কন্যা, বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার হাত ধরে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও শান্তির রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আজীবন গরীব দু:খী, মেহনতি মানুষের কথা ভাবতেন এবং তাঁদের জন্য কাজ করতেন।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস নায়ার বলেছেন,
‘ আপনি শুধু বাঙালি জাতিরই নেতা নন। এমন দিন আসবে সেদিন তৃতীয় বিশ্বের সমগ্র নির্যাতিত -বঞ্চিত মানুষের নেতৃত্ব দেবেন।
আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছি – বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন যিনি সাবেক গভর্ণর, বাংলাদেশ ব্যাংক, তিনি বলছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়োগপ্রাপ্তির পর প্রথম দিনে ব্রিফিংয়ে বলেছিলন,
‘ বাবারে দেখ, আমার কাছে বহু রকমের লোক আসে, তো যারা ভদ্রলোক তাদের দেখা করতে দেস কিনা, তারা তাদের কাজ করিয়েই নিবে। কিন্তু আমার অনেক বন্ধু চাষাভুষা, শ্রমজীবী মানুষ আসবে, তাঁদের তুই যদি আমার সাথে দেখা করতে না দিস, তাদের কাজ করতে সাহায্য না করিস, তাহলে তাদের কাজ কোনো সময়ই হবে না। গ্রাম বাংলার মানুষ খুবই অসহায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল কারণ ছিল সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন করা, কল্যাণ রাষ্ট্র সৃষ্টি করা। ‘
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা চেতনা সবসময়ই ছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের নিয়ে। তাইতো তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার মূল স্বার্থকতা লাভ করতে ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে। এ কাজ করতে তিনি বাকশাল গঠন করেছিলেন যে, বাকশালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষ তাঁদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে এবং কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে একটাই ছিল দ্বিতীয় বিপ্লব( বাকশাল) সৃষ্টির মূল কারণ। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও স্বাধীনতা বিরোধীচক্র এটাকে মেনে নিতে পারেনি। তারা জানতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় বিপ্লব সফল হলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ জনপথ। এতে করে ওদের গাত্রদাহ শুরু হয় এবং গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে থাকে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাত্রিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
এই হত্যাকান্ডের নেপথ্য কুশীলবরা এখনও অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য-উপাথ্য বিশ্লেষণ ও আত্মস্বীর্কৃত খুনিদের বক্তব্য বিশ্লেষণে বেড়িয়ে আসছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রধান বেনিফিশিয়ারি কারা..!!
পাকিস্তানের চর, মুক্তিযুদ্ধের চরম বিশ্বাসঘাতক, স্বাধীনতার চরম শত্রু জেনারেল জিয়াউর রহমান যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের চক্রান্তের বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন তা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত হয় ১৯৭৬ সালে লন্ডনের আইটিভি চ্যানেলের (ওয়াল্ড ইন অ্যাকশন)  World in Action প্রোগ্রামে  সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেওয়া ফারুক এবং রশিদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। সাক্ষাষাৎকারে ফারুক – রশিদ দাবি করে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে ১৫ আগস্টের বহু পূর্বেই জিয়াকে তারা অবহিত করে।
ফারুক জানায়,  ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যা ৭ টা ৩০ মিনিটের দিকে সে জিয়ার বাসায় জিয়ার সাথে দেখা করে এবং তাকে বলে –
The Country required a change । উত্তরে জিয়া বলে, ‘ Yes, yes, Let’s go outside and talk’.
তখন জিয়া ফারুককে নিয়ে বাইরে বাড়ির লনে যায়। সেখানে ফারুক পুনরায় বলে, ‘ We have to have a change. We the junior officers, have already worked it out. We want your support and leadership ‘.
খুনি জিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত স্পষ্টত ;
জিয়া বলে ‘ If you want to do something, you junior officers should do it yourself ‘…( Anthony Mascarenhas, Bangladesh – A Legacy of Blood, Page 54,Hodder and Stroughton, London, 1986)
ফারুক – রশিদের সাক্ষাৎকার থেকে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, মাস্টার মাইন্ডেড খুনি জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের নেপথ্য প্রধান কুশীলব। হয়তো অনেকে এটাও বলতে পারেন যে, ফারুক -রশিদ তাদের দোষ কিছুটা লাঘব করার জন্য অন্যের ঘারে চাপাতে চেয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কেন জিয়া…? অন্য কোন সিনিয়র অফিসার নয় কেন…?  জিয়ার নামটা কি তারা হঠাৎ করে বা রেনন্ডমলি বলেছ..?  বিশ্লেষণে বোঝা যায় যে, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭৬ সালে ম্যাসকারেনহাসকে দেওয়া জিয়ার সাক্ষাষাৎকার থেকে।
ম্যাসকারেনহাস এর ভাষায়, ” In July, 1976,While doing a Tv programme in London the killing of Sheikh Mujib I confronted Zia with what Farbook had said” ( তাদের সাক্ষাতকারে) । জিয়া এ ব্যাপারে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফারুকের সাথে তার এমন কথোপকথনের বিষয়টি এসেছে এভাবে –
” Zia did not deny it -nor did he confirm it “
সাক্ষাতকারে জিয়ার গড়িমসি বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ভাব দেখে ধারণা করা যেতে পারে যে, ফারুকের সাথে জিয়ার এ কথোপকথন সত্য। এর সত্যতার আরও প্রমাণ মেলে আরও অনেক বছর পরে ১৯৯৭ সালে।
যখন ফারুক জেলে আর রশীদ ইউরোপে। ১৯৯৭ সালে রশীদের সাথে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ এর সাক্ষাতকার হয় ইউরোপে।
লিফশুলজের ভাষায়, ” In 1997  I met Rashid for several hours in an European city… I went over with him exactly what he had, told Mascarenhas about Zia’s involvement. Rashid confirmed to me the accuracy of his interview with Mascarenhas “
 শুধু তাই নয় রশীদ লিফশুলজকে এ ব্যাপারে আরও অনেক কিছু ডিটেইল জানায়। রশীদ জোরালোভাবে বলে যে, ” He ( Rashid)  had met General Zia numerous times prior to the coup and that zia was fully in the picture ( In conversation with Lawrence Lifschultz – The Daily Star, December  4, 2014).
জিয়া-ই যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মূল হোতা তা বিভিন্ন সময়ের ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দিনের আলোর মত পরিস্কার হয়েগেছে। সত্য কখনই লুকায়িত থাকে না। একদিন না একদিন প্রকাশ হবেই।
খুনি জিয়ার সাথে খুনি ফারুক -খুনি রশিদের সাক্ষাত এবং মিটিং যে আরও অনেকবার হয়েছে তার প্রমাণ মেলে খুনি রশীদের স্ত্রী জোবায়দা রশীদের বক্তব্য থেকে। সে বলে, ” একদিন রাতে ফারুক জিয়ার বাসা থেকে ফিরে আমার স্বামীকে( রশীদ) জানায় যে, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। শুধু তাই নয়, জিয়া আরও বলে – ‘ If it is a success then come to me. If it is a failure then do not involve me,”
(আসাদুজ্জামান – সব সবকিছুর ব্যবস্হা নিচ্ছেন, প্রথম আলো, ১৫ আগস্ট, ২০১৮) ।
একইভাবে, জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে অবহিত ছিলেন, কি ছিলেন না, তা বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের কয়েক ঘন্টা পর কর্ণেল শাফায়েত জামিল এবং জিয়ার কথোপকথন থেকে। তবে বিষয়টা বুঝতে হবে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই সকালে শাফায়েত জামিল জিয়ার সাথে দেখা করতে গেলে তাকে শেইভ করতে দেখেন।
জামিল জিয়াকে বলেন, ” The president
has been killed, sir. what are your orders?
উত্তরে জিয়া বলে, “If the president is no longer there, then the vice president is there. Go to your headquarters and wait there “.
তখন জামিলের দৃষ্টিতে জিয়াকে অনেক শান্ত দেখায়,” Evidently aware of what had happened “( Anthony Mascarenhas, Bangladesh – A Legacy of Blood, page 76,1986)।
এই সব তথ্য-উপাথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিস্কার বার্তা পাওয়া যায় যে, বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের বিষয়ে জিয়া পূর্বেই অবহিত ছিল, চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্হা নেয়নি, বরঞ্চ চক্রান্তকারীদের উৎসাহিত করেছেন এবং সেই সাথে, আসন্ন পরিস্হিতিকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।
এসব তথ্য এবং বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড এবং একটি নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে উৎখাতে জিয়ার পূর্ণ সমর্থন ছিল। এ ব্যাপারে লিফশুলজ এর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের ফলাফল পরিস্কার -” Had he(Zia) been against the coup, as Deputy  chief of the Army, zia could have stopped it. “
তার মতে ” zia played perhaps the most crucial of all roles. He was the key, shadow Man. He (zia) assured Rashid that he would make certain that the forces in the Army would not move against him and his men if the succeeded. ” ( In conversation with Lawrence Lifschultz – The Daily star, December  4, 2014)।
এসব থেকে আমরা বলতে পারি যে, জিয়া জেনেশুনে এবং সজ্ঞানে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে দেশের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেনি। এ কারণে তার সাজা হওয়া উচিত। জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের চক্রান্তকারীদের অন্যতম। সব তথ্য-উপাথ্য ও দেশী বিদেশী নিউজ পেপার এবং টিভি সাক্ষাতকারের বিষয়ে বিশ্লেষণ করে জিয়ার মরণোত্তর বিচার করা এখন সময়ের দাবি রাখে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে দেশী-বিদেশী চক্রান্ত ছিল চোখেপড়ার মত….
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক সহযোগী রজার মরিস তার লিখিত ‘ আনসার্টেন গ্রেটনেস : হেনরি কিসিঞ্জার এন্ড আমেরিকান ফরেন পলিসি ‘ বইতে কিসিঞ্জার নীতির সমালোচনা করে নয় বরং গুরুত্বসহকারে লিখেছেন, কিসিঞ্জার যুগে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি তিনটি প্রতিশোধের ঘটনা ঘটেছে। কিসিঞ্জারের বিদেশী শত্রুর তালিকায় সবচেয়ে তিন ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন- চিলির আলেন্দে, ভিয়েতনামের থিউ এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিব। বিষয়টি তার কাছে নীতিগত শুধু নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যায়। আলেন্দে ছিলেন তাদের জন্মশত্রু। থিউ ছিলেন উত্তর ভিয়েতনামের সঙ্গে সমঝোতার প্রতিবন্ধক এবং মুজিব ছিলেন দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ায় তাদের নীতি বাস্তবায়নে কণ্টক। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা ‘ দেওয়ার ইজ নো পার্মানেন্ট ফ্রেন্ড, অনলি ইন্টারেস্ট। ‘ কিসিঞ্জার স্হির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন, মুজিব তাদের লোক নয়। যদি তিনি তাদের লোক না হয়ে থাকেন তাহলে স্হায়ী স্বার্থ বলেও কিছু নেই। সেজন্য তার নীতি ছিল তাদের লোক ক্ষমতায় বসাতে হবে এবং মুজিবকে উৎখাত করতে হবে। ১৯৭৪ সালে কিসিঞ্জার বাংলাদেশে সফরে আসলে মোশতাকগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ শুরু হয়। লিফশুলজ লিখেছেন, ‘ আমার গুরুত্বপূর্ণ সেই সূত্র একটি চমকে দেয়া তথ্য জানিয়ে বললেন, জিয়া ও মোশতাকের সঙ্গে আলাদা দুটি বৈঠকে তিনি উপস্হিত ছিলেন। সেখানে মেজর রশিদ নিজেই প্রশ্ন তুললেন, পরিকল্পিত অভ্যুত্থানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব কী হবে…?  ওই সামরিক কর্মকর্তা জানালেন, জিয়া ও মোশতাক উভয়েই আলাদাভাবে আমাদের বললেন, তারা এ বিষয়ে মার্কিনীদের মনোভাব জেনেছেন। দুইজনের উত্তরই একই রকম ছিল। তারা বললেন, এটা ( মুজিবকে সরানো)  মার্কিনীদের জন্য কোন সমস্যা নয়। আমি তখন অনুভব করলাম, মার্কিনীদের সঙ্গে জিয়া ও মোশতাকের আলাদা যোগাযোগের চ্যানেল রয়েছে। পরে এ বিষয়ে কথা হয়নি। ‘
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের প্রাপ্য সম্পদের জন্য পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করে চলেছিলেন তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্রো লারকানায় এক বৈঠকে বলে বসলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তন অত্যাসন্ন। সেজন্য এ নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।
বিভিন্ন সূত্র প্রমাণ করে সিআইএ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের পরোক্ষ ভূমিকা রাখলেও ঘটনাটি ঘটিয়েছিল আইএসআই এবং স্বাধীনতাবিরোধীচক্র। সিআইএ’র পাশাপাশি পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্হা আইএসআই সরাসরি খুনিচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। মদদ দিত। জাতির পিতাকে হত্যা করে খুনিরা পাকিস্তানি আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ হবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র আর উচ্চারিত হয়েছিল খুনিদের কন্ঠে জয় বাংলার পরিবর্তে জিন্দাবাদ।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক। ঘাতকচক্র জাতির পিতাকে হত্যা করলেও তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। যতদিন পৃথিবীর বুকে চন্দ্র, সূর্য আলো দিবে,বাতাস প্রবাহিত হইবে, রাতদিনের পার্থক্য বিদ্যমান থাকবে, পাখি গান গাইবে
 ততদিন কোটি কোটি বাঙালির অন্তরে লালিত তাঁর  ত্যাগ ও তিতিক্ষার সংগ্রামী জীবনাদর্শ।
বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তকারীদের মুখোশ উন্মোচন না করতে পারলে হয়তো এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না সেই নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। একটি আন্দোলন। একটি বিপ্লব। একটি অভ্যুত্থান। জাতি নির্মাণের কারিগর। একটি ইতিহাস। তিনি অমর, অবিনশ্বর। সুতরাং ইতিহাসের এই মহানায়কের শারীরিক মৃত্যু হতে পারে বৈকি কিন্তু তাঁর আদর্শ, চিন্তা-চেতনার বিনাশ কখনই হবে না।
মুক্তির এই মহামানবের শাহাদত বার্ষিকীতে সবার মনের একটাই চাওয়া তাঁর হত্যাকান্ডের নেপথ্য কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনা হোক ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও
সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ।