১৫ আগস্ট ও ২১ শে আগস্ট একই সূত্রে গাঁথা

এইচ এম মেহেদী হাসানঃ  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সুবেহ সাদিকের লগ্নে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে সুপরিকল্পিত এক সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে বঙ্গবন্ধু, তাঁর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব,তাঁর তিন পুত্র শেখ কামাল,শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, তাঁর ভ্রাতা শেখ আবু নাসের,শেখ কামাল ও শেখ কামালের দুই নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা কামাল ও পারভিন জামাল রোজীসহ আরো কয়েকজনকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে পৈশাচিক আনন্দ প্রকাশ করে। এছাড়াও তারা বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের ছয়জনকে একইভাবে হত্যা করে। ওরা বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও আওয়ামী যুব লীগের সভাপতি শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর অন্তঃস্বত্তা স্ত্রী আরজু মণিকে বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দেয়। সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদকেও রেহাই দেয়নি রক্তপিপাসু ঘাতকের দল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের ধরণ এনালাইসিস করলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি এক চরম জিঘাংসার দ্বারা তাড়িত হয়ে ঘাতক বাহিনী তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার পৈশাচিক মনোবৃত্তি নিয়েই সেদিন তারা আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে ছিল। তাদের এ জিঘাংসার মূল কোথায় প্রোথিত ছিল তা খুঁজে পাওয়া যায় জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পরবর্তী বছরগুলোতে এদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রশাসন ব্যবস্হায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন পরিবর্তের মধ্যে। কিশোর শেখ মুজিবুর রহমান নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত বাঙালির পাশে থেকে পরিণত হয়েছেন – একজন ছাত্রনেতা থেকে প্রাদেশিক নেতা। প্রাদেশিক নেতা থেকে জাতীয় নেতা। জাতীয় নেতা থেকে বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা। কালজয়ী মহাপুরুষ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। সুতরাং শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্রোতধারা বেয়ে। হঠাৎ করে এসে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের কর্ণধারে পরিণত হননি। পাকিস্তান আমলের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও শাসনতান্ত্রিক গণআন্দোলনে তিনি জনগণের পক্ষ হয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধর্মের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র চলতে পারেনা তা তিনি জনগণের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, আয়ুব খানের আমলে পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বিমাতাসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। অপরিমেয় সাহসের সাথে তিনি একের পর এক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন আঞ্চলিক বৈষম্য ও পাঞ্জাবি শোষণের বিরুদ্ধে। ফলে বঙ্গবন্ধুর উপর নেমে আসে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী ও তাদের এদেশীয় তাঁবেদারদের সীমাহীন নির্যাতন। জেল,জুলুম, গ্রেফতারি পরোয়ানা আর মিথ্যা মামলার হয়রানিতে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর এগিয়ে চলার পথ। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্রই বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ঈন্সিত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত তিনি বিদ্রোহী চারণের মতো ছুটে বেড়িয়েছেন। যেখানেই গিয়েছেন তাঁর অপার ভালোবাসা আর বজ্রকন্ঠের নির্ঘোষ বাণীতে উদ্বেলিত করে তুলেছেন হাটের মানুষ,মাঠের মানুষ আর তরুণ ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক-কর্মচারীসহ সমাজের সকল স্তরের সাধারণ মানুষকে। তাদেরকে উদ্ধুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয়তাবাদের আদর্শে। বলেছেন,বাঁচতে হলে নিজের দেশে আলাদা পতাকার নীচে সমবেত হয়েই বাঁচতে হবে। ১৯৬৬ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সনদ ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি উত্থাপন করলেন তিনি। ততোদিনে পাকিস্তানে মিলিটারির শাসন একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে গেড়ে বসেছে। সেনাপতি-প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ৬ দফা দাবির যৌক্তিকতা এড়িয়ে তাকে অভিহিত করলেন ‘ পূর্ব পাকিস্তান’কে বিচ্ছিন্ন করার ‘ষড়যন্ত্র ‘ বলে। প্রয়োগ করলেন শক্তির ভাষা। নেমে এলো নির্যাতন। গুম,খুন, গ্রেফতার। কিন্তু ততোদিনে বাঙালি তার স্বপ্নের ঠিকানা জেনে গিয়েছে। এক মুজিব কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত, কিন্তু লক্ষ মুজিব তখন বাংলার ঘরে ঘরে। গণআন্দোলনের জোয়ার ফুলে ফেঁপে উঠে সয়লাব করে দিলো সারা পূর্ব বাংলাকে। ঊনসত্তরের গণআদালন ভিত কাঁপিয়ে দিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের। বাধ্য হলো তারা নির্বাচনের দিন তারিখ ঘোষণা করতে। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় নির্বাচন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ অর্জন করলো সারা পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ষড়যন্ত্রের জাল বুঁনে চললো পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। তাতে ইন্ধন দিলো পশ্চিম পাকিস্তানি শোষক শ্রেণি ও মিলিটারির স্বার্থরক্ষাকারী জুলফিকার আলী ভুট্রো। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের বিভীষিকাময় কালো রাত্রিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো খুনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। জ্বলে উঠলো স্বাধীনতার আগুন। একাত্তরের ভিসুভিয়াসের উত্তপ্ত লাভার নীচে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো ২৩ বছরের অসুস্হ শিশু অবাস্তব পাকিস্তান। জন্ম নিলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। জাতির পিতার বিরুদ্ধে কিছু লোকের খ্যাপা কুকুরের মতো হয়ে ওঠার এটাই প্রধান কারণ। তাছাড়া যে স্বাধীন রাষ্ট্র তিনি পত্তন করলেন তার চার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। এর কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয় পাকিস্তানের কাছে। গ্রহণযোগ্য নয় এদেশে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি অনুচরদের কাছে। তারা বুঝতে পারলো গণতন্ত্র যদি এদেশে তার আসন পাকাপোক্ত করে নিতে পারে তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার এই সুজলা-সুফলা ভূ-খন্ডটি কালক্রমে তার যোগ্যতা ও মেধার বলে জগৎ সভায় দাঁড়িয়ে কেবল যে তার সাফল্য ও উন্নতির বয়ানই করবে না, একই সাথে একথাও প্রমাণ করবে যে ধর্ম নয়,ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাই হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্র পত্তনের মূল ভিত্তি। এর পরিণতিতে এক সময়ে ধর্মের ধুয়া তুলে ব্রিটিশ ভারত থেকে বিছিন্ন হয়ে তারা যে ইসলামী পাকিস্তান কায়েম করেছিল তার ধ্যান-ধারণাও অর্থহীন হয়ে পড়বে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানে ইসলামের নামে পাঞ্জাবি মিলিটারি ও আমলাতন্ত্র সিন্ধি,সরাইকি, পাখতুন ও বালুচরদের উপর শাসন শোষণের যে

জোয়াল চাঁপিয়ে দিয়েছে একদিন তারা তা কাঁধ থেকে ফেলে দিয়ে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। যদি তা হয় তবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছাড়া পাকিস্তানের আর কোথাও স্হান হবার নয়। প্রতিবেশি ভারতের সাথে বাংলাদেশের সৎপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব পাকিস্তানের চোখে আরো একমুঠো বালি নিক্ষেপ করে। এক্ষেত্রে কেবল পাকিস্তান নয় তার সে সময়ের আন্তর্জাতিক মুরুব্বি চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ইসলামের নামাবলি পরিয়ে এক অবিবেচক পাকিস্তানকে পেলে -পুষে টিকিয়ে রাখতে পারলে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভারতের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য মাঝে মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়ার যে স্বত:সিদ্ধ নিয়মটি এতোদিন তারা প্রয়োজন মতো প্রয়োগ করে আসছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যতিব্যস্ত ভাঙ্গা পাকিস্তানকে দিয়ে সেটা কিছুতেই আর হবার নয়। কেবল হতে পারে যদি নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের ভেতরেও ভারত বিরোধী একটি ধর্মোন্মাদনা জাগিয়ে তোলা যায়। কিন্তু সে পথে সব চেয়ে বড় বাধা সে দেশের জন্মদাতা রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান এবং সে দেশের গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শাসনতন্ত্র। বাংলাদেশকে আরেক পাকিস্তান বানাতে হলে এ দুটিকে একযোগে আঘাত করতে হবে। কি করে? কে করবে? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তা সম্ভব নয়। পাকিস্তান গণতন্ত্রের ধার কখনো ধারেনি। তার বিশ্ব মুরুব্বি আমেরিকার কাছে তখন গণতন্ত্র অর্থ নিজের দেশে নির্বাচিত সরকার আর তৃতীয় বিশ্বে মার্কিন স্বার্থের সেবাদাস সামরিক একনায়কতন্ত্র। কাজেই সামরিক বাহিনী দিয়ে ক্ষমতা দখল করানোই একমাত্র উপায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পথে সব চেয়ে বড় বাধা বঙ্গবন্ধুর গগণচুম্বি জনপ্রিয়তা। সশস্ত্রবাহিনীতেও তাঁর অনুসারীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। অতএব ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দাও। পথের বাধা অপসারণ করতে হবে সকলের আগে। সেনাবাহিনীতে পাকিস্তানপন্থীরাতো আছেই। তাদেরকে তৈরি করার কাজ শুরু হলো। এরা দীর্ঘদিন পাকিস্তানে সামরিক শাসনের হাতিয়ার হিসেবে নিজেদেরকে দেখে এসেছে। দেখেছে সামরিক শাসন থাকলে দেশের যতো সর্বনাশই হোক না কেন তারা নিজেরা থাকে সবার চাইতে ভালো। টাকা-কড়ি, সুযোগ-সুবিধা, জমি-জিরাত, ব্যবসা-বাণিজ্য সবক্ষেত্রে তাদেরই থাকে একচ্ছত্র আধিপত্য। অথচ গণতান্ত্রিক শাসনে তাদের সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ কোথায় হারিয়ে যায়। তখন জনগণের ভালোমন্দই হয়ে পড়ে শাসন ব্যবস্হার মূল চালিকাশক্তি। সেনা কর্মকর্তাদের একটি অংশের সেটা মন:পূত নয়। ষড়যন্ত্রের সাথে বেসামরিক কিছু লোককেও জড়িত করা হলো। সামরিক শাসনকে হালাল করতে কিছু বেসামরিক পদলেহির দরকার হয়। খন্দকার মোশতাক,চাষী মাহবুবুল আলম,তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন,ওবায়দুর রহমান -এরকম কিছু সিভিলিয়ান লোককে জড়ো করা হলো। সশস্ত্রবাহিনীর ভেতরে সংঘবদ্ধ গ্রুপটি ঝাঁপিয়ে পড়লো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অতি প্রত্যুষে। তখন সবেমাত্র ফজরের আজান পড়ছে। মুয়াজ্জিনের কন্ঠ থেকে ধ্বনিত হচ্ছে ঘুম থেকে উঠে নামাজে শরিক হবার উদাত্ত আহ্বান। ঠিক সে সময়ে তারা হামলা করলো বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। সেনাবাহিনীর উর্দি পরা মনুষ্যবেশী একপাল ক্ষুধার্ত নেকড়ে নিমিষে সবকিছু তছনছ করে দিলো। অনর্গল রক্ত ধারায় আপ্লুত হলো শুধু কি বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়িটি?না,সে রক্তে প্লাবিত হয়ে গেলো ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলব্যাপী পৃথিবীর মানচিত্রে সদ্য স্হান করে নেয়া সবুজ বাংলাদেশ। হাজার বছর ধরে বিদ্যাপতি,কবিকঙ্কন আর রবীন্দ্রনাথ তিল তিল করে বাংলার যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন ঘাতকের বুলেটের আঘাত তাঁকে ঝাঁঝরা করে দিলো। নজরুলের আগুনঝরা ছন্দের বাণী স্তরে স্তরে সন্নিবদ্ধ করে যে বিদ্রোহী তার চির উন্নত শির তুলে বাঙালি জাতিকে আঁধার থেকে আলোর সড়কে উত্তীর্ণ করেছিল, দোতলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়লো তাঁর প্রাণহীন দেহ। শরতের প্রথম প্রভাতে ৩২ নম্বরের সেই বাড়ির প্রাঙ্গণে ঝরা শিউলির শুভ্র পাপড়িতে ছিটকে পড়লো লাল রক্তের ছোপ। পুবের আকাশে তখন জেগে উঠেছে জাতির পিতার রক্তে ভোজা হৎপিন্ডের মতো টক টকে লাল ১৫ আগস্টের সূর্য। খুনি মোশতাক তার মস্তকাচ্ছাদনটিকে ঘোষণা করলো ‘জাতীয় টুপি’ হিসেবে। ইসলামীকরণের প্রথম পদক্ষেপ। সৌদি আরব এতোদিনে স্বীকৃতি দিলো বাংলাদেশকে। ইসলামীকরণের দ্বিতীয় নমুনা। এলো খুনি জেনারেল জিয়া। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের নাম নিশানা মুছে ফেলার চূড়ান্ত আয়োজন। রাষ্ট্রের মূল চার নীতি থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ,ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়া হলো। এলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এদেশের লোকের যে জাতীয়তা পরিচয় সেটা।ধর্মনিরপেক্ষতাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া হলো সংবিধান থেকে। শুরুতে যোগ করা হলো ” বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”। সংবিধানের চেহারায় ইসলামী তুলি কলমের আরেক পোচ। শুরু হলো দেশ জুড়ে সিরাত মাহফিল, ইসালে সওয়াব আর মসজিদ বানানোর হিড়িক। এখানে ওখানে কথিত পীরদের ওরস জমে উঠলো রাতারাতি। জিয়া নিজেও যেতেন, তার সাঙ্গপাঙ্গরাও যেতেন। আইন করে নিষিদ্ধ করা হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। পরবর্তী সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ এসে শেষ তিলক এঁকে দিলেন সংবিধানের কপালে। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। উদ্দেশ্য ঐ একটাই, বাংলাদেশকে আরেক পাকিস্তান বানানো। নিদেনপক্ষে পাকিস্তানের ভূত বানানো। শুরু হলো বাঙালিকে তার জাতীয় অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দেয়ার হাস্যকর প্রচেষ্টা। বাঙালি জাতিসত্তাকে মুছে ফেলার হীন ষড়যন্ত্র। জাতির পিতাকে সপরিবারের হত্যার বিচার হয়েছে তবে বাকি খুনিদের বিদেশ থেকে এনে ফাঁসি কার্যকর এবং হত্যার নেপথ্য কুশিলপদের বিচার করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পুরোপুরি কলঙ্ক মুক্ত হবে। বাংলাভাষী বাঙালির এক হাজার বছরের ইতিহাসে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাই মহত্তম রাজনৈতিক অর্জন এবং এর রুপকার হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির ইতিহাসে, সে-ইতিহাসকে বিকৃত করার যত চেষ্ঠাই হোক না কেন,অমর আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে যে-পরিবর্তন ঘটানো হলো, তাতে প্রথমেই বর্জিত হয়েছিল সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সেদিন থেকে বাঙালি এগিয়ে যাবার বদলে আবার পেছনে হাঁটতে শুরু করেছে। মানুষকে মনুষ্যত্বের মর্যাদা দেবার সাংবিধানিক অধিকার হরণ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই পশ্চাদগামিতা। ঠান্ডা মাথার খুনি জিয়াউর রহমান সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গিকারগুলোকেই অস্বীকার করলো না, জেনারেল জিয়া তার সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করলেন এমন একজন রাজাকারকে যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধচারণ করেছিলেন। জিয়া বাংলাদেশে নতুন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রবর্তনের পথকে উন্মুক্ত করলেন। তিনি সমাজতন্ত্রকে পরিত্যাগ করে ‘ money is no problem ‘ বলে বিরাষ্ট্রীকরণের মাধ্যমে যে-লুন্ঠনের সামাজিক অর্থনীতির ভিত্তি রচনা করলেন,তার ফলে আজ বাংলাদেশের সমাজ জীবনে যে বিরাট বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তা বাঙালিকে কোন অবিমিশ্র অন্ধকারের পথে নিয়ে যাচ্ছে কে জানে?

বিভীষিকাময় ২১ শে আগস্ট ইতিহাসের আরেকটি কলঙ্কময় দিন। মৃত্যু-ধ্বংস রক্তস্রোতের সেই ভয়ঙ্কর -বিভীষিকাময় রক্তাক্ত ২১ আগস্ট। বারুদ আর রক্তমাখা বীভৎস রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ। সভ্যজগতের অকল্পনীয় এক নারকীয় হত্যাকান্ড চালানো হয় ২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট। গ্রেনেডের হিংস্র দানবীয় সন্ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতাকে। রক্ত-ঝড়ের প্রচন্ডতায় মলিন হয়ে গিয়েছিল বাংলা ও বাঙালির মুখ। জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। শোকাবহ রক্তাক্ত আগস্ট মাসেই আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর লক্ষ্য থেকে ঘাতক হায়েনার দল গ্রেনেড দিয়ে রক্তস্রোতের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ের আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সমাবেশস্হল। টার্গেড ছিল এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামীলীগকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বশূণ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতেই ঘাতকরা চালায় দানবীয় হত্যাযজ্ঞ। জাতির সামনে সবকিছু আয়নার মতো পরিষ্কার হয়েগেছে। স্বাধীনতা বিরোধী হায়েনার ছোবল থেকে অল্পের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনন রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ আওয়ামীলীগের ২৪ জন নেতা-কর্মীর তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়। বাঙালি জাতির শেষ আশা-ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল মমতাময়ী নেত্রী শেখ হাসিনার শ্রবণ শক্তি অনেকাংশে লোপ পায় ঐ নারকীয় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায়। আহত হওয়া পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীর অনেকেই ঘাতক গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের দুর্বিষহ যন্ত্রণা দিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। হাত-পা চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে অসংখ্য নেতা-কর্মী পঙ্গুত্ববরণ করে জীবনধারণ করছে। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতে সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকচক্র। ঘাতকের গ্রেনেড হামলায় রীতিমতো রক্তগঙ্গা বইয়ে গিয়েছিল আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের প্রাঙ্গণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের খুনি চক্র একইভাবে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল জাতির পিতার শেষ স্মৃতি চিহ্ন। ১৫ আগস্টে দেশের বাহিরে থাকার কারণে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। খুনিদের টার্গেড ছিল চিরতরে বঙ্গবন্ধুর রক্তের শেষপর্যন্ত মুছে ফেলা। আর সেই টার্গেড মোতাবেক স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, ঠান্ডা মাথার মাস্টার মাইন্ডেড খুনি, অপরাধ জগতের গডফাদার, অবৈধ শাসক জেনারেল জিয়ার, দল বিএনপি ও জামাত সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পৃথিবীর ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল ঘাতকরা। আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশের ঐ গ্রেনেড হামলা ছিল স্বাধীনতা স্বপক্ষের শেষ সূর্যটিকে অস্তমিত করার শামিল। তৎকালীন বিএনপি জামাত সরকারের সন্ত্রাসী হামলা আর পঁচাত্তরের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ একই ধরণের। একই গোষ্ঠীর কাজ। সুতরাং আর যাহাতে কোনো পঁচাত্তর ও একুশে আগস্ট না ঘটে সেই ব্যাপারে সবার সু-দৃষ্টি রাখতে হবে। জাতির পিতার শেষ স্মৃতিটুকু আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে, আমাদের স্বার্থেই।