সুন্দরবনে তিন মাস পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে পর্যটকবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘসময় ব্যবহার না হওয়ায় এসব ট্রলার অচল হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ মালিকদের।
ট্রলার মালিকরা জানান, প্রতিবছর বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় ১জুন থেকে ৩১আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সময় পর্যটকবাহী ট্রলারগুলো নদীতে না চলায় ইঞ্জিন, কাঠামো ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তারা আরও জানান, ট্রলার রক্ষণাবেক্ষণে বাড়তি খরচ, এনজিও’র কিস্তির চাপ ও কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে অনেক মালিক আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
রবিবার (১০ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে নীলডুমুর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়Ñ কয়েকটি ট্রলার চলাচল না করার কারণে নদীর জোয়ারের পানিতে ডুবে রয়েছে। এ বিষয়ে ট্রলার মালিক নুর ইসলাম নুর ইসলাম বলেন, আমার দুইটি বোর্ড নদীর পানিতে নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তিন মাস সুন্দরবনের পর্যটক পাস বন্ধ হওয়ার কারণে এভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে।
ট্রলার মালিক ও শ্রমিকরা দাবি করেছেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও ট্রলার সংরক্ষণের উপযুক্ত উদ্যোগ নেওয়া হোক।
সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এ বিষয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, সরকারিভাবে ৩ মাসের জন্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য সকল ধরনের প্রবেশ বন্ধ। যেমনÑ পযর্টক, জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালসহ অন্যান্য।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন সকল ধরনের পর্যটক, জেলে, বাওয়ালীগণ।
মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে সুন্দরবনে সব ধরণের মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মৎস্য অধিদপ্তর এবং বন বিভাগ। শনিবার (২০ মে) থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জেলেরা সুন্দরবনে মাছ শিকার করতে পারবেনা। এছাড়া ১লা জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটনবাহী নৌযান চলাচলও সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
এদিকে, বছরের বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলেরা সাগর এবং সুন্দরবনে মাছ ধরতে পারেন না। তার মধ্যে আবার দুর্যোগ তো রয়েছেই। ফলে উপকূলের জেলেদের বছরের বেশিরভাগ সময় কাটে খেয়ে, না খেয়েই। তাই জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানসহ নিষেধাজ্ঞা চলাকালে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার মতো সরকারি সাহায্য পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন উপকূলের জেলেরা। বেশিরভাগ জেলে কোনো সাহায্য সহযোগিতা না পাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে সাগরে ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়তে হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপকূলের জেলেদের সরকারি সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা করা গেলে প্রজনন মৌসুম যেমন নির্বিঘ্ন হবে, তেমনি মাছ ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও বাড়বে।
মোংলার চিলা ও কলাতলা এলাকার কয়েকজন জেলে বলেন, বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। যখন একটু মাছ ধরার সময় পাই তখন আবার থাকে ঝড়-জ্বলোচ্ছাস। বেশিরভাগ সময়ই নৌকা-জাল নিয়ে ঘাটে বসে থাকতে হয়। মহাজনের কাছ থেকে দাদন/ঋণ নিয়ে নৌকা ও জাল তৈরি করেছি। মহাজনকে কম-বেশি দিয়ে কোনোরকম সংসার চলতো। এখন তিন মাসেরও বেশি সময়ের এ নিষেধাজ্ঞায় আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। আমাদের তো জাল ধরা ছাড়া অন্য কোনো আয়ের পথ নেই। সরকার যদি আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সাহায্য করে তাহলে কোনোরকমে বেঁচে থাকব।
উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে নিবন্ধিত ২৬৪০ জেলের প্রত্যেককে দুই দফায় ৮৬ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। তবে এখানে নিবন্ধিত ছাড়াও আরও ২৫০০ জেলে রয়েছেন। এছাড়া সুন্দরবন নির্ভরশীল জেলে রয়েছেন আরও ৫ হাজার। ফলে এসব জেলেকে নিষেধাজ্ঞাকালে মাছ শিকার থেকে বিরত থাকতে হবে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ২০ মে থেকে সাগরের পাশাপাশি সুন্দরবনেও মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এছাড়া ১লা জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম হওয়াতে এই সময়েও সুন্দরবনের নদী-খালে কোনো প্রকার মাছ শিকার করতে পারবেনা জেলেরা। এছাড়া বন্ধ থাকবে পর্যটনবাহী নৌযান চলাচলও। কারণ নৌযান চলাচলে মাছের প্রজনন এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ ও নৌযানের বিকট শব্দে বন্যপ্রাণীর বিচরণসহ প্রজনন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়ে থাকে। তাই সুন্দরবনে জেলে ও পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকে তিন মাস ধরেই।
একেক ঋতুতে সুন্দরবনের একেক রূপ। তবে অনেকের কাছে সুন্দরবন ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় বর্ষাকাল। বনের সবুজ সৌন্দর্য যেন এই সময়টায় দেখা মেলে। নদীর পানিতে কমে যায় লবণাক্ততা। বর্ষার মিষ্টিপানির ছোঁয়ায় পশুপাখিরাও যেন মেতে ওঠে আনন্দে। পশুপাখিদের এই আনন্দে যেন ছেদ না পড়ে, এ কারণে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখে বন বিভাগ। এই প্রজনন মৌসুমের সময় বনে কোনো জেলে-বাওয়ালিকেও ঢুকতে দেওয়া হয় না। ওই সময়ে নিজেকে বিকশিত করার সময় পায় সুন্দরবন। এবারও তাই হয়েছিল। তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন।
যাঁরা সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য রইল ১০টি পরামর্শ।
১. খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায়। দিনে দিনে সুন্দরবন দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে মোংলা থেকে করমজল অথবা হাড়বাড়িয়ায়, খুলনা থেকে কালাবগী অথবা শেখেরটেক এবং সাতক্ষীরা থেকে কলাগাছিয়া অথবা দোবেকী। তবে হাড়বাড়িয়া, শেখেরটেক ও দোবেকীতে যেতে হলে বন বিভাগের আলাদা অনুমতি নিয়ে যেতে হবে।
২. বাগেরহাটের মোংলা থেকে পশুর নদ হয়ে করমজল ও হাড়বাড়িয়া, খুলনা থেকে রূপসা-শিবসা নদী হয়ে কালাবাগী ও শেখেরটেক এবং সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে কলাকাছিয়া ও দোবেকীতে ট্রলার নিয়ে যাওয়া যায়। পর্যটকদের সুন্দরবন ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য বাগেরহাটের মোংলা, খুলনার চালনা ও সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় অনেক ট্রলার রয়েছে।
৩. ট্রলারে করে করমজল, কালাবগী ও কলাগাছিয়া পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে আসতে ট্রলারপ্রতি খরচ হবে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। হাড়বাড়িয়া, শেখের টেক ও দোবেকী যেতে খরচ হবে ৬ থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতিটি ট্রলারে ২০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত যাওয়া যায়।
সুন্দরবনে থাকতে হলে ট্যুর অপারেটরদের সাহায্য নিতে হবে
৪. সুন্দরবনে থাকতে হলে ট্যুর অপারেটরদের সাহায্য নিতে হবে। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য সাধারণত তিন দিন দুই রাতের প্যাকেজ থাকে। তারাই আপনার ভ্রমণের অনুমতিসহ সবকিছুর দায়িত্ব নেবে।
৫. খুলনা ও মোংলায় রয়েছে এমন শতাধিক ট্যুর অপারেটর। ঢাকাতেও মিলবে। প্যাকেজের আওতায় সুন্দরবনের করমজল, হাড়বাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, জামতলা সমুদ্রসৈকত, দুবলারচর, হিরণ পয়েন্ট, মান্দারবাড়িয়া, বঙ্গবন্ধুর চর ঘুরে দেখা যায়।
৬. তিন দিনের প্যাকেজে খরচ পড়ে জনপ্রতি ৭ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত লঞ্চে খরচ পড়বে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার টাকা।
৭. কাঠের ট্রলারে করে খুলনা ও সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের সুযোগ আছে। ওই ভ্রমণে খুব কাছ থেকে সুন্দরবনকে উপভোগ করার সুযোগ মিলবে। একটি ট্রলারে ১০ থেকে ১৫ জনের মতো থাকার সুবিধা রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য ট্রলারে থাকবেন বনরক্ষী ও গাইড। সাধারণত পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পট ঘুরে দেখানো হয়। দুই রাত তিন দিনের এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ইচ্ছেমতো ঘোরার সুবিধা। জনপ্রতি খরচ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা।
৮. সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এ বছর থেকে বন বিভাগ প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এ কারণে প্লাস্টিকের বোতল ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা যাবে না।
৯. সুন্দরবন ভ্রমণে বন বিভাগের অনুমতি পাওয়ার জন্য লাগে জাতীয় পরিচয়পত্র। কমপক্ষে ৫ দিন আগ থেকে ট্যুর অপারেটরগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।
১০. সুন্দরবনে ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েও বনে প্রবেশ করা যাবে না। কারও কাছে এ ধরনের জিনিস পাওয়া গেলে আইনগতভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বন বিভাগ। বনের পশুপাখিরা বিরক্ত হয়, এমন কোনো কাজ করা যাবে না।
Leave a Reply