জীবনের সাথে চলছে প্রতিনিয়িত লড়াই, জীবন চলে না বলেই এখন তারা নদীতে
সামিউল মনির, শ্যামনগর: ঘড়ির কাঁটা তখন ছয়টা বেঁজে আরও কিছুদুর এগিয়েছে। বেলা প্রায় ডুবুডুবু। বাড়িতে সন্ধ্যাবাতি জ্বালানোর সময় হয়ে গেছে। তবু চুনকুড়ি নদীর চরে (কলবাড়ি ব্রিজ সংলগ্ন অংশে) কোমর পানিতে রেণু ধরার কাজে ব্যস্ত দুই নর-নারী।
চরের কাদা ঠেলে খানিকটা এগুতেই জানা গেল নিমাই মন্ডল ও শিবানী নামের ঐ দুই নর-নারী সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের আবাদচন্ডিপুর গ্রামে তাদের বসবাস। সংসারের ঘানি টানতে যেয়েই আজ তারা হাতে তুলে নিয়েছে ত্রিকোনা করে তৈরী নেট জাল। সকাল সন্ধ্যা দু’বারের ভাটার সুযোগে এ চুনকুড়ি নদী থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বাগদার রেণু বিক্রি করে চলে তাদের সংসার।
নিমাই মন্ডলের ভাষ্য পৈত্রিক ১৫শতক জমি তিন ভাইকে সমান অংশ নিতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে একটি ছোট মুদি দোকান দিলেও সেখানে আয় রোজগার নেই। নিরুপায় হয়ে স্ত্রীর হাত ধরে তিনি নেমে পড়েছেন নদীতে মছের রেণু শিকারের কাজে। প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে চুনকুড়ি নদীতে পৌঁছতে হয় বলেও জানান তিনি।
‘সারাদিন চরের কাঁদা ঠেলতি ঠেলতি বাড়িঘরে গেলি আর পা চলে না’- দাবি করে শিবানী জানান তাদের দু’জনের উপার্জনে চারটে মুখ চলে। এর সাথে ঔষধ পথ্যি, আর দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচসহ তাদের নিত্য নুতন আবদার তো আছেই।
ভারাক্রান্ত কন্ঠে শিবানী জানায় এভাবে নদীতে জাল টেনে সংসার চালাতে হবে কোনদিন কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু নিয়তি আজ সেখানে দাড় করিয়েছে। বাবার বাড়ির লোকজন আর পরিচিতজনদের নদীর পাশ দিয়ে যেতে দেখলে শুরুতে কিছুটা ইতস্তত হতেন তিনি। তবে এখন সব সইয়ে গেছে।
‘কাজ না করলি খাব কি, ছাওয়াল দু’টোর মুখি কি তুলে দিব’ কথাগুলো শেষ হতেই কান্নায় আটকে যায় শিবানীর কন্ঠ। নিজেকে সামলে নিয়ে শিবানী অভিযোগ করেন মাঝেমধ্যে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড এসে এসব জাল ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়েও দেয়। পরে আবার ঋণ-পাতি করে জাল দোড়া বানাতে হয় আরও অনেকের মত তারও।
পাশে দাঁড়ানো তার স্বামী নিমাই শান্তনা দিয়ে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, আশপাশে কত সরকারি খাস জমি রয়েছে। সব জমি বড় লোকেরা ইজারা নিয়ে শত শত বিঘা চিংড়িঘের করেছে। অনেকে আবার শ্রেনী পরিবর্তন করে চাষের জমি হিসেবে ভোগ দখল করছে। এদিকে আইলার পর থেকে এলাকায় কোন কাজ নেই। সরকারি জমিগুলো ভুমিহীনদের মাঝে ইজারা দিলে সামান্য হলেও ধান বা সবজী চাষ করে জীবনটা বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতে পারতো অনেকে।
তবে এমন জীবনের গল্প কেবলই নিমাই ও শিবানীর না। বরং নীলডুমুরের আয়েশা, কদমতলার শাপলা, পশ্চিম কৈখালীর জমির গাজী-সোনাভান আর কালিঞ্চির শুকজান বিবিসহ আরও অসংখ্য মানুষের। তাদের ভাষ্য জলবায়ুর পরিবর্তিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে আজ তাদের এমন দুর্দশা। জলবায়ুর অভিশাপ নিয়ে আজ তারা বাসস্থান ছাড়াও সুপেয় পানি পানি, রান্নার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানীসহ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। এমনকি জীর্ণশীর্ণ উপকুল রক্ষা বাঁধও প্রায়শই তাদেরকে নির্ঘুম রাত কাটাতে বাধ্য করে। তবে সবকিছুর আগে তাদের দরকার পড়ে ক্ষুধা নিবারণের। সেজন্য তারা অন্য সব চিন্তা দুরে ঠেলে পেটের জ্বালা সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে পাশের নদীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
গত শনিবার সরেজমিন এসব এলাকা পরিদর্শনকালে জানা যায় হতদরদ্রি এসব মানুষগুলোর সকাল শুরু হয় পাশের চুনকুড়ি, মালঞ্চ, খোলপেটুয়া আর সামীন্তবর্তী কালিন্দি নদীতে জাল টানার মধ্য দিয়ে। জোয়ার সৃষ্টি হলে তারা উপরে উঠে আসলেও পরবর্তী ভাটার সুযোগে আবারও জীবীকার সন্ধানে তারা নেমে পড়ে কামোট-কুমিরের ডেরায়।
তবে শুধু এসব মানুষগুলোই না। বরং পারিবারিক প্রয়োজনে অনেকে আবার নিজেদের ছোট ছোট শিশু সন্তানদেরও নদীতে মাছ ধরার কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় উপার্জিত অর্থেই কোন রকমে চলে তাদের দৈনন্দিন জীবন-সংসার।
কালিঞ্জি গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বয়সী শুকজান বিবির দাবি তার স্বামী অনেক আগে মেয়েসহ তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে। নদীতে মাছের রেণু ধরে একমাত্র সন্তানকে কলেজে পাঠিয়েছে। বসতভিটা বলতে পিতার দেয়া দেড় শতক জমি থাকার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন সরকারের খাস জমিগুলো বড়লোকের দখলে। মেয়েটার বিয়ে দিতে গেলেও একটা বাড়িঘর লাগে, তার কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে নদীতে রেণু ধরছি আর আল্লাহর উপর ভরসা করে আছি।
নীলডুমুর গ্রামের আরোহী জানায় সে পাশের ফরেষ্ট মাধ্যমিক বিদালয়ে ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। পিতা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তাই বিদ্যালয়ে ক্লাসের ফাঁকে মায়ের সাথে মিলে খোলপেটুয়া নদীতে মাছের রেণু শিকার করে। এভাবে দু’বেলা নদীতে নামার কারনে ঘাঁ-পাচড়াসহ নানা রোগে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হতে হয়-উল্লেখ করে ছোট্র এ শিশু আরও জানায় পড়ালেখার ইচ্ছা থাকলেও মায়ের সাথে সংসারের জন্য আয় রোজগারে ব্যস্ত থাকতে যেয়ে সময় চলে যায়। তারমত আরও অসংখ্য শিশু একইভাবে পাশের নদীতে রেণু ধরে পরিবারের অভাব পুরণে ব্যস্ত বলেও দাবি ঐ ছোট্ট শিশুর।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তর খুঁজেও একেবারে উপকুলীয় জনপদ শ্যামনগরের প্রকৃত বাস্তহারার সঠিক চিত্র পাওয়া যায়নি। তবে সুন্দরবন তীরবর্তী গাবুরা ইউনিয়নের প্রায় তিন শ’ এবং পদ্মপুকুর ইউনিয়নের দেড়শ শতাধিক পরিবারের পাশাপাশি উপজেলার অপরাপর অংশ হতে আরও তিন শতাধিক বাস্তুহারা পরিবারের তথ্য দেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগন।
বাস্তুহারা হওয়ার কারন উল্লেখ করতে যেয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন স্বদেশ পরিচালক মধাব দত্ত জানান সকলে মুলত ক্লাইমেট ভিকটিম। নির্দিষ্ট কোন উপজেলার চিত্র না থাকলেও সাতক্ষীরার ৪৭টি বস্তিতে অন্তত ১৫ হাজার বাস্তুহারার বসবাস। তিনি আরও জলেন, বাস্তুহারা হওয়ার কারনে এসব পরিবারের শিশুরা পরিচয়পত্রসহ নানামুখী সমস্যায় নিপতিত। এছাড়া এসব পরিবারগুলো স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত। সরকারের উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাস্তুহারায় পরিণত পরিবারগুলোর স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) রাশেদ হোসাইন জানান, উপজেলায় মোট খাস জমি ৯ হাজার ৬৭৭.৪৩ একর। বন্দোবস্ত অযোগ্য ৬ হাজার ৭৬২.৮৩ একর। বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়েছে ২৮শত ৬৩ একর। এখনো বন্দোবস্তযোগ্য কিছু জমি থাকলেও মামলাসহ নানাবিধ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. রনী খাতুন জানান ১০ শতকের নিচে জমি রয়েছে এমন যে কেউ সরকারি ইজারাযোগ্য খাস জমি বন্দোবস্ত পেতে পারে। তিনি আরও জানান এমন কোন অভাবী নিরাশ্রয় মানুষ আবেদন করলে অবশ্যই সরকার তার জন্য ইজারাযোগ্য জমি বরাদ্দ দিবে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দূর্যোগে নারীরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। অধিকাংশ সময় প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করতে চলে যাচ্ছেন। ফলে অভিভাবকশূন্য পরিবারটির সব দায়িত্ব পড়ে যাচ্ছে নারীর উপর। অনেক সময় কাজের সন্ধানে বাইরে থাকা স্বামীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারে না নারী। ফলে দিন দিন তাদের পারিবারিক বন্ধন ক্ষীণ হতে থাকে। তাছাড়া অনেকে সময়মতো সাংসারিক খরচ পাঠাতে পারে না। এতে বাড়িতে থাকা নারীকে সংসার সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। আবার অনেক বিধবা নারীর পরিবারে উপার্জন করার মতো কোন লোক না থাকাই সমস্ত দায়িত্ব ঐ নারীকেই নিতে হচ্ছে। নারীর দায়িত্ব তখন সংসার সামলানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন ধারনের জন্য অর্থ উপার্জন করার দায়িত্ব ওই নারীকেই নিতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় তাকে। ফলে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আর নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার কারণে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
উপকূল অঞ্চলে নদী ভাঙ্গন ও নানা ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে এবং লবণ পানির চিংড়ি ঘেরের দাপটের কারণে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন। এদের বেশির ভাগই কৃষি বা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল মানুষ। পুরুষ শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে গেলেও বেশির ভাগ সময় নারী শ্রমিকরা বাড়িতে বেকার পড়ে থাকেন। অর্থ উপার্জনের বিকল্প কোন পথ না থাকায় নারীরা তখন বাধ্য হচ্ছেন নদীতে মাছের রেনু পোনা সংগ্রহ করতে।
উপকূল অঞ্চলের শ্যামনগর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামের একাদশী মন্ডল (৪৬) বলেন, ‘অনেক সময় ভোর রাতে নদীতে জাল টানতে গেলে খুব ভয় লাগে। নদীতে কামট, কুমোর, সাপ, সোস থাকে আবার হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যখন তখন ঝড় উঠতে পারে যে কোন মুহুর্তে বিপদ আসতে পারে। তাছাড়া নদীর পানির ভিতর সবুজ রঙ্গের কিরাল সাপ (সাপটি লম্বা হয় ৩/৪ ফুট এবং চওড়া হয় ২/৩ ইঞ্চি) থাকে কামড় দিলে মানুষ বাঁচে না। শুধু সংসার চালাতে ভয়ডর বাদ দিয়ে নদীতে পোনা ধরতে নামতে হচ্ছে।’ পাখিমারা গ্রামের বিধবা নারী নুরনাহার (৪৮) বলেন, ‘হ্যাচারীর মালিকরা সাগর থেকে মা মাছ ধরে নিচ্ছে এবং তাছাড়া নদী মরে যাচ্ছে। তাই সাগর থেকে মাছ উপরের দিকে আসতে পারছে না। যে কারণে নদীতে মাছ ও পোনা কম পড়ছে। তাছাড়া নদীতে জেলের সংখ্যা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যদি ১০ জন জাল টানতো কিন্তু বর্তমানে ১০০ জন জাল টানছে।’
অন্যদিকে কামালকাটি গ্রামের সীতা রাণী মন্ডল (৪৯) বলেন, ‘প্রতিদিন ৪/৫ ঘণ্টা লবণ পানিতে থাকার কারণে গা হাত পা চুলকায়, পানির ভিতর নোনা পোকা থাকে সেটা গায়ে লাগলে ঘা হয়ে যায় এবং প্রচুর জ্বালা করে। উরুতে এক ধরনের জাওয়ালী (ফুসকড়ি) বের হয় হাটতে গেলে খুব জ্বালা করে। সমস্ত গায়ে ঘা-পাঁচড়া, এজমা, গা-পা ফোলা, পায়ে কুনুক (নখের কুনি বসা), হাটুতে ব্যাথা, হাত পা খেয়ে যায়, সর্দি জ্বর, মাথা যন্ত্রণা করে। বছরে একটা মোটা টাকা চিকিৎসার পিছনে ব্যয় করতে হয়।’
বন্যাতলা গ্রামের সাবানা খাতুন (২৯) মোমেনা বেগম (৪৭), গড়কুমারপুর গ্রামের মিজানুর রহমান (৪৮),পশ্চিম বিড়ালাক্ষী গ্রামের জহুরা বেগম (৪৫),পদ্মপুকুর গ্রামের রেশমা বেগম (৩০) জানান, বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে চিংড়ীর পোনা আহরণ করছেন। প্রতিদিন ভাটার সময় ছোট জাল দিয়ে শুধু বাগদার পোনা আহরণ করেন। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যে অর্থ পান তা দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে আছেন। গোনমুখে ভাটার সময় ২০০ থেকে ৩০০ টাকার চিংড়ি পোনা আহরণ করেন। উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ চিংড়ি পোনা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাঁরা মনে করেন, নদী থেকে চিংড়ি পোনা আহরণ বন্ধ রাখতে হলে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
Leave a Reply