শ্রীপুরে চাঞ্চল্যকর মানিক হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিল হিরোফা!

আলফাজ সরকার আকাশ শ্রীপুর(গাজীপুর) থেকেঃ-

গাজীপুরের শ্রীপুরে চাঞ্চল্যকর মানিক হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ এর সাথে জড়িত ৫জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার গ্রেফতারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

নিহত মানিক মিয়া (৫৫) পৌর এলাকার কেওয়া পশ্চিম খন্ড গ্রামের মৃত শাহাজ উদ্দিন ছেলে।

গ্রেফতারকৃত ৫জন হলেন, হিরোফা (৩৩) তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামের লিটন মিয়ার স্ত্রী, ২. সোহেল (৩৯) একই ইউনিয়নের গোদারচালা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে। ৩, লিটন মিয়া (৪০) মুলাইদ গ্রামের ইস্রাফিলের ছেলে, ৪.আনোয়ার হোসেন (৭০) উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের গাজীপুর উত্তর পাড়া গ্রামের মৃত আজিম উদ্দিনের ছেলে এবং ৫.একই গ্রামের মোক্তার হোসেনের ছেলে রেজাউল করিম (৩৯)।

আসামীদের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তিঃ-
ছোট একটি টেইলার্সের দোকান দিয়ে স্বামী ও দুই সন্তানসহ ভালই চলছিল হিরোফার জীবন। একদিন কিছু টাকা ঋণ প্রয়োজনে পরিচয় হয় মানিকের সাথে। অন্য পেশার পাশাপাশি সুদে অর্থ বিনিয়োগ করতো মানিক। হিরোফাকে টাকা দিলে প্রয়োজন শেষে উচ্চসুদ সহ মানিকের ঋণ পরিশোধ করে সে। এ পরিচয়ের সুবাদে হিরোফার মাধ্যমে বিভিন্ন মহিলাদের ঋণ দিতো মানিক। ভালো লাভ দেখে হিরোফাও এ ব্যবসায়ে আগ্রহী হয়। বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সুদে বিনিয়োগ শুরু করে ।এভাবেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হলে উকিল বাবা মেয়ের সম্পর্ক হয় তাদের মধ্যে।

কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় সমস্যা। কোন ঋন গ্রহীতা ঋন পরিশোধে ব্যর্থ হলে হিরোফাকে চাপ দিতো মানিক। সিকিউরিটি বাবদ বিভিন্ন সময় ব্ল্যাংক চেক নেয় মানিক। ব্যাংক ও এনজিওর ঋনও বাড়তে থাকলে আসতে থাকে নোটিশ। মানিকের কাছ থেকে ঋন নিয়ে কিছু কিছু ব্যাংক লোন পরিশোধ করে সে। এভাবেই মানিকের উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায় হিরোফার।

একদিন মানিক নিজের অসুস্থতার কারনে চিকিৎসার জন্য তার সাথে ময়মনসিংহ যেতে বলে হিরোফাকে । মানিক উকিল বাবা, তাই সরল বিশ্বাসেই যেতে রাজি হয়। ডাক্তারের এপয়েনমেন্ট একটু বিলম্ব হওয়ায় আশ্রয় নেয় হোটেলে। মানিক হঠাৎ তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দেওয়া শুরু করে। বিনিময়ে তার সকল ঋন পরিশোধ ও বাড়ি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।পরিস্থিতির শিকার হিরোফার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে মানিক। এরপর প্রতিনিয়তই হিরোফাকে ব্যবহার করতো মানিক। হিরোফার ঋন তো পরিশোধ করতোই না বরং নিজের প্রভাব খাটিয়ে অন্য এনজিও আর ব্যাংক থেকে ঋন নিতেও বাঁধা দিতো সে। হিরোফাকে পুঁতুলের মত ব্যবহার করা শুরু করে মানিক। এমনকি মানিককে বাবার পরিচয় দিয়ে পাসপোর্টও করে। চিকিৎসার নামে ভারত গিয়েও তারা একই সাথে থাকে। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ করে বিয়ের প্রস্তাব ও দেয় মানিক। হিরোফা রাজি না হওয়ায় ব্ল্যাংক চেক দিয়ে মামলারও ভয় দেখায়।অনেককে বিষয়টি জানালেও কেও সমাধান দিতে পারায় উপায় না পেয়ে তার রাস্তা থেকে মানিককে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে হিরোফা। স্থানীয় কিছু লোককে টাকা দিয়েও কোন কাজ হয়নি।

অবশেষে তার বাবাকে বিষয়টি জানায় হিরোফা। টাকার বিনিময়ে হলেও কিছু একটা করতে বলে সে। হিরোফার বাবা আনোয়ার একই গ্রামের রেজাউলের সাথে ৩০০০০ টাকা চুক্তি করে। ১১ ফেব্রুয়ারী পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিরোফা ও তার স্বামী লিটন প্রথমে তার বাবা আনোয়ারের বাড়ি যায়। আনোয়ারের অসুস্থতার কথা বলে মানিককে সেখানে ডাকে হিরোফা। মানিক যাওয়ার পর রেজাউল ঐ বাড়ী যায়। সবাই একসাথে নাস্তা করার পর কথা বলতে বলতে হঠাৎ সবাই মানিকের উপড় ঝাপিয়ে পড়ে। প্রথমে তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। তারপর লাশ টেনে নিয়ে যায় বাথরুমের ট্যাংকির কাছে। সেখানে ছুড়ি দিয়ে গলা কেটে ট্যাংকিতে ফেলে দেয়।

এর প্রায় ৩ দিন পর আনোয়ার হোসেন যখন বাথরুমে যায় সেখানে প্রচুর গন্ধ পায়। তখন রেজাউলকে নিয়ে গভীর রাতে ট্যাংকি থেকে লাশ উঠিয়ে পাশের একটি গর্তে মাটি চাপা দিয়ে চলে যায়।

এরমধ্যে ঘটনার পর হিরোফা তার পরিবারসহ কিছুদিন তার ভাই সোহেলের বাড়ি থাকে ও তার পর ঠাকুরগাও চলে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারী মানিকের মোবাইল ব্যবহার করে তার ছেলে মিলনকে টাকা চেয়ে ও মামলা উঠানোর হুমকি দিয়ে মেসেজ দেয় হিরোফা। এদিকে বাবাকে না পেয়ে থানায় সাধারন ডায়েরী করে মানিকের ছেলে মিলন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক এসআই আশরাফুল্লাহ বলেন,
প্রায় ১৫ দিন পর গর্ত থেকে শিয়াল লাশ টি একটু উঠিয়ে ফেললে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। আনোয়ার দ্রুত আবারো তার সহযোগীদের নিয়ে গভীর রাতে গর্ত থেকে লাশটি উঠিয়ে পলিথিনে মুড়িয়ে পাশের ডোবায় কাদায় চাপা দিয়ে রাখে। পরের দিন পাশের বাড়ির এক মহিলা গরু গোসল করাতে গিয়ে লাশটি ভাসতে দেখে । খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশটিকে হাত পা ও মাথা বিহীন উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। নিখোঁজ জিডির ভিত্তিতে পুলিশ মানিকের ছেলে মিলনকেও লাশটি দেখতে পাঠায় কিন্তু লাশটি অনেক বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ছেলে তার বাবাকে চিন্তে পারেনি।

শ্রীপুর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মনিরুজ্জামান খান জানান, ১২ ফেব্রুয়ারীতে করা নিখোঁজ ডায়েরীর সুত্র ধরে এ ঘটনা তদন্তে নামেন। অনেক লোকের সাথে মানিকের খারাপ সম্পর্ক থাকায় সন্দেহভাজন লোকের সংখ্যাও বেশী। সবকিছু বিশ্লেষন করে হিরোফাকে টার্গেট করা হয়। হিরোফা ও মানিক কোথাও গোপনে সংসার করছে বলেও ধারনা করেন অনেকে। বহু খুঁজাখুজিঁর পর হিরোফার ভাই সোহেলের খবর পাওয়া যায়। তার কথা মত প্রথমে ১৬ মে রাতে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাও অভিযান চালিয়ে হিরোফাকে আটক করা হয়।জিজ্ঞাসাবাদে সে মানিককে হত্যার দায় স্বীকার করে। কিন্তু তার পরিবারের অন্য সদস্যদের রক্ষা করতে প্রথমে অন্যলোকদের ও পরে শুধু নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা বলে তদন্তকে অন্য দিকে নিয়ে যায়। এস.আই আশরাফুল্লা ও রাজিব সাহা বিভিন্ন কৌশলে একেরপর এক প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী জানান, নিহত মানিকের ছেলে মিলন থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। এখনও পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত সকল আসামী ১৬৪ ধারায় আদালতে হত্যার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।