শেয়ারবাজার ও প্রস্তাবিত বাজেট যা আছে, যা থাকা উচিত ছিল

19

আবু আহমেদ: প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজার নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এর গুরুত্ব, এটিকে ভালো করতে হবে, বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে, এটিকে অংশগ্রহণমূলক করতে হবে, এর গভীরতা বাড়াতে হবেÑএসব ব্যাপারে তার বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও আন্তরিক। কিন্তু এগুলো করার জন্য যেসব কর্মপন্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল, সেটি বাজেটে দেখিনি। বাজেটে করসংক্রান্ত তিনটি বিষয় দেখেছি। এক. স্টক ডিভিডেন্ড দিলে তার ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। এটা ঠিক, এ অপশন বাংলাদেশে অপব্যবহার হয়েছে। অন্য দেশে বিষয়টি তেমন নয়। অন্য দেশে যখন নতুন প্রজেক্ট স্থাপন বা ব্যবসা স¤প্রসারণ করা হয়, তখনই শুধু স্টক ডিভিডেন্ড দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ ডিভিডেন্ড ঢালাওভাবে দেয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে এটি নিয়ে রেগুলেটর চুপচাপই ছিল। ইদানীং কিছুটা বিরোধিতা করছে। কিন্তু এত বছর চলে গেল, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) যেন ঘুমিয়ে ছিল। কারণে-অকারণে কোম্পানিগুলো স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। তাদের কোনো রকম ব্যবসা স¤প্রসারণ ছিল না, শুধু ক্যাশ আউট হবেÑএ ভয় থেকে স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। বলা যায়, এটি অপব্যবহারের চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। এখানে আরো একটি বিষয় আছে। ব্যাংকিং খাতের কোম্পানিগুলোকে ব্যাসেল-৩-এর শর্তের (রিকোয়্যারমেন্ট) জন্য কিছু স্টক ডিভিডেন্ড দিতে হয়েছে বা হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়, এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর কিছু ছাড় দেয়া উচিত ছিল। কারণ ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর ইকুইটি বাড়াতেই হবে। অনেক ব্যাংকের ইকুইটি পর্যাপ্ত থাকলেও বেশকিছু ব্যাংকের ব্যাসেল-৩-এর টায়ার ১ ক্যাপিটাল, এমনকি টায়ার ২ ক্যাপিটাল অপর্যাপ্ত আছে। সুতরাং সেক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যাংক স্টক ডিভিডেন্ড দেবেই। কোনো কোনো ব্যাংক আয় করল এবং সত্যি সত্যি স্টক ডিভিডেন্ড দিল, ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিল; তাতে আমি অন্তত ক্ষতি দেখি না ব্যাংক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে। আর তারা যদি মনে করে ব্যাসেল-৩ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী তাদের মূলধন পর্যাপ্ত আছে, সেখানে তারা অবশ্যই ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেবে। ওটা ঠিক আছে। ক্যাশ ডিভিডেন্ডকে উৎসাহ দিতে হবে, এ ব্যাপারে তিনি আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু কৌশলটা বোধহয় কিছুটা নমনীয় থাকা উচিত ছিল অথবা ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল।
অনেক বহুজাতিক কোম্পানির ইকুইটি ভিত্তি খুবই ছোট। গত আর্থিক বছরে বার্জার লিমিটেড ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড প্রয়োজনে স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। তাদের মূলধন ভিত্তি অনেক ছোট ছিল এবং টার্নওভার অনেক বেশি ছিল। ওখানে স্টক ডিভিডেন্ড দেয়া মানে তাদের ব্যবসা বিস্তৃত ও বড় হচ্ছে, টার্নওভার বেশি এবং সরকারও বেশি কর পাবে। সর্বোপরি বিনিয়োগকারীরাও উপকৃত হবেন। সেই স্টক ডিভিডেন্ড তাদের আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এরইমধ্যে সেখানে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন এ দুটো ক্ষেত্রে। সুতরাং কারো ৪ কোটি, কারো ১৩ কোটি, কারো ১৪ কোটিÑএ ধরনের বেশ কিছুসংখ্যক বহুজাতিক কোম্পানি আছে। তারা যদি স্টক ডিভিডেন্ড দিতে চায়, তাদের পেনালাইজ করতে হবে কেন? ওইসব ক্ষেত্রে স্টক ডিভিডেন্ড দিলে দেশের মঙ্গল হবে, বিনিয়োগকারীর উপকার হবে এবং আমাদের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অন্যভাবে কর বেশি পাবে। মূলধন ভিত্তি বড় হলে, টার্নওভার বাড়লে তারা মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও মুনাফার ওপর কর বাড়তি পাবে। এখন নির্বিচারে স্থানীয় বা বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা ব্যাংকিং কোম্পানিকে স্টক ডিভিডেন্ড দিলে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে, এটি সমর্থন করতে পারছি না।
দ্বিতীয়ত, স্টক ডিভিডেন্ড বা ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়ার জন্য উৎসাহ প্রদান যৌক্তিক। সেটা করা যেত ক্যাশ ডিভিডেন্ডে কর রেয়াত দিয়ে। স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর কর বসালে ফলাফল হবে স্থানীয় কোম্পানিগুলো যে এতদিন অপব্যবহার করেছে, তারা হয়তো পুরোপুরি ডিভিডেন্ড দেয়াই বন্ধ করে দেবে। তাদের ক্যাশ দেয়ার ক্ষমতা অনেকেরই নেই এবং তারা চোরামি করবে, আয় লুকাবে। তারা যদি স্থিতিপত্রে আয় না দেখায় এবং ক্যাশও দিল না, স্টকও দিল না, তাতে কি বিনিয়োগকারীদের উপকার হবে? এ প্রশ্ন থেকে গেল। অনেক কোম্পানি তখন ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়ার ভয়ে ম্যানুফ্যাকচার্ড ব্যালান্স শিট দেখাবে। তার মানে অর্থমন্ত্রী যে তাদের হিসাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারবেন, সেটি তো আরেক ইস্যু। আমাদের এফআরসি করা হয়েছে। এখনো তা ঠিকমতো ফাংশন করছে না। এখানে রেগুলেটরির ভ‚মিকা ছিল বিএসইসির। সেটিও খুব বেশি ভালো দেখি না।
আরেকটি বিষয়, ক্যাশ বা স্টক ডিভিডেন্ড কেন এবং কখন দিতে হবে, সেটি রেগুলেটরি নির্দেশনার মাধ্যমে ভালো রেগুলেট করা যেতে পারত। ইদানীং সেটি বোধহয় বিবেচনাধীন রয়েছে বিএসইসিতে। আর তা হলো, সেখানে একটি কথা বলা আছে, স্টক ডিভিডেন্ড দিলে ব্যাখ্যা দিতে হবে। আমার কাছে ওই ধরনের একটি বার্তা দিয়ে বা রেগুলেটরি রিকোয়্যারমেন্টসের মাধ্যমে স্টক ডিভিডেন্ডকে নিরুৎসাহিত করা হলে ভালো অপশন হতো। কারণ এখন যেভাবে ঢালাওভাবে সব কোম্পানির ক্ষেত্রে তিনি যে করের বোঝা চাপাতে চাইছেন, সেটি সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ নয়। কোম্পানিভেদে হয়তো পার্থক্য করা উচিত ছিল। কারণ এখানে বহুজাতিক কোম্পানি আছে, ব্যাংকিং কোম্পানি আছে। অন্য বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি আছে। কারো কারো স্টক ডিভিডেন্ড দেয়া দরকার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্টক ডিভিডেন্ড দিলে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে। তবে নন-পারফর্মিং কোম্পানিগুলো সবকিছু করে দিতে পারে। আমাদের দেশের অনেক ভালো কোম্পানি ক্যাশও দিচ্ছে, স্টকও দিচ্ছে এবং সেগুলোর দাম বেশ ভালোই আছে। ইবনে সিনা, রেনাটা, স্কয়ার ফার্মা এরা ক্যাশও দিচ্ছে, স্টক ডিভিডেন্ডও দিচ্ছে। এখন স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর সরকার কর বসিয়ে দিলে তারা আর তা দেবে না। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং এখানে কোম্পানিভেদে বিষয়টিকে দেখা উচিত। স্টক ডিভিডেন্ড দিলে একটি ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের রেগুলেটরি রিকোয়্যারমেন্টস আরোপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আরেকটি কথা হলো, ৫০ হাজার টাকার নিচে ডিভিডেন্ড আয়করমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়নি, এখন সবার কাছ থেকে উৎসে আয়কর কেটে নেয়া হচ্ছে। যাদের মোট ডিভিডেন্ড আয় ৫০ হাজারের নিচে, তারাও কি ১০ শতাংশ উৎসে কর দেবেন? তারা তো ট্যাক্স রিটার্নই জমা দিচ্ছেন না। এখন তারা যদি ট্যাক্স রিটার্ন না দেন এবং তাদের থেকে ১০০ টাকায় যদি ১০ টাকা উৎসে কর কেটে নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে কী হবে? এর একটি ব্যাখ্যা এনবিআর থেকে দেয়া উচিত। আরেকটি বিষয় হলো, এটি বড় ইস্যু নয়। ২৫ হাজার ছিল, ৫০ হাজারের জন্য বিনিয়োগকারীরা তাকিয়ে ছিলেন না কখনো। ১৯৯৬-৯৭ সালে তখনকার আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১ লাখ পর্যন্ত ডিভিডেন্ড আয়করমুক্ত ছিল। পরে সেটি উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন উৎসে কর ১০ শতাংশ কেটে নিত না, ১ লাখ টাকার নিচে যাদের ডিভিডেন্ড আয় ছিল, তারা কোনো করই দিতেন না। তখন উৎসে কর কেটে নেয়ার মতো সংস্কৃতি ছিল না। যা হোক, এখানে কিছু একটা করা উচিত। কারণ ক্ষুদ্র অনেক বিনিয়োগকারী, যাদের ১০ শতাংশ উৎসে কর কাঁটা হচ্ছে, তাদের করযোগ্য আয় হয় না। সেক্ষেত্রে তাদের প্রতি অবিচারই করা হচ্ছে।
কোম্পানিগুলোর ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়াটাই যদি অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যে ভালো ডিভিডেন্ড দিলে শেয়ারবাজার ভালো হবে, সেটিও আমি মনে করি ভালো ডিভিডেন্ডের সঙ্গে শেয়ারবাজারের ভালো হওয়া বা মন্দ হওয়া সম্পর্কিত। সেক্ষেত্রে ভালো ডিভিডেন্ড দেয়া কোম্পানিগুলোকে কর রিবেট দেয়া যেত। সেটি ১৯৯৬, ’৯৭, ’৯৮ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিল। ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশের উপরে ডিভিডেন্ড দিলে তাদের ট্যাক্স রিবেট দেয়া হয়েছিল। এটি পরে তুলে দেয়া হয়েছে। অনেকটা মানুষ জানতও না। হঠাৎৃ দেখা গেল যে ওই কর রেয়াত আর নেই। অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, আপনি যদি সত্যিকারভাবে কোম্পানিগুলোকে ভালো ডিভিডেন্ড প্রদানে উৎসাহিত করতে চান, তাহলে একটি ভালো অপশন হলো, আগে আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসৃত পন্থা আবার ফিরিয়ে আনা এবং সেটি ভালো ফলাফল দিয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি তুলে দেয়া হয়েছে। এখন এনবিআরে একটা ধারণা থাকতে পারে যে এগুলো তুলে দিলে তারা বেশি কর পাবে। এটি সত্য নয়।
একটি বিষয় জোরালোভাবে বলতে চাই। সেটি হলো, শেয়ারবাজার ভালো যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো, বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের অভাব। মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রি অনেকটা মৃত। এখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো সুবিধা নেই। শেয়ারবাজারে আগে আরো কিছু ভালো কোম্পানি ছিল, যেগুলো খারাপের দিকে চলে গেছে। এ অবস্থায় শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে। আমাদের দেশে বেশকিছু ভালো কোম্পানি আছে, কিছু ভালো বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো শেয়ারবাজারের বাইরে। সেগুলোকে কীভাবে শেয়ারবাজারে আনা যায়, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কিছুই বলেননি। সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে আমাদের মতো অর্থনীতিগুলোয় দেখা যায় যে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর কমানো হয়। এখানে এনবিআরের একটি দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, কর কমাতে গেলে তাদের কর সংগ্রহ কমে যাবে। এ কথাটি ঠিক নয়। বরং করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স অন্যান্য দেশের তুলনায় যদি বেশি থাকে, তাহলে কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কায়দায় তাদের আয় কম ডিক্লেয়ার বা ঘোষণা করে কিংবা ট্রান্সফার প্রাইসিংসহ নানাভাবে তারা অর্থ বাইরে নিয়ে যায়। অর্থমন্ত্রীর এ ইস্যুকে অ্যাড্রেস করা উচিত ছিল। এনবিআর নিজেই বলেছে, বিশ্বে করপোরেট করের গড় হার ২৪ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের গড় করপোরেট আয়কর অনেক কম হওয়া উচিত ছিল। কারণ আমরা রিসিভার। আমরা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাই। তাহলে আমাদের করপোরেট আয়কর বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কেন বেশি হবে? এ প্রশ্ন থেকে গেল। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল। দুই. আড়াই কিংবা ৫ শতাংশ কমালে করপোরেট কর, এনবিআরের কর সংগ্রহ আরো বেশি হতো। কারণ তখন সব বহুজাতিক কোম্পানি এখানে বেশি নিট আয় ঘোষণা করত। এখন তারা ট্রান্সফার প্রাইসিং করছে, আয় লুকাচ্ছে এবং বাইরে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এটা এনবিআরকে বুঝতে হবে। কিছু বহুজাতিক কোম্পানি বেশি কর দিচ্ছে, সেজন্য তারা বেশি কর পাচ্ছে। এ কথাটিও ঠিক নয়। আরো কর দেয়ার যোগ্যতা হতো তাদের এবং তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বেশি কর দিতও। কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, বাংলাদেশের একটি বড় বহুজাতিক কোম্পানি করের ভয়ে অর্থ বাইরে পাঠিয়েছে। এখন এগুলোর সমাধানটা কী? সমাধান হলো করপোরেট আয়কর কমানো। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কিছুই বলেননি। কেন কমালেন না, এটার একটা ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল।
আমি যতদূর জানি, অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মত করপোরেট কর কমানোর পক্ষে ছিল। সব চেম্বার, বিনিয়োগকারী এবং কম-বেশি প্রায় সব অর্থনীতিবিদই বলেছেন, করপোরেট আয়কর বাংলাদেশে বেশি। এটি কমানো উচিত। কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির কর কমানোর ওপর কেন আমরা জোর দিচ্ছি? কারণ ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার জন্য আমি তো আর ভালো পথ দেখি না। বর্তমানে যেহেতু শেয়ারবাজারের বাইরে থাকার স্বাধীনতা আছে, সেহেতু তাদের জোর করে শেয়ারবাজারে আনা যাবে না। যদিও সরকার তাদের সিরিয়াসলি অনুরোধও করেনি, অর্থমন্ত্রীর তাদের সঙ্গে বৈঠক করা উচিত ছিল, সেটিও তিনি করেননি। সামনে করবেন কিনা জানি না। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে না পারলে যত কথাই বলা হোক না কেন, পুঁজিবাজার সামনে এগোবে না। এখানে আরেকটি কথা বলা দরকার, সরকারি শেয়ারগুলো গত ১০ বছরে বিক্রি করা গেল না। সাবেক অর্থমন্ত্রী অনেকবার তারিখ দিয়েছেন। অমুক তারিখ থেকে বেচা শুরু হয়ে যাবে ইত্যাদি। কিন্তু গত ১০ বছরে একটি শেয়ারও বেচা যায়নি। এ ব্যাপারে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর একটি বক্তব্য দেয়া উচিত ছিল। অর্থনীতিতে একসময়ে ওইসব শেয়ার কার্যকর সম্পদ ছিল। এখন সেগুলো অকার্যকর সম্পদে পরিণত হয়েছে অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির অধীনে হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ এখন নন-পারফর্মিং। অথচ ১০ বা পাঁচ বছর আগে ওইসব সম্পদ যদি শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হতো, তাহলে এগুলো ভালো সম্পদ (পারফর্মিং অ্যাসেট) হতো, অর্থনীতি লাভবান হতো। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর একটি বিবৃতি দেয়া উচিত ছিল যে আমরা অনেক তারিখ দিয়েছি। কিন্তু এক্সারসাইজ করিনি, ওইসব শেয়ার বেচতে পারিনি। না পারলে কখন পারব বা কখন বিক্রি করা যাবে, এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য আসা উচিত ছিল। কারণ তিনিও অনেক দিন থেকে অর্থনীতিকে কাছ থেকে দেখেছেন বলে আমি মনে করি। তার ফাংশনাল বিষয়গুলো জানার কথা। আমরা সম্পদ নষ্ট হতে দিচ্ছি অথবা সম্পদকে নৈপুণ্যহীন/অকার্যকর সম্পদে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছি, সেক্ষেত্রে সেগুলোকে যদি সময়মতো শেয়ারবাজারে আনা হতো, এমনকি এখনো যদি আনা যায়, তবে তা পারফর্মিং অ্যাসেটে রূপান্তর হবে। এটলাস, উসমানিয়া গøাস প্রভৃতি একসময় অন্যতম ভালো নৈপুণ্য অর্জনকারী কোম্পানি ছিল। আজকে অবস্থাটা কোথায় গেছে! কেন এ সিদ্ধান্তহীনতা? অথবা হতে পারে কেউ বাধা দিয়েছে বা দিচ্ছে? কেউ তো বাধা দেবেই। স্বার্থান্বেষী মহল সবখানেই আছে। তারা নিজস্ব স্বার্থে বাধা দেয়। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল ওইসব বাধা অতিক্রম করে যত দ্রæত সম্ভব শেয়ারগুলোকে বিক্রি করে দেয়া। সে ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। এখন অনেকে ভাবেন, এমনিই বলা হচ্ছে যে সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য সমৃদ্ধ পুঁজিবাজারের সমর্থন দরকার। কিন্তু কথাটি ঠিক আছে। ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ খাত থেকে অর্থ নিলে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় শেয়ারবাজারকে সাপোর্টিং ইনস্টিটিউশন বা সোর্স হিসেবে গড়ে তোলা না হলে উল্লিখিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কীভাবে সম্ভব হবে? হয়তো এটাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এমনিতেই অর্জন হবে। না হলে দেখাতে হবে পুঁজিটা কোত্থেকে আসবে। পুঁজিবাজারের স¤প্রসারণ ও গভীরতা দরকার। যারা ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয় না, শুধু তাদের শাস্তি দিয়ে পুঁজিবাজারকে উন্নত করা যাবে না।
বন্ড মার্কেটও পুঁজিবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের জন্য দরকার। সেটিও কিন্তু গত ১০ বছরে সামনে এগোয়নি। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, যতক্ষণ পর্যন্ত টার্ম লোনের জন্য ব্যাংকের দরজা খোলা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ড মার্কেটের অগ্রগতি হবে না। এখানে আমাদের এই বৈপরীত্য (কনট্রাডিকশন) দূর করতে হবে যে টার্ম লোন যেখানে বড় বড় ব্যবসায়ী সহজেই পেয়ে যান, তখন তারা তো করপোরেট বন্ড ইস্যু করবেন না। তারা ওই ঝুঁকি নেবেন না। ওখানে মাফ পেয়ে যান, খেলাপি হয়ে ডিফল্ট করতে পারেন, তাহলে তারা বন্ড ইস্যু করতে যাবেন কেন? বর্তমান অবস্থায় করপোরেট বন্ড মার্কেট গড়ে উঠবে, সেটা আশা করতে পারি না। এজন্য টার্ম লোন সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে এবং টার্ম লোনের জন্য ব্যাংকের দরজা বন্ধ করে দিতে হবে। বড়জোর ছোট ছোট এসএমইকে দেয়া যেতে পারে, কিন্তু যদি বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে টার্ম লোন পাওয়ার জন্য ব্যাংকের দরজা খোলাই থাকে, তাহলে কখনো করপোরেট বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ঘটবে না। সরকারি বন্ড হতে পারে। সরকারি বন্ডের ওপর লোকের বিশ্বাস আছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিনিয়োগকারীদের কতটুকু বিশ্বাস আছে, সেটিও একটি প্রশ্ন। সুতরাং এসব ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য থাকা উচিত ছিল।
এদিকে অনেকেই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের কথা বলেছেন। সারা বিশ্বে কিন্তু শুধু সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে না। জনগণের অর্থের মাধ্যমে হচ্ছে। অর্থায়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করার উপায় হলো শেয়ারবাজার। কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতীÑএ তিনটি সেতুতে জনগণের অর্থায়নকে সম্পৃক্ত করতে অসুবিধা কোথায়? তিনটি মিলে যদি একটি কোম্পানি গঠন করে শেয়ারবাজারের লিস্টিংয়ে আনা যায়, তাহলে মার্কেট থেকে যে অর্থটা উঠত, সেটি দিয়ে আরো তিনটি সেতু করা যেত। তাহলে কি আমাদের জাপানের দিকে তাকিয়ে ১৫ বছর বসে থাকত হতো? যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজার বড় হয়েছে রেল কোম্পানির শেয়ার দিয়ে। দেশে দেশে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে শেয়ারবাজার থেকে উত্তোলিত অর্থ দিয়ে। থাইল্যান্ডেও হয়েছে। আমাদের দেশে যেসব বড় অবকাঠামো করা হচ্ছে, সেগুলোর যদি বাণিজ্যিক ব্যবহার হয়ে থাকে, যা হওয়া উচিত, সেগুলোকে শেয়ারবাজারে এনে অন্তত ৪৯ শতাংশ শেয়ার অফ-লোড করা যেতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে ৫১ শতাংশ শেয়ারও অফ-লোড করা যেতে পারে। এটা কোনো সমস্যা নয়। অফ-লোড করলে নগদ প্রবাহ বাড়ত, সরকার অর্থ পেয়ে যেত এবং তা দিয়ে আরো বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা যেত। এসব ব্যাপারে বাজেট বক্তৃতায় কোনো মন্তব্য দেখিনি।
প্রথম প্রজন্মের সংস্কার থেকে যা অর্জনের তা অর্জিত হয়েছে। ওই সংস্কারের সঙ্গে বিশ্বায়নের একটি সংযোগ ছিল। সেটি আমরা মোটামুটি ভালোই ব্যবহার করেছি। এখন থেকে আমরা যদি বিচ্ছিন্ন থাকি আর পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী না করি, তাহলে ৮ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধির জন্য টেকসই ভিত্তি তৈরি এবং বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে উন্নত দেশে পরিণত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। পুঁজিবাজারের গতিবিধি লক্ষ করুন। ১০ বছর আগে পুঁজিবাজারে যেসব অপশন ছিল, তা এখন অনেক কমে গেছে। পর্যালোচনা করে দেখুন কেন হচ্ছে এমনটি। আবারো বলব, ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে উচিত ছিল করপোরেট আয়করে ছাড় দেয়া। অথবা উচিত ছিল কন্ডিশনিং করে দেয়া যে অন্তত কয়েক বছরের জন্য কর ছাড় দেয়া হবে। আপনারা আসেন। বরং এখানে আরেকটি বিষয় যোগ করতে চাই, সেটি হলো কখনো কখনো ভুল বার্তা দেয়া হয়েছে। গ্রামীণফোন যখন লিস্টিংয়ে আসে তখন তাদের করপোরেট করহার ছিল ৩৫ শতাংশ। পরে সেটি বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। এখন তারা লিস্টিংয়ের কারণে কেবল ৫ শতাংশ কম করহার এনজয় করছে। এটা কি ভুল বার্তা নয়? তাহলে আরেকটি মোবাইল টেলিফোন কোম্পানি কেন পুঁজিবাজারে লিস্টিংয়ে আসবে? এখানে আরেকটি কথা বলা দরকার যে রবি, বাংলালিংক, নেসলে, ইউনিলিভারসহ বেশি টার্নওভারের কোম্পানিগুলোকে যদি পুঁজিবাজারে না আনা যায়, তাহলে এদের থেকে কর কম পাওয়া যাবে। কারণ তা স্বচ্ছ হচ্ছে না। তাদের টার্নওভার বেশি হলেও যেহেতু সেগুলো পাবলিকলি প্রকাশ পায় না, সেহেতু সরকার তাদের কাছ থেকে কম কর পায়। গ্রামীণফোন যখন প্রথমে লিস্টিংয়ে আসে তখন তাদের করপোরেট কর ১০ শতাংশ কম ছিল। কয়েক বছর যেতে না যেতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো কেবল ৫ শতাংশ করছাড় পাবে। কেন? এটা স্পষ্টত ভুল বার্তা। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর হয়তো এটা জানা না-ও থাকতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সবাই বিষয়টি জানেন।
রিটেইনড আর্নিংস বা কোম্পানির রিজার্ভে অর্থ জমা হয় কর দেয়ার পরই। অনেক কোম্পানি ব্যবসায়িক প্রয়োজনে রিজার্ভ ফান্ড গড়ে তোলে। অনেক কোম্পানি রিটেইনড আর্নিংস ব্যবহার করে নতুন প্লান্ট স্থাপন করে। তাই কোম্পানির রিটেইনড আর্নিংসের ওপর করারোপ করা মানে শেয়ারহোল্ডারদের নতুন করে কর দিতে বলা। এটা অন্যায়। এতে কোম্পানির ব্যবসা বড় করার গতি থেমে যাবে। আশা করি, এক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত কর তুলে নেয়া হবে।
কথা হলো, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে ভালো কোম্পানিকে লিস্টিংয়ে আনতে হবে, বন্ড মার্কেট ডেভেলপ করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে পুঁজিবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা আসবে। শেয়ারবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লে মূল্যসূচক নিয়ে এত চিন্তা করতে হবে না। শেয়ারবাজারের যেটি চিন্তা করা উচিত সেটি হলো, কয়টি ভালো কোম্পানির শেয়ার আছে তা দেখা। বিদেশীরা এখানে বিনিয়োগ করতে এলে তারা ১০-১২টির বেশি ভালো কোম্পানির শেয়ার পান না। তারা শ্রীলংকা কিংবা পাকিস্তানে এখানকার চেয়ে বেশি ভালো শেয়ার পাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের এখানে পাচ্ছেন না। তারা শেয়ার ট্রেডিং লাইসেন্স নিতে চাইছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত। অর্থমন্ত্রী এসব দিকনির্দেশনা না দিলে বিএসইসি ট্রেডিং লাইসেন্সের অনুমোদন দেবে, সেটি আমার বিশ্বাস হয় না। এগুলো দেখলে ভালো হবে। এখন বিদেশীরা বিনিয়োগ করেন এখানকার ব্রোকারদের মাধ্যমে। ট্রেডিং লাইসেন্স দিলে নিজস্ব কোম্পানির মাধ্যমে শেয়ার ট্রেডিংয়ে যুক্ত হতে পারবেন তারা। তখন আমাদের বাজার বেশি বিশ্বাসযোগ্য হতো। এটিও একটি ইস্যু হিসেবে চিন্তা করা উচিত। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে কিছু স্পন্সর আছে, তারা শুধু এপ্রিলেই ৭০০ কোটি টাকা বাজারের বাইরে নিয়ে গেছে। এরা যাতে শেয়ার বেচে সহজে অর্থ বাইরে নিতে না পারে, সে ব্যাপারে বক্তব্য থাকা উচিত ছিল এবং বিএসইসি থেকে দিকনির্দেশনা দেয়া উচিত ছিল।
পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলে বিনিয়োগের জন্য অর্থের অভাব হবে না। আশা করি, বাজেট প্রস্তাবনায় যেসব বিষয় শেয়ারবাজারের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, সেগুলো অর্থমন্ত্রী প্রত্যাহার করে নেবেন।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অনারারি অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়