বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে পথশিশুদের অধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও সামাজিক উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা হয়েছে এক নাগরিক গোলটেবিল বৈঠকে। বক্তারা বলেন, নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতিতে ‘পরিচয়হীন এক প্রজন্ম’ তৈরির ঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
গত শনিবার (২২ নভেম্বর) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সুলতান আহমেদ হলে এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় “সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের অধিকার: রাষ্ট্র ও নাগরিকের দায়বদ্ধতা” শীর্ষক নাগরিক গোলটেবিল আলোচনা সভা। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল আলোচক ছিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক প্রফেসর হাসিনা যাকারিয়া বেলা।
সভায় বক্তারা বলেন, দেশের পথশিশুরা জন্মসনদবিহীন হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি পরিচয় ও সরকারি সুরক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সমন্বয়হীনতা, তদারকির দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় তারা প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বড় হচ্ছে। তারা মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা, যৌন শোষণ, শ্রমনির্যাতন, গ্যাং-সংস্কৃতি ও পাচারের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।
“এভাবে পরিচয়হীন এক নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে; যা ভবিষ্যতে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।” আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন,
জাহিদুল করিম কচি (সদস্য সচিব, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব), স্থপতি আশিক ইমরান (অনারারি কনসাল জেনারেল, রাশিয়ান ফেডারেশন), মোছলেহ উদ্দিন (জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা), ড. সৌরভ শাখাওয়াত (শিশু সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ), প্রসিকিউটর মো. নেজাম (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর), আইনজীবী মুহাম্মদ বরকত উল্লাহ খান, আর.এস.এম. নিজাম উদ্দিন (চেয়ারম্যান, ফ্রেশ অ্যান্ড সেইফ), সরোয়ার আমিন বাবু (স্টার্টআপ পরিচালক, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট টিভি), সাংবাদিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, জিনাত আরা (ইনচার্জ, অপরাজেয় বাংলাদেশ), শিরিন আখতার (সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম নারী উন্নয়ন সংস্থা) প্রমুখ।
এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পথশিশুদের জন্য চলমান কার্যক্রম উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ,
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, আইনি সহায়তা,
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ক্যাম্পেইন,
মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের পুনর্বাসন।
সভায় মোহাম্মদ আলী পথশিশু সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
পথশিশুদের তালিকা তৈরি ও পরিচয় নিশ্চিতকরণ, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতা বৃদ্ধি ও কঠোর আইন প্রয়োগ, ভিকটিম-ফ্রেন্ডলি আদালত ও সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করা,
নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাউন্সেলিং সুবিধা বৃদ্ধি, পুনর্বাসনের পর দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান, গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতা প্রচার,
সরকারি–বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ বিস্তারে এনজিও নিবন্ধন সহজ করা, প্রতিটি জেলায় ওয়ানিং হটলাইন ও স্থানীয় সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন।
মোহাম্মদ আলী বলেন—
“পথশিশুরা রাষ্ট্র ও সমাজের সমান দায়িত্ব। কাগজের নীতিতে আলো আছে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় অন্ধকারই বেশি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
সভায় সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
Leave a Reply