শরীয়তপুরে থেমে নেই মানব পাচার, চলছে শোকের মাতম।

মোঃ ফারুক হোসেন, শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি : শরীয়তপুরে আর্ন্তজাতিক
মানব পাচার চক্রের সদস্যরা এখনও সক্রিয় রয়েছে। থেমে নেই তাদের অবৈধ মানব পাচার কার্যক্রম। বিশেষ করে লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রীস, ইতালী, স্প্যান, পাঠানোর কথা বলে পাচারকারী চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা । ফলে ভু-মধ্য সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে অনেকের স্বপ্ন। জানালেন জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মাহবুবুর রহমার। এখনো শোকের মাতম চলছে নিখোঁজ পরিবারগুলোর মধ্যে। নিখোঁজ অনেকের পরিবার মামলা করেও পায়নি সু-বিচার। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, শরীয়তপুর (নড়িয়া সার্কেল) বলছেন, নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদরে মানব পাচারের অনেক মামলা রয়েছে। অনেকে আমাদের কাছে মামলা করতে আসে না। আমরা পাচারকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করে কোর্টে প্রেরণ করছি। নড়িয়া ও জাজিরা থানা এবং নিখোঁজ মিঠু চৌধুরীর বাবা জিতেন চৌধুরীসহ বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, আর্ন্তজাতিক মানব পাচার চক্রের সদস্যরা শরীয়তপুরের ৬ টি উপজেলায় সক্রিয় থাকলেও বিশেষ করে নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদর উপজেলায় প্রায় অর্ধ শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। থেমে নেই তাদের অবৈধ মানব পাচার কার্যক্রম। বিশেষ করে লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রীস, ইতালী, স্প্যান, পাঠানোর কথা বলে পাচারকারী চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রথমে নির্দিষ্ট অংকের টাকা নিয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা উন্নত ভবিষ্যতের মিথ্যা প্রলোবন দেখিয়ে ইউরোপ গমনে ইচ্ছুকদের, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পাঠায়। এরপর সেখান থেকে ঝুকিপুর্ন নৌকায় করে ইউরোপের দেশ ইতালী পাঠায়। আর তখনই ঘটে অনেক ভয়ংকর ঘটনা। শরীয়তপুর থেকে বিদেশ যেতে ইচ্ছুকদের মাফিয়া চক্রের মাধ্যমে পাশবিক নির্যাতন করে, তার ভিডিও পাঠিয়ে দিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। টাকা দিতে না পারলে অনেক কে জীবন দিতে হয় মাফিয়া চক্রের হাতেই। পাশাপাশি লিবিয়া থেকে ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালী যাওয়ার সময় অবৈধ ঝুকিপুর্ন নৌকা ডুবিতে অনেকের সলিল সমাধী হচ্ছে ভূ-মধ্য সাগরেই। আবার অনেকেই লিবিয়া, তিউনিশিয়াসহ একাধিক দেশের কোষ্ট গার্ডের হাতে ধরা পরে দীর্ঘদিন জেল খেটে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসছে। মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা অবৈধ ভাবে মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর, হাঙ্গেরীসহ বিভিন্ন দেশে লোক পাঠাচ্ছে। ভু-মধ্য সাগরে, আফ্রিকার তিউনিশিয়ার উপকুলে নৌকা ডুবিতে অনেক অভিবাশন প্রত্যাশির মৃত্যু হয়েছে। আবার অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই নড়িয়া, জাজিরা ও শরীয়তপুর সদও উপজেলার হত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ইতিমধ্যে গত কোরবানীর ঈদের দিন লিবিয়া থেকে ইতালী যাওয়ার পথে
ঝুকিপূর্ন তিনটি অবৈধ মানব পাচারকারী নৌকা ডুবে যায়। সেখান থেকে তানজিনিয়া কোষ্ঠ গার্ডের সদস্যরা ৩১৮ জনকে উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন জেলার ১৮ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। সেখানে নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের নওগাও গ্রামের সেলিম কাজীর ছেলে কাজী ফিরোজ মাহমুদ (৩০) নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ কাজী ফিরোজ মাহমুদ এর সাথে থাকা এস ডি সুমন জানায়, ভূ-মধ্য সাগরে নৌকা ডুবির সময় হিড স্টোকে কাজী ফিরোজ মাহমুদ মারা গেছে। একই ঘটনায় একই উপজেলার ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়নের সিলংকর গ্রামের কৃষক লাল মিয়া ছৈয়ালের পুত্র নুরে আলম ছৈয়াল (১৯) কে, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য নড়িয়া পৌরসভার লোংসিং গ্রামের লিভিয়া প্রবাসী সুজন ছৈয়াল গত ৩ মাস পূর্বে লিভিয়া নেয়। সেখান থেকে আরেক মানব পাচারকারী চত্রের সদস্য নড়িয়া বাংলা বাজার এলাকার জাকির বেপারীর ছেলে লিভিয়া প্রবাসী ফয়সাল বেপারী সাড়ে ৮ লাখ টাকা নিয়ে, গত ১৭ জুলাই ইটালী পাটানোর কথা বলে, ভূ-মধ্য সাগরে অবৈধ নৌকায় তুলে দেয়। ১৯ জুলাই ভূ-মধ্য সাগরে নৌকা ডুবিতে নিখোজঁ হয় বলে জানান তার মামা কালাই চৌকিদার। তার সাথে থাকা একই উপজেলা চামটা এলাকার শহীদ মোল্লা (২০) নিখোঁজ। তাদের পরিবারের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। গত ২০১৯ সালের ঈদুল আজহার সময় ও শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মিঠু চৌধুরী, সোহেল বেপারী, জহির উদ্দিন, কবীর মিয়া, জামাল উদ্দিনসহ ১২ জন যুবক নিখোঁজ হয়। কয়েক জনের লাশ মিললেও বাকীদের আজ ও কোন খোঁজ মিলেনি। ২০১৯ সালের সেপ্টেস্বর মাসে নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের কানাদা পাড়া গ্রামের জিতেন চৌধুরীর ছেলে মিঠু চৌধুরী ইতালী যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালাল চক্রের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে অবৈধ ঝুকিপুর্ন নৌকায় পাড়ি জমায়, সে থেকে সে নিখোঁজ হয়। দালাল চক্র একাধিক বার টাকা নিলে ও আজো তার খোঁজ মিলেনি। এ ব্যাপরে নিখোজের বাবা জিতেন চৌধুরী বাদী হয়ে, নড়িয়া থানায় মানব পাচার কারী চক্রের সদস্য রতন খান সহ ৪ জনকে আসামী করে একটি মালা দায়ের করেন। পুলিশ আসামীকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করে। পরে সে জামিনে বেরিয়ে আসে। নিখোঁজদের মাধ্যমে মিঠু চৌধুরীর মা পার্বতী রানী চৌধুরী, নূরে আলম ছৈয়ালের মা শাহিদা বেগম ও বিভিন্ন সূত্রে জানাযায়, শরীয়তপুর জেলায় সত্রিুয় মানব পাচারকারী চত্রেুর সদস্যের নাম -ঠিকানা পাওয়া গেছে, এরমধ্যে নড়িয়া উপজেলার গুলমাইজ এলাকার পবন খার ছেলে রতন খা, ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের চান ভবনী এলাকার আইয়ুব আলী ফকিরের ছেলে জিনান ফকির, নড়িয়া উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার লিভিয়া প্রবাসী জাকির বেপারীর ছেলে ফয়সাল বেপারী, নড়িয়া পৌরসভার লোংসিং এলাকার লিভিয়া প্রবাসী সুজন ছৈয়াল, ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের সত্যপুর এলাকার আর্ন্তজাতিক মানব পাচার কারী চক্রের অন্যতম সদস্য বাভলু হাওলাদার। সখিপুর এলাকার মমীন আলী মোল্লা বাজার এলাকার লতিফ খা, ছয়গাও এলাকার কবীর সরদার, পাভেজ লস্করসহ অর্ধশতাধিক মানব পাচারকারী সদস্য পুরো জেলায় সক্রিয় রয়েছে।
মানব পাচার এর বিয়য়টি অস্বীকার করে ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের চান ভবনী এলাকার মানব পাচারকারীর সদস্য আইয়ুব আলী ফকিরের ছেলে জিনান ফকির বলেন, এর সঙ্গে আমি জড়িত না।মানব পাচারকারীর সদস্য নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের গুলমাইজ এলাকার পবন খার ছেলে রতন খা বলেন, আমি সখিপুরের মমীন আলী মোল্লার বাজার এলাকার খান বাড়ীর মানব পাচার কারীর চক্রের সদস্য, লতিফ খানের নিকট টাকা দিয়েছি। এর বেশী আমি কিছু জানি না। এ বিষয়ে পরে নিখোঁজ মিঠুর বাবা জিতেন চৌধুরী আমাদের নামে নড়িয়া থানায় একটি মামলা দারেয় করেন। সেই মামলায় আমি জেলও খেটেছি। ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের সত্যপুর এলাকার আর্ন্তজাতিক মানব পাচারকারী চক্রের অন্যতম সদস্য বাভলু হাওলাদার বলেন, এক সময়ে লোক নিতাম, তারা ভালো ভাবেই গেছে। গত তিন চার মাস ধরে আমি কোন লোক নেই না। কত টাকা করে নেয়া হয়? জানতে চাইলে, তিনি এড়িয়ে যান। নড়িয়া উপজেলার বিঝারী ইউনিয়নের নওগাও এলাকার নিখোঁজ কাজী ফিরোজ মাহমুদের মা সখিনা বেগম ও নিখোঁজ নুরে আলম ছৈয়ালের মা শাহিদা বেগম বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য ফয়সাল বেপারী ও সুজন ছৈয়াল আদম ব্যবসায়ীরা, আমাদের সন্তানদেরকে উন্নত ভবিয্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে অবৈধ পথে ইতালী, গ্রীস নেয়ার কথা বলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ভাবে লিভিয়া নিয়ে যায়। সেখান থেকে মারধর করে প্লাষ্টিকের নৌকায় উঠিয়ে সাগর পাড়ি দেয়। এতে আমাদের মতো অনেক মায়ের বুক খালী হয়েছে। এখন যারা জিবিত আছে তাদের দ্রুত উদ্ধার এবং যারা মারা গেছে সে সকল সন্তারদের লাশ এনে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, শরীয়তপুর জেলার অনেকেই ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকে। সে কারনে এ এলাকার লোকজন অনেকেই বিদেশ মুখী। এ সুযোগে মানব পাচারকারী সদস্যরা প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে ভুল পথে নিয়ে যায়। যারা ভূ-মধ্য সাগরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিপদ গ্রস্থ হন। এ সকল বিষয়ে অনেক মামলা রয়েছে। মামলা হওয়ার কারনে অনেকেই এলাকায়ও থাকে না।
মানব পাচারকারী এলাকায় আসলে আমাকে খবর দিবেন। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো। জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক মোঃ পারভেজ হাসান বলেন, আমি এ বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। যে ৩টি পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ রয়েছেন। তাদেরকে অভিযোগ করতে বলেন। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।