শবে বরাতের গুরুত্ব ও ফজিলত -মুহাম্মদ তানিম আকন্দ

 

শবে বরাত শব্দটি ফার্সী। এর আরবী হল লাইলাতুল বারাত। “বরাত’ শব্দের অর্থ মুক্তি এবং শব’ বা লাইল শব্দের অর্থ রাত। অতএব “শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত। এই রাতে আল্লাহ তা’আলা অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি চাওয়ার জন্য মানুষকে আহ্বান জানান এবং তাঁর নিকট চাইলে তিনি এসব থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন, তাই এ রাতকে শবে বরাত বা মুক্তির রাত বলা হয়। ১৪ই শাবান দিবাগত রাতই হল এই শবে বরাত।

শবে বরাতের ফজীলতঃ-

হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শাবানের মধ্যরাত্রি (শবে বরাত) যখন উপস্থিত হয় তখন রাত্রি জাগরণ কর এবং পরের দিন রোযা রাখ। কেননা এ রাত্রে সূর্যাস্তের পর থেকেই আল্লাহ তা’আলা সর্বনিম্ন আসমানে বিশেষ তাজাল্লী ফরমান। অতঃপর ঘোষণা দিতে থাকেন যে, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছ কি কেউ রিযিকপ্রার্থী?
আমি তার রিযিক বৃদ্ধি করে দিব। আছ কি কোন বিপদগ্রস্ত? তাকে আমি বিপদ থেকে মুক্তি করে দিব। এমনিভাবে ফজর পর্যন্ত মহান রাব্বুল আলামীন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আপন বান্দাদেরকে আহ্বান করতে থাকেন।
(-ইবনে হিব্বান, তারগীব:২৪৪/২)

হযরত মু’আয ইবনে জাবাল রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, পনের শাবানের রাতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সকল সৃষ্টির প্রতি খাছ রহমতের দৃষ্টি দান করেন ও সমস্ত মাখলুককে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক এবং বিদ্বেষী হিংসুকদের তিনি মাফ করেন না। -সহীহ ইবনে হিব্বান ১৩/৪৮১

করণীয় আমলসমূহঃ-

এ রাতের নফল আমলসমূহ সম্মিলিত নয়, ব্যক্তিগত।
হাদীস শরীফের আলোকে এবং ফিকহে্র কিতাবে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী শবে বরাত উপলক্ষে ৫টি আমলের কথা প্রমাণিত হয়।
যথা, ১. ১৪ই শাবান দিবাগত রাতে জাগ্রত থেকে নফল ইবাদত-বন্দেগী যিকির-আযকার, দুরুদ শরীফ, কুরআন তিলাওয়াত ও নফল নামাজে আত্মনিয়োগ করা।
মনে রাখতে হবে এ রাত মর্যাদাপূর্ণ বটে, তবে এর জন্য স্বতন্ত্র কোন ইবাদত বর্ণিত নেই। সাধারণভাবে যে সমস্ত নফল ইবাদত পালন হয়ে থাকে সেগুলো এ রাতেরও আমল।
আরও মনে রাখবেন! নফল নামাজ ঘরে পরাই উত্তম। যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা মসজিদে জেতে পারবোনা, সুতরাং আজকের এই বরকতময় রাত্রিটা আমারা ঘরের মধ্যে থেকে যতটুকু সম্ভব আমল করবো। প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবো।

২. এ রাতে বেশি বেশি দু’আ করা। কেননা আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে বান্দাদেরকে ক্ষমা, রিযিক, রোগ-শোক, বিপদ-আপদ, থেকে মুক্তি ও যার যত প্রকার জায়েজ প্রয়োজন আছে তা চাওয়ার জন্য নিজ থেকেই আহ্বান করতে থাকেন। বিধায় প্রত্যেকেই নিজের যাবতীয় প্রয়োজন কায়মনোবাক্যে আল্লাহ তা’আলার দরবারে পেশ করা উচিত। এবং রাতভর জাগ্রত থেকে আল্লাহ পাক এর দরবারে কান্নাকাটি করে নিজের গুনাহসমূহ মাফ করিয়ে নেয়া, এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা লাভের জন্য খুব বেশি দু’আা করা।

৩. হাদীস শরীফে আছে, এ রাতে প্রিয় নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিসংগোপনে কবরস্থানে গিয়েছিলেন এবং মৃতদের জন্য দুআ করেছিলেন। তাই এ রাতে একান্তে, নীরবে নিজ নিজ আত্মীয়বর্গের কবর যিয়ারত করা যায়। কিন্তু ভীড় করে সম্মিলিতভাবে এবং জরুরী মনে করে কবরস্থানে যাওয়া ঠিক নয়। তাছাড়া জীবনে একবার যে কোন শবে বরাতে গেলেই এ সুন্নাত আদায় হয়ে যায়।

৪. এ রাতে পরলোকগতদের জন্য দু’আ করা ছাড়াও দান, খায়রাত ও নফল ইবাদত-বন্দেগী করে পরলোকগতদের জন সাওয়াব পৌঁছানো যায়।

৫. পরের দিন অর্থাৎ ১৫ শাবান নফল রোযা রাখা উত্তম।

উপরে উল্লেখিত ৫টি বিষয় ব্যতীত শবে বরাত উপলক্ষে হালুয়া রুটি তৈরি করা, মোমবাতি জ্বালানো, আতশবাজী ও পটকা ফোটানো ইত্যাদি নিষিদ্ধ। এগুলো রছম, বিদআত ও গুনাহের কাজ।

বি.দ্র. কিছু লোক বলে থাকে, শবে বরাত-এর ফযীলত ও আমল সম্বন্ধে কোনো সহীহ হাদীস নেই! তাদের কথা ভুল।
এ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর বেশ কয়েকটি সহীহ এবং আমলযোগ্য পর্যায়ের। এসম্পর্কিত তাহকীকসহ বিস্তারিত বর্ণনা হযরত মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন” রচিত “ফাযায়েলে যিন্দেগী” কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া শবে বরাত-এর উপরোক্ত আমলসমূহ সম্পর্কিত হাদীসগুলো “মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ” গ্রন্থেও উদ্ধৃতিসহ উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।