লালন আখড়া বাড়িতে বসেছে সাধুর হাট!

এ,জে, সুজন (কুষ্টিয়া প্রতিনিধি) : বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এর উৎসব উপলক্ষ্যে কুষ্টিয়া লালন একাডেমি চত্বরে লালন আখড়া বাড়িতে ৩ দিন ব্যাপী বসেছে সাধুদের হাট। আজ ৮ই মার্চ (রবিবার) থেকে ১০ই মার্চ (মঙ্গলবার) পর্যন্ত চলবে এ উৎসব।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারো তিন দিন ব্যাপী লালন উৎসব চলবে। স্মরণ উৎসবে আলোচনা সভা, লালন মেলা ও সঙ্গীত অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায়।
আজ ৮ মার্চ (রবিবার) প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি।
২য় দিন প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ড. মু: আনোয়ার হোসেন হাওলাদার ।
৩য় শেষ দিনে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনি এমপি।
প্রথম দিন রাতে লালনভক্ত সাধুদের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী অধিবাস সেবা, দ্বিতীয় দিন সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণ সেবা প্রদান করা হবে । আসন্ন লালন স্মরণোৎসব উপলক্ষে লালনের আখড়ায় দেশ বিদেশ হতে হাজার হাজার ভক্ত, সাধু ও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটেছে।
বছরে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় ২টি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অত্যান্ত জাকজমকভাবে পালিত হয় ওই দুটি উৎসব। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার বাউল ভক্ত অনুসারী এখানে আসেন। একটি হচ্ছে স্মরণোৎসব আরেকটি তিরোধান দিবস। এ দুটি উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছরই সাঈজির টানে ছুটে আসেন লাখো বাউল ভক্ত অনুরাগীরা। সে সময় আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার লালন ভক্ত অনুরাগীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়। উৎসবকে ঘিরে কুষ্টিয়া কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় কালী নদীর পাড়ে সাধূ উৎসব শুরু হয়। উৎসবকে ঘিরে বাউলদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে লালন একাডেমীর বিশাল মাঠ । দেশী বিদেশী হাজারো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয় বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের মাজার। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লালন ভক্তরা লালন একাডেমী চত্বরে স্ব স্ব স্থানে আসন গেড়ে বসে। লালনের ভাব গান আর লালনের বানী প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটায় তারা।
সূত্রমতে, প্রায় ২শ বছর আগের কথা। পরিচয়হীন অসুস্থ্য ১০/১২ বছরের বালক লালনকে কুষ্টিয়ার কালিগাং নদীর ঘাট থেকে মাওলানা ফকির মলম শাহ তাকে উদ্ধার করে। পরে মলম শাহ তার বাড়ীতে অসুস্থ লালনকে চিকিৎসা ও সেবা করে সুস্থ করে তোলেন। লালন সুস্থ্য হয়ে উঠেই মলম শাহ’র বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। সেখানে সে দিনে দিনে বড় হয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। তার সাধনার মধ্যে ছিল শরীয়ত, মারফত, দেহতত্ব ও মানবতাবাদী। এ সময় বাউল সাধক ফকির লালন শাহ তার জীবন দশায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় তার ভক্তদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করতেন। পরবর্তীতে বাংলা ১২৯৭ সালের ১লা কার্তিক ইংরাজী ১৮৯০সালের ১৭ অক্টোবর বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ মৃত্যুবরন করেন।
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এর মৃত্যুর পর থেকেই তার অনুসারী ভক্তবৃন্দরা দোল পূর্নিমায় এই অনুষ্ঠান করে আসছে এবং এ অনুষ্ঠানের নাম দেয়া হয় লালন স্মরণোৎসব। সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগীতায় লালন একাডেমী কুষ্টিয়ার আয়োজনে লালন স্মরণোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। লালন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় লালনের জীবনীর উপর আলোচনা ও লালন সংগীত এবং মাঠে বসে গ্রামীণ মেলা। লালনের স্মরণ উৎসবকে ঘিরে কুষ্টিয়া মরা কালী গাঙের ধারে বসে ফকিরদের এ মিলন মেলা। এ উৎসবে ফকিরদের ব্যস্ততার যেন সীমা থাকেনা।
লালনের বানী ছড়িয়ে দিতেই প্রতি বছর লালন স্মরণোৎসবে উপস্থিত হয়ে অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে তার ভক্তরা এজন্যই তাদের আরাধনা বলে জানায় লালন ভক্তরা।
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ তার জীবন দশায় দোল পূর্নিমার রাতে তার ভক্তদের নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও মত বিনিময় করতেন। আলোচনার বিষয় বস্ত ঐ রাতেই তিনি বুঝতেন এবং পরবর্তী এক বছরের কর্ম পরিকল্পনা করতেন।
এ জন্যই ৩দিনের অনুষ্ঠানে লালন ভক্ত অনুসারী ও দর্শনার্থীদের লালনের বানী শুনানোর জন্য লালনের গান ও ভক্ত অনুসারীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। সারা বিশ্বের মানুষ আজ লালনকে নিয়ে গবেষনা করছে যা আমাদের গর্ব। দেশ বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার লালন ভক্ত অনুসারীরা সারা রাত লালনের বানী ও গান শুনে ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
মানুষের পরিচয় জাত পাত ধর্মে নয়। আর এ মানুষকে ভালোবাসলেই পরমাত্মা তথা সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ সম্ভবÑলালন দর্শনের এ মূলমন্ত্র । এ লক্ষ্যেই লাখো বাউল ভক্তদের মিলন মেলা বসেছে। লালন ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। লালনের অহিংস বাণী সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়–ক এ প্রত্যাশা করেন বাউল ভক্তরা।
লালন গবেষকদের অভিমত, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে এক অখন্ড ঐক্যসূত্রের বন্ধন এনে দিয়েছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের এই বাউল গান। বাউল ফকিররা জাতের বিচার করেননি। সবার উপর মানুষ সত্য এই বাণী মেনেছেন অমত্মর দিয়ে। তাঁরা সর্বশ্রেণীর সর্বজাতির মিলনসেতু। মানবিক আবেগ তাঁদের কাছে সব থেকে মূল্যবান। বাউল গানের সর্বশ্রেষ্ঠ রসশিল্পী ছিলেন মরমী সাধক ফকির লালন শাহ্।