রোগীর সাথে হাসপাতালেই ঈদ ডাক্তারের! শ্রীপুরে স্যাম্পল সংগ্রহ ঈদের দিনেও

আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর(গাজীপুর) থেকেঃ- ঈদের সকালে জরুরি বিভাগের রুমের দরজা ঠেলে ঢুকছিলেন একজন সাংবাদিক। চিকিৎসক একমনে রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখছিলেন।পাশেই উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। পরিচয় দিয়ে কক্ষে ঢোকার অনুমতি চাইতেই মুখ তুলে চিকিৎসক বললেন, ‘এই রোগীর অবস্থা ভীষণ ক্রিটিক্যাল, কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই, প্লিজ কিছু মনে করবেন না।’ নাম জিজ্ঞেস করতেই চোখ তুলে বললেন, ‘আমি মেডিকেল অফিসার ডাঃ মইনুল আতিক ।’

২৫ মে সোমবার ঈদুল ফিতরের দিন সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা চিত্র এটি। কখনও দ্বিতীয় তলায় ওয়ার্ডে রাউন্ড আবার কখনও জরুরি বিভাগে দায়িত্বও পালন করছেন এই চিকিৎসক।

এদিকে, ঈদের দিনেও থেমে নেই স্যাম্পল কালেকশন। আজকের স্যাম্পল কালেকশনের রোগীদের ফ্লু-কর্নার তত্বাবধান করছেন মেডিকেল অফিসার ডা.ইফফাত আরা আলম। স্যাম্পল কালেকশন করছেন
স্বাস্থ্য সহকারী মো.আমিরুজ্জামান,সিএইচসিপি জহিরুল ইসলাম, সিএইচসিপি আলমগীর হোসেন তাপস। ঈদের দিনে ২১ জনের কোভি ১৯ নমুনা সংগ্রহের কাজ করা হয়। চার জন নারী ও সতের জন পুরুষের করোনা নমুনা ( স্যাম্পল) সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। আজ পুনরায় পজেটিব এমন চারজনের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।

নমুনা সংগ্রকারী( সিএইচসিপি) জহিরুল ইসলাম জানান, ঈদের দিন সকাল ১০ টা থেকে বেলা ১২ পর্যন্ত আসা সন্দেহ জনক মানুষের কোভিড ১৯ রোগের নমুনা (স্যাম্পল) কালেকশন করা হয়েছে। আজ ২১ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে চারজন নারী ও সতেরজন পুরুষ ছিলে। তিনি বলেন, ঈদের আগের দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পর দিনও নিয়মিত কোভিড-১৯ রোগের নমুনা সংগ্রহ করা হবে।

জানা যায়, ঈদুল ফিতরের সময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কায়, হাসপাতালগুলোতে কোনো ছুটি না থাকার সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চাপিয়ে দেয়নি৷ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, ‘‘এই মহামারির সময় আমরা ঈদ বা ছুটির কথা চিন্তা করছি না৷ আমরা চিন্তা করছি মানুষকে কিভাবে সেবা দেয়া যায়৷ মানুষকে কিভাবে সুস্থ রাখা যায়৷ সর্বোচ্চ ডেডিকেশন দেখানোর এটাই সময়৷ রোগীদের চিকিৎসাই হবে এবারের ঈদ৷’’

২য় তলায় ইনডোর বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন, সিনিয়র স্টাফ নার্স অঞ্জনা রানী ও নার্সিং সুপারভাইজার ফরিদা হক। ঈদের দিনে ডিউটি করছেন, কেমন লাগছে?’ জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘পরিবার ছেড়ে হাসপাতালে আছি, ডিউটি করছি। এতে আমাদের কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে না, মন খারাপ হচ্ছে পরিবারের মানুষগুলোর। আমরা যেহেতু চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত যে কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের কাজ করতে হবে এটাই আমাদের ধর্ম, আমরা সে মানসিকতা নিয়েই এ পেশায় আছি, আমাদের পূর্বসূরিদেরও তাই দেখেছি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আরএমও ডাঃ ফাতেহ আকরাম দোলন জানান, সাধারণত ঈদের দিন অনেকেই ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে থাকেন। এবার ব্যতিক্রম। রোগীর স্বজনেরা যেমন হাসপাতালে ঈদ করছেন, আমরাও রোগীদের সেবায় হাসপাতালেই ঈদ করছি। এতে তিল পরিমাণ দুঃখ নেই। কারণ রোগীদের সেবা করাই ডাক্তারের ধর্ম।
তিনি আরও বলেন, শুধু করোনা মুহূর্তেই নয়, দেশের যে কোন দুর্যোগে মানুষের সেবা দিয়ে পাশে থাকে চিকিৎসকরা । আর ঈদের দিন কাজ করা কোনো চাপ বা চাকরি হারানোর ভয়ে নয়৷ এটা চিকিৎসক হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব বোধ থেকেই করছি৷’’

গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা.খায়রুজ্জামান জানান, ‘‘এই ঈদে হাসপাতালের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা যাতে ব্যাহত না হয় সেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো চিকিসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ছুটিতে যায়নি। আর করোনা পরীক্ষার জন্যও চলছে স্যাম্পল সংগ্রহ। কেননা করোনা তো ঈদ বুঝবেনা,সে আক্রান্ত করতেই পারে।

তিনি আরও জানান, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে না আসা পর্যন্ত আমরা চিকিৎসা সেবাকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছি৷ এবার ঈদ হলো করোনা রোগীর চিকিৎসা৷’’

উল্লেখ্য, এ উপজেলায় এখনও পর্যন্ত ৯৯৯টি করোনা ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলাফল এসেছে ৮৪৭ জনের। এতে করোনা পজিটিভ এসেছে ৪৬ জনের, বাকিরা নেগেটিভ।

সারা বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে৷ গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছেন ২১ জন৷ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫০১৷ ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়েছেন সর্বোচ্চ ১৯৭৫ জন৷ এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৩৫ হাজার ৫৮৫ জন৷