রেলের অগ্রযাত্রা এবং কিছু পরামর্শ

মতি লাল দেব রায়: কয়েক বছর পর পর ট্রেনের জন্য বিদেশ থেকে ইঞ্জিন ও বগি আমদানি করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় কিন্তু বাস্তবে কোন উন্নতি হয় না। দেশের ট্রেনের বগি তৈরির কারখানাকে আরও স¤প্রসারণ করে তার বগি তৈরির ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা দরকার যাতে নিজেদের তৈরি বগি ট্রেনে ব্যবহার করা যায়। সব সময় বিদেশনির্ভরতা উন্নয়নের পরিপন্থী। প্রথমে রেলওয়েকে সংরক্ষণ করার জন্য দেশের মধ্যে চলমান রেললাইনকে কাঁটাতারের বেড়া বা পাকা দেয়াল দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে স্টেশন মাস্টারের অফিসসহ সীমানা প্রাচীরের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
দেশের রেললাইনকে ভাগ করে একেক জন কর্মকর্তাকে তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিতে হবে। বগি তৈরির যে কারখানা সৈয়দপুরে আছে তার উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে তারপর রেলওয়ে লাইন মেরামত করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি করার ব্যবস্থা না করলে বাঁশ এবং সুতলি দিয়ে রেললাইন মেরামত করা চলবে। রেলওয়ের যে কর্মকর্তা বাঁশ এবং সুতলি ও তেনা দিয়ে টাঙ্গাইল, বাগা উপজেলায় এবং বরমচালে রেললাইন মেরামত করার নির্দেশ দিয়েছেন তার উচিত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়া। রেলওয়ের যত সম্পত্তি আছে তার হিসাব হালনাগাদ করে এবং বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করে রেলের কাজে লাগানো হবে সঠিক কাজ। রেলের শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ীকরণসহ উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
রেলওয়ের প্রশাসনিক পদ্ধতি পরিবর্তন করে কম্পিউটারের মাধ্যমে জবাবদিহিতার অবিরাম সুপারভিশন এর প্রচলন করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। লাউয়াছড়া পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইনকে পাহাড়ের ভিতর টানেল করে দিলে উপরের কিছুর ক্ষতি হবে না এবং পশু পাখিরও কোন ক্ষতি হবে না। নতুন জমির ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করলে অনেক সরকারী ও বেসরকারী ভ‚মির প্রয়োজন তাই বিষয়টি একটু চিন্তা করা করা দরকার।
ট্রেনেযাত্রী সেবার মান উন্নয়ন করে কামরাগুলোকে একটু সাজানো দরকার। রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। সকল বি ও সি শ্রেণীর স্টেশনগুলোকে একই শ্রেণীভুক্ত করে নতুন করে তৈরি করে দিতে হবে। সকল স্টেশনের প্লাটফর্ম একই উচ্চতায় তৈরি করে দিতে হবে যাতে করে যাত্রীদের ওঠা-নামা অসুবিধা না হয়।
আপাতত সব লাইনকে ডাবল লাইনে পরিণত করা জরুরী। সকল রেল স্টেশনে পানি ও সেনিটেশন নিশ্চিত করতে হবে, স্টেশনে যাত্রীদের বসার জন্য চেয়ার ও একই রকম বসার ব্যবস্থা করে কামরা থেকে ১ম শ্রেণী, ২য় শ্রেণী, শোভন, সুলভ ইত্যাদি শ্রেণী বিন্যাস তুলে দিতে হবে, সব কামরাগুলো সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শুধু টিকেটধারী যাত্রীরাই যেতে পারবেন ট্রেনে।
দেশের ২৮৫৫ মাইল রেললাইনের ওপর দিয়ে যে সব সড়ক ক্রস করেছে সেই সব ক্রসিং এ পাহারাদার রাখতে হবে, না হয় গেট তৈরি করে, বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে গেট খোলা এবং লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সারাদেশের কি পরিমাণ সেতু ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু আছে, রেললাইনের অবস্থা কি রকম তা আর দেরি না করে অবিলম্বে বর্তমান তা নির্ধারণ করতে হবে।
মালগাড়ির জন্য তৃতীয় আলাদা সমান্তরাল লাইন তৈরি করা সম্ভব। সরেজমিন তদন্ত করে সঠিক প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরুন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে মেরামত করুন আর তা না হলে কিছুদিনের জন্য রেলওয়ে বন্ধ করে দিন।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ওপর বাজার বসা বন্ধ করে দিতে হবে। কোন অবস্থাতেই এদেরকে প্রশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না। যেহেতু রেলওয়ে দেশের যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর তাই এই বিভাগকে জরুরী বিভাগ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হোক। প্রতি ১৫ দিন পর পর সুবিধা মতো দু’দিন যাত্রীদের জন্য রেলগাড়ি বন্ধ থাকবে এই দু’দিন রেললাইনের মেরামত, নির্মাণ কাজ, ট্রেনের ইঞ্জিন পরীক্ষাসহ যাবতীয় কাজ করতে হবে। রেললাইন চেক করাসহ সব ত্রæটি চেক করে তার মেরামত নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বন্ধের দিন সব কর্মীকে কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে।
মালামাল বহনকারী গাড়িগুলোর দিকে একটু নজর দেয়া দরকার, কিভাবে চলছে, এর দ্বারা কি রেলের আয় হচ্ছে না, নাকি লোকসান দিচ্ছে তার খোঁজ নেওয়া দরকার। দেশের অসংখ্য রেল স্টেশন বন্ধ, ট্রেন থামে না, মাস্টার নেই, কোন স্টেশনে তালা, কেউ বুঝতে পারে না বন্ধ না খোলা, সিগন্যাল নেই কোন স্টেশনে, দূরে লক্ষ্য করে ট্রেন আসছে কিনা দেখে স্টেশন মাস্টার টিকেট বিক্রি করেন। বন্ধ স্টেশনগুলো এভাবে বন্ধ রাখার কারণ খুঁজে বের করা জরুরী। ট্রেনের বাথরুম থেকে মানুষের বর্জ্য রেল লাইনের ওপর পরে পরিবেশ নষ্ট না করে তার যাবতীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। রেলের প্রতিটি কামরায় অন্তত ৫টি সিট প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা খুবই প্রয়োজন। ব্রিটিশ আমলে তৈরিকৃত সেতুগুলো চেক করে কোনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ তা খুঁজে বের করে জরুরী ভিত্তিতে মেরামত করে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রেল প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী