1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
ময়লার শহর সাতক্ষীরা - দৈনিক আমার সময়

ময়লার শহর সাতক্ষীরা

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা
    প্রকাশিত : রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৫

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা। সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় এ শহর একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত, তেমনি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু সাতক্ষীরার নাগরিক জীবন আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। সড়কের পাশে স্তূপ হয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা শুধু শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে ফেলে দিচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
শহরের বিভিন্ন সড়কে ময়লার দুর্গন্ধে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকটের কার্যকর সমাধান হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজ সবাই সমস্যাটি সম্পর্কে অবগত থাকলেও প্রত্যাশিত উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্র কলেজ রোডে গেলেই চোখে পড়ে রাস্তার মাঝখানে জমে থাকা ময়লার স্তূপ। কোথাও খাবারের উচ্ছিষ্ট, কোথাও বাজারের পচা সবজি, আবার কোথাও প্লাস্টিক ও পলিথিনের থলে, সব মিলে এক ভয়াবহ অবস্থা। সকাল কিংবা সন্ধ্যা, সবসময়ই দুর্গন্ধে শ্বাস নেওয়া দুঃসহ হয়ে ওঠে।
‘লোকজন বাড়ির ময়লা পলিথিনে করে মোটরসাইকেলে এনে এসব সড়কের ওপর ফেলে রেখে যাচ্ছে। এতে আমাদের ভোগান্তি বাড়ছে।’
ইটাগাছা হাটরমোড় থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়কের ওপরও একই দৃশ্য। সুলতানপুর বড় বাজারের প্রবেশদ্বারেও প্রতিদিন ময়লার স্তূপ জমে থাকে। সেখানে বাজারে আসা মানুষদের অভিযোগ, কাঁচাবাজারে ঢুকতে গেলে প্রথমেই নাক চেপে ধরতে হয়।
শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক, শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকা, প্রেসক্লাব সড়ক, নারকেলতলা ব্রিজ রোড ও সার্কিট হাউজ সড়কের অবস্থাও একই রকম। শহরের যেদিকে তাকান সেখানেই ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। অথচ সাতক্ষীরা পৌরসভা প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে পরিচিত।
রবিউল নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লোকজন বাড়ির ময়লা পলিথিনে করে মোটরসাইকেলে এনে এসব সড়কের ওপর ফেলে রেখে যাচ্ছে। এতে আমাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
ইটাগাছার বাসিন্দা গোলাম হোসেন বলেন, আমাদের মহল্লায় কোনো ডাস্টবিন নেই। পৌরসভাকে বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে রাস্তায় ময়লা ফেলতে হচ্ছে।
শহরের অন্যতম বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিবানৈশ্য কলেজের শিক্ষার্থী ফাইয়াদ, শহিদুল ও ফয়সাল বলেন, কলেজের প্রবেশমুখেই ময়লার বিশাল স্তূপ পড়ে থাকে। প্রতিদিন দুর্গন্ধ সহ্য করতে হচ্ছে। এতে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
‘কাগজে-কলমে সাতক্ষীরা এক নম্বর পৌরসভা। কিন্তু বাস্তবে নাগরিকরা ন্যূনতম সেবাও পাচ্ছেন না। নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে যায়। আর এখন রাস্তায় রাস্তায় ময়লার স্তূপ, শহরের পরিবেশ হুমকির মুখে।’
ময়লার কারণে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সুলতানপুর বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান জানান, বড় বাজারের সামনেই একটি ডাস্টবিন আছে। তবে তাতে বাজারের সব ময়লা ফেলার কারণে দুর্গন্ধে টেকা যায় না, গ্রাহকরা দুর্গন্ধের কারণে বাজারে আসতে চান না।
সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলী নূর খান বাবুল এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, কাগজে-কলমে সাতক্ষীরা এক নম্বর পৌরসভা। কিন্তু বাস্তবে নাগরিকরা ন্যূনতম সেবাও পাচ্ছেন না। নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে যায়। আর এখন রাস্তায় রাস্তায় ময়লার স্তূপ, শহরের পরিবেশ হুমকির মুখে।
তিনি আরও যোগ করেন, যে শহরে প্রতি বছর পৌরসভা কোটি কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করে, সেখানে ময়লা ফেলার জন্য পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই, এটা লজ্জাজনক।
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে শহরের পরিবেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে নানা রোগের জন্ম দিচ্ছে। কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
‘যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে শহরের পরিবেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে নানা রোগের জন্ম দিচ্ছে। কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ময়লার সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য নদী ও খালে পৌঁছে গেলে পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হবে। এতে শুধু শহরবাসী নয়, আশেপাশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দেশের অনেক জেলাশহরে এরইমধ্যে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বরগুনা, বাগেরহাট বা যশোরের মতো শহরে পৌরসভা নিজস্ব উদ্যোগে ডাস্টবিন সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। অনেক জায়গায় ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহ পদ্ধতি চালু রয়েছে। অথচ সাতক্ষীরায় এখনো প্রচলিত পুরোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন শহরে উৎপাদিত কয়েকশ টন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। যা শেষ পর্যন্ত সড়কের ওপর স্তূপ হয়ে জমছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ময়লা-আবর্জনা থেকে উৎপন্ন জীবাণু সহজেই বাতাস, পানি ও খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন রোগ শহরবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
অপ্রতুল ডাস্টবিনের কথা স্বীকার করে সাতক্ষীরা পৌরসভার পরিুছন্ন পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী এই প্রতিবাদককে ‌বলেন, ৯টি ওয়ার্ডের জন্য কমপক্ষে ১৫০টি ডাস্টবিন দরকার। অথচ রয়েছে মাত্র ৫০টি। এছাড়া ময়লা পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬টি গাড়ির জায়গায় আছে মাত্র দুটি। তাও মাঝে মাঝে বিকল হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, ডোর-টু-ডোর ময়লা সংগ্রহের দায়িত্বে রয়েছে সুন্দরবন ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অনেকেই মাস শেষে ফি পরিশোধ করেন না। বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে টাকা নিলেও পরিুছন্নকর্মীদের দেন না।
পৌরসভার পক্ষ থেকে নাগরিকদের সচেতনতার অভাবকেও দায়ী করা হচ্ছে। ইদ্রিস আলীর ভাষায়, ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও অনেকে রাস্তায় ময়লা ফেলছেন। শহর পরিষ্কার রাখতে হলে নাগরিকদের আগে সচেতন হতে হবে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মাশরুবা ফেরদৌস বলেন, পৌরসভা এলাকার উন্নয়নমূলক একটি মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আমরা অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিুছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে সীমিত সম্পদ ও জনবল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সাতক্ষীরার নাগরিকরা শিগগিরই দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন। আমরা চাই সবাই সচেতন হোক এবং নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলুক, তাহলেই শহর পরিষ্কার রাখা সহজ হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com