ভাষা আন্দোলনের রুপকার বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান

এইচ এম মেহেদী হাসান: ভাষা আন্দোলন বলতে শুধুই ১৯৫২ সালকে বুঝায় না। ৫২ সাল হচ্ছে মায়ের ভাষা রক্ষার  চূড়ান্ত রুপ। সুতরাং এই চূড়ান্ত রুপ পেতে কিন্তু অনেক ঘ্যাত-প্রতিঘ্যাত পেরিয়ে আসতে হয়েছে।
তরুণ মেধাবী ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানই মূলত মায়ের ভাষা রক্ষার অগ্রনায়ক ও রুপকার।  তাঁর মেধা মনন খোকা মুজিব থেকেই ফুটে উঠে। তিনি-ই যে একটি জাতি রাষ্ট্রের স্রষ্টা, বাঙালি জাতির প্রবক্তা মহা পুরুষ, তা কিন্তু তাঁর মধ্যে শৈশবেই পরিলক্ষিত হয়।
১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী  গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল পরিদর্শনে এলে ঐ স্কুলের শিক্ষার্থী শেখ মুজিবুর রহমান, স্কুলের জরাজীর্ণ ভবনের মেরামতের জন্য জোড়ালো দাবি উথাপন করেন এবং দাবি আদায় করতে সক্ষম হন। শিক্ষার্থী শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
১৯৩৯ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সভা করার দু:সাহসের কারণে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম কারাবরণ করেন।
 ১৯৪২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজের বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে তিনি থাকতে শুরু করেন।
১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদান করেন। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। এই বছরই ফরিদপুর ডিষ্টিক্ট এসোসিয়েশনের সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৪৬ সালে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গণতান্ত্রিক যুব কর্মীদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধুু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।

দেশ বিভাগের পূর্বের কথা ভারতবর্ষের বনেদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড.এইচ এইচ সৈয়দ রাজা আলী খান উপমহাদেশের মানুষ ও ইতিহাসকে অপ্রত্যাশিত এক সংকটের মুখে এনে দাঁড় করান। পাকিস্তান জন্মের কিছুকাল আগে তিনি পত্রিকায় একটি কলাম লিখে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব তোলেন এবং এর পেছনে কিছু যুক্তিও তুলে ধরেন। খোঁড়া সেসব যুক্তির মূল কথাই ছিল – উর্দু মুসুলমানদের ভাষা, তাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাও উর্দু হওয়া চাই।

আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বনেদি একটি প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যের চিন্তাধারার দৈন্যে হতাশ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। উর্দুর পক্ষে উপাচার্যের বর্ণিত যুক্তির কড়া ভাষায় বিরোধিতা করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাল্টা কলাম লেখেন। তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সেই কলামে মত প্রকাশ করেন। দুই বিশেষজ্ঞের এমন মতবিরোধ সহজেই সচেতন মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিষয়টি উঠে আসে জনসাধারণের আলোচনায়। দেশ বিভাগের সাড়ে তিন মাসের মাথায় করাচির এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এই খবর ঢাকায় পৌছানোর পর ক্ষোভের আগুন ঝলসে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে দল-মত নির্বিশেষে অধিকাংশ বাংলাভাষী ঐক্যবদ্ধ হন। এই ঐক্যের প্রয়াস রচনায় পূর্ব বাংলার একঝাঁক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি ছাত্র পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এর কয়েকদিন পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি শিক্ষা শান্তি ও প্রগতির পতাকাবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান।
ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে আকাশসম জনপ্রিয় ছাত্রনেতা  শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের পথে ধীরে ধীরে এগুতে থাকে।
করাচির শিক্ষা সম্মেলনের গৃহীত প্রস্তাব ওই ডিসেম্বরেই ঢাকায় পাঠানো হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই প্রস্তাবের প্রতিবাদে শহরের সব স্কুল ও কলেজের ছাত্রদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এনে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করা হয় আর  এর নেপথ্যের অগ্রসৈনিক তরুণ নেতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান। সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম সভাপতিত্ব করেন।
তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসেরও  সম্পাদক । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকে এই প্রতিবাদ সমাবেশটি ছিল রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিপুল আয়োজনে প্রতিবাদের প্রথম আয়োজন। সমাবেশের পর একটি বিক্ষোভ মিছিল ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয় প্রদক্ষিণ করে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসার সামনেও বিক্ষোভ করে।
তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা তখন ছাত্রসমাজের কাছে তুঙ্গে। তিনি আপামর ছাত্র-জনতা, তমুদ্দন মজলিসহ অন্যান্য সংগঠনকেও সক্রিয় হওয়ার প্রেরণা জোগাতে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন।
এখানে উল্লেখপূর্বক বলতে হয়  সাইড লাইনে থেকে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান মায়ের ভাষার  জন্য যা যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই করার প্রত্যয় ও দৃঢ়সংকল্প।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বঙ্গবন্ধুুর প্রস্তাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বানকালে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুু কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তিলাভের পর ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ছাত্র-জনতার সভার আয়োজন করা হয়। এই সভায় বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। সভায় পুলিশ হামলা চালায়। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে সভা থেকে বঙ্গবন্ধুু ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানান। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য বঙ্গবন্ধুু  আবার গ্রেফতার হন। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তিপান। ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কারণ পাকিস্তানের শাসকরা তখন আরবি হরফে বাংলা লেখার অদ্ভুত পদ্ধতি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের একজন শিক্ষাবিষয়ক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেন, অর্থাৎ বাংলা ভাষা থাকবে। কিন্তু লেখা হবে আরবি হরফে! মূলত রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির বদলে বাংলা ভাষাকে বিলুপ্ত করার গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবেই এই তত্ত্ব নিয়ে উৎসাহী হয়ে ওঠে শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু বাংলার ছাত্রসমাজকে বোকা বানানো কি অত সহজ! ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা এই প্রস্তাবের বিপক্ষে আবারও গর্জে ওঠেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। আর সেই ধারাবাহিতায় ছাত্রলীগের প্রথম আহ্বায়ক নইমউদ্দিন আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে পত্রিকায় বিবৃতি দেন। ওই বিবৃতির ভাষা ছিল প্রচন্ড আক্রমণাত্মক এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র তত্বের বিরুদ্ধে দাঁতভাঙা জবাব।
আরবি হরফে বাংলা লেখার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদের মধ্যেই পাকিস্তানি সরকার শুধু পূর্ব বাংলায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আরবি হরফে বাংলা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেয়। হাজার হাজার টাকা খরচ করে আরবি হরফে বাংলা ভাষা শিক্ষার এক অদ্ভুত কিসিমের বই ছাপাতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে বই রচনাকারীদের নানা রকমের পুরস্কার ও উপাধি দেওয়া হয়। এত কিছু করার পরও বঙ্গবন্ধুুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলার ছাত্রসমাজ, সাধারণ জনগণ এই উদ্ভাবিত পদ্ধতিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। মূলত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চেয়েছে বাংলাকে পিছিয়ে রাখতে। এ জন্যই তারা বারবার আক্রমণ করেছে বাংলা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। একটি জাতিকে কোনোভাবে শিক্ষা থেকে দূরে রাখতে পারলেই তার পতন অনিবার্য – এই সত্যটিই প্রয়োগ করতে চেয়েছিল উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠী আর তাদের বাংলাভাষী কিছু বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর!  পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী এলিট শ্রেণির শাসকরা বুঝে নিয়েছিল, তাদের অন্যায় -অবিচারের শাসনব্যবস্থায় বাঙালিরা যে কোনো সময় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ কট্ররপন্থি নেতাদের চেয়ে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতাদের প্রভাব ছিল বাঙালিদের ওপর বেশি। পাকিস্তানের মতো ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিকভাবেই তা আতঙ্কের কারণ। তাই পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শুধু বাংলাকে কীভাবে দমিয়ে রাখা যায়, তার ফন্দি আটতে থাকে কুশীলবরা। এই চক্রান্তটিকে বারবার বিভিন্ন রুপে সামনে আনা হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, খাজা নাজিমুদ্দিনের মুখের ওপর যেখানে বাঙালি ছাত্ররা বাংলা ভাষার প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি না হওয়ায় উর্দুর বদলে এবার সামনে আনা হয় আরবিকে। এ ক্ষেত্রেও প্রবল প্রতিবাদের মুখেই যখন শোষকশ্রেণি আরবি হরফে বাংলা শিক্ষার কার্যক্রম চালু করে দেয়, পূর্ব বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা তখন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া পাঁচমিশালি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এমনিতেই ঝুট-ঝামেলার কমতি ছিল না, পাকিস্তানিদের পাঁয়তারা তাতে আরও অচলাবস্থা সৃষ্টি করে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে হয়তো ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতর মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে – তবে এই দিনটি পর্যন্ত পৌঁছাতে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে  সারা বাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে টানা কয়েক বছর তুমুল আন্দোলনমুখর সময় সামাল দিতে হয়েছে। বারবার আন্দোলন ভণ্ডুলের চেষ্টা হয়েছে, গতি ঝিমিয়ে এসেছে – প্রতিবারই বঙ্গবন্ধুু ছাত্রলীগকে নিত্যনতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের থিউরি দিয়ে আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতেন।
আরবি হরফের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামও ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে এসে কার্যত অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে বিভিন্ন কারণে। এরই মধ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন  পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের প্রথম বিরোধী শক্তি হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক দল  প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের দাবি দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধুু তার প্রতি সমর্থন জানান। ১৯৪৯ সালের ২৯ মার্চ আন্দোলনে যোগ দেয়ার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুুকে অযৌক্তিকভাবে জরিমানা করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুু জরিমানা দেননি এবং অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। বরং বঙ্গবন্ধুু চতুর্থ শ্রেণির আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। ১৯৪৮ সালের ২০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সৃষ্ট আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুুকে গ্রেফতার করা হয়।
কারাবন্দি অবস্হায় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগ থেকে বিদায় নেন এবং ১৯৪৯ সালের ২৭ জুলাই বঙ্গবন্ধুু জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পেয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে না গিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে খাদ্যের দাবীতে তিনি আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি এই আন্দোলনের কারণে বঙ্গবন্ধুুকে গ্রেফতার করে জান্তা সরকার। প্রথম দু’বার কোনো প্রকার মামলা বা অভিযোগপত্র না দিলেও তৃতীয়বারের এই গ্রেফতার ছিল পরিকল্পিত। নিরাপত্তা আইন নামক একটি ভয়ানক আইনে তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এই আইনে যে কোনো মানুষকে বিনা বিচারে আটক রাখা যেত। এবার বন্দিদশার স্হায়িত্ব হলো অনেক দীর্ঘ। যেতেতু বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের রুপকার ও গোড়া পত্তনকারী। এবারের ‘৫২ এর উত্তাল ফেব্রুয়ারিতে এসেও তিনি নিশ্চুপ ছিলেন না। ‘ ৫২-এর শুরুর দিকে, অর্থাৎ জানুয়ারিতে তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলে বন্দি অবস্হায় চিকিৎসাধীন। সেখানে বসেই তিনি ভাষা আন্দোলনের যাবতীয় কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে দিতেন। রাজপথের আন্দোলনকারীদের পরামর্শ গ্রহণের অন্যতম জায়গা হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের হাসপাতালের কেবিন। প্রতি রাতে আন্দোলনকারীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে যেতেন। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ হতো সেখান থেকে। বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে বন্দি অবস্হায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই সময়টুকুর দিকে তাকালেই ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি-ই রাষ্ট্রভাষা বাংলার রুপকার।
১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে গ্রেফতার হয়ে বঙ্গবন্ধুু এই জেলে সেই জেলে ঘুরে ঘুরে আবার ঢাকা জেলে আসেন ‘৫১ -এর ডিসেম্বর কি ৫২’র জানুয়ারিতে। ঢাকা জেলের এই সময়টুকু মূলত তিনি হাসপাতালেই ছিলেন। দীর্ঘদিন জেলে কঠোর পরিবেশে শেখ মুজিবুর রহমানের চোখের আগের অসুখ আবার বেড়ে গিয়েছিল, যার জন্য তাঁকে ঢাকা জেলের এই সময়টুকু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আর এ সুযোগেই তিনি হাসপাতালের কেবিনে বসে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে থাকেন। জেলে যাওয়ার কিছু দিন পরই বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানকে গোপালগঞ্জ জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কারণে  আন্দোলনে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। দীর্ঘদিন পর বঙ্গবন্ধুু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ অন্যান্য নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগের সুযোগ ফিরে আসে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও যেন প্রিয় প্রতিষ্ঠাতাকে কাছে পেয়ে প্রাণ ফিরে পান। চিকিৎসাধীন অবস্হায় প্রতিদিন বিকেলে অনেক লোক তাঁকে দেখতে আসে। বঙ্গবন্ধুুর কেবিন ছিল দোতলায় সিঁড়ির পাশে। মেডিকেল কলেজের শত শত ছাত্র এসে ভিড় জমাতেন সেই কেবিনে। বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের পাহারায় থাকা পুলিশের তখন কিছু বলা বা করার থাকত না।
খাজা নাজিমুদ্দিনের ঢাকার বুঁকে দাঁড়িয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার মতো দম্ভোক্তি, অন্যদিকে দীর্ঘদিন পর শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা জেলে আগমন,সেখান থেকে একেবারে আন্দোলন-সংগ্রামের আঁতুড়ঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাকের ডগায় ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য আসা সব কিছু-ই যেন হচ্ছিল বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার ইঙ্গিত।
কেবিনের বাইরে গোয়েন্দা সংস্হার লোকজন পাহারা দিত। পুলিশের পাহারাও ছিল,কিন্তু তারা পড়ে পড়ে ঘুমাত। কারণ তারা ভালো করেই জানতো,বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান পালিয়ে যাওয়ার মতো লোক নন। কেবনিের বারান্দায় বসেই তিনি সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতেন মধ্যরাতে। এখান থেকেই তিনি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের জন্য সবাইকে তাড়া দিয়েছিলেন। ছাত্রলীগই ছিল ছাত্রদের মাঝে একমাত্র জনপ্রিয় সংগঠন। প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মাথায়ই ছাত্রলীগ ছাত্রদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা এবং শীর্ষস্থান দখল করতে সক্ষম হয়।
ছাত্রলীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের এই প্রস্তাবে একবাক্যেই আদেশের মতো মেনে নিয়েছিল। বাম ঘরানায় আদর্শিত তোয়াহা ও অলি আহাদও সংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন। অলি আহাদ ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন।
এদিকে হাসপাতালে বসে বঙ্গবন্ধুুর রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার কথা সরকারের উপর মহলে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তাই তাঁকে আবারও হাসপাতাল থেকে জেলে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানও বুঝতে পেরেছিলেন, হাসপাতালে তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে। শিগগিরই তাঁকে জেলে পাঠানো হবে। তাই তিনি ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে চূড়ান্ত আলাপ-আলোচনা করতে চেয়েছিলেন।
ভাষা  আন্দোলনের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা এবং পরামর্শেই হাসপাতালের কেবিনে বসে ছাত্রনেতারা সিদ্ধান্ত নেয়,২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই জনমত সৃষ্টির জন্য কাজ আরম্ভ করতে হবে। চিকিৎসাধীন অবস্হায়ও তিনি তার জনগণের ভালমন্দের খোঁজখবর নিতেন। হাসপাতাল থেকে জেলে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধুু একটি সিদ্ধান্ত সবাইকে জানিয়ে দেন -১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর থেকে বিনা বিচারে তিনি জেলে আটকে আছেন। ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি তার মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশনে বসবেন। বন্দিজীবনের ইতিমধ্যে ২৬ মাস হয়ে গেছে। বিনা বিচারে জেলে আর কত!
১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে অনশন শুরু করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চলে। শহীদ হন সালাম,রফিক, শফিক বরকতসহ অনেকে। জেল থেকে বঙ্গবন্ধুু এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন এবং একটানা তিন দিন অনশন অব্যাহত রাখেন। ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি টানা অনশনে অসুস্হ বঙ্গবন্ধুুকে স্বাস্হ্যগত কারণে মুক্তি দেয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মায়ের ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুুর নেতৃত্বেই ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমাদের ১৯৭১ সালেে  সুমহান মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতা।
বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বিদেশী সাংবাদিক সিরিল ডান বলেছেন, ‘ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা যিনি রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, কৃষ্টিতে এবং জন্মসূত্রেও ছিলেন খাঁটি বাঙালি। তাঁর দীর্ঘ শালপ্রাংশু দেহ, বজ্রকন্ঠ, মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করার বাগ্মিতা এবং জনগণকে নেতৃত্বদানের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সাহস তাঁকে এ যুগের এক বিরল মহানায়কে রুপান্তর করেছে। কিশোর শেখ মুজিব নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত বাঙালির পাশে থেকে পরিণত হয়েছেন – একজন ছাত্রনেতা থেকে প্রাদেশিক নেতা। প্রাদেশিক নেতা থেকে জাতীয় নেতা। জাতীয় নেতা থেকে বঙ্গবন্ধুু। বঙ্গবন্ধুু থেকে জাতির পিতা। কালজয়ী মহাপুরুষ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।
বঙ্গবন্ধুু ভাষা আন্দোলনের পথিকৃত, স্বাধীনতার মহান স্হপতি এবং বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অর্জিত হয় বহু কাঙ্খিত স্বাধীনতা। আমরা পেয়েছি নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র, গর্বিত আত্মপরিচয়।
বঙ্গবন্ধুু আমাদের রাষ্ট্রভাষা, স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক। বঙ্গবন্ধুু শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। একটি আন্দোলন।একটি বিপ্লব। একটি অভ্যুত্থান। জাতি নির্মাণের কারিগর। একটি ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধুু, ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশ এক ও অবিচ্ছেদ্য। আক্ষরিক অর্থেই বঙ্গবন্ধুু এবং বাংলাদেশ সমার্থক। যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। এমনই যাঁর অবদান, স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কি তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছি?  অথচ ১৪১১ সালের ১ লা বৈশাখ এক জরিপে আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রচার মাধ্যমে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করর্পোরেশন (বিবিসি) -এর বাংলা বিভাগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে ঘোষণা করে। আর এই জরিপে শীর্ষস্থান লাভ করে বঙ্গবন্ধুু পরকালে থেকেও আরেকবার বাংলাদেশ ও বাঙালির জন্য অবিস্মরণীয় অবদান রাখলেন। এজন্যই বঙ্গবন্ধুু ইতিহাসের মহানায়ক। ইতিহাস মহানায়কদের সৃষ্টি করে না। মহানায়করাই ইতিহাসের গতিপথ নিরুপণ করে। বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান এ কাজটিই করেছেন।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে। মুক্তির মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের নেত্বত্বাধীন সরকার মাত্র তিন বছর পাঁচ মাস সময় পেয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনগঠন করে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করেন। বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।
হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে সবার কন্ঠে বাজে একুশের অমর শোকসংগীত –
‘ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি….
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি বাঙালি জাতিসত্তার শেকড়ের অনুপ্রেরণার দিন ‘
এ ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমর কাব্যগ্রন্থ ‘ গীতাঞ্জলী ‘ রচনা করে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ১৯১৩ সালে।
জাতির পিতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেত্বত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কতৃক বাংলাকে আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি এবং ২০১০ সালের ৩ নভেম্বর  জাতিসংঘের ৬৫তম সাধারণ অধিবেশনে চতুর্থ কমিটিতে বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তবটি উপস্হাপন করে এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ফলে এটি বাঙালি জাতি,বাংলাভাষার প্রতি বিশ্ববাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সম্মান প্রদর্শনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলেছে। মাতৃভাষার সংখ্যার বিচারে বাংলা ভাষা পৃথিবীর একটি শক্তিশালী ভাষা।
ভারত উপমহাদেশের বাইরে একমাত্র আফ্রিকার সিয়েরালিওনে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সংসদ বাংলাকে স্বীকৃতির বিল পাস করে। ফলে বাংলা ভাষা লাভ করে এক অনন্য মর্যাদা। বহিঃবিশ্বে ৩০টি দেশের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু রয়েছে বাংলা বিভাগ, সেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার অবাঙালি পড়ুয়া বাংলাভাষা শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করছে।
 ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে বিশ্বের ১৯০টি দেশ।
২০০১ সালের ১৫ মার্চ বিশ্বের সব মাতৃভাষার গবেষণা, উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কাজ করার উদ্যোগে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের উপস্হিতিতে বঙ্গবন্ধুুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তজার্তিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্হাপন করেন ঢাকার সেগুনবাগিচায়।
পরবর্তীতে স্বাধীনতা বিরোধীচক্র জামাত বিএনপি অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে এর কার্যক্রম বন্ধ রাখে। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে কাজ সম্পূন্ন হয় এবং মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পুরোদমে চালু হয়। বর্তমানে আন্তজার্তিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ভাষা সংক্রান্ত গবেষণা, ভাষা সংরক্ষণ ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এটি ভাষার ক্ষেত্রে আন্তজার্তিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে যা বাংলা ভাষাকে বিশ্বমর্যাদায় আসীন করতে ভূমিকা রাখছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হয় সারা পৃথিবীতে একুশে আমাদের মননের বাতিঘর হিসেবে। একুশ এখন সারা বিশ্বের ভাষা ও অধিকারজনিত সংগ্রাম ও মর্যাদার প্রতীক। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাথা  উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অহংকার ” শহীদ মিনার “
ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছাড়া ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। পঁচাত্তর পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমাকে অনুপস্থিত রেখে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার ধৃষ্টতা দেখেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুুকে ইতিহাস থেকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা করে স্বাধীনতা বিরোধীচক্র। আমাদের দেশের কিছু কিছু জ্ঞানপাপীরা বঙ্গবন্ধুুকে ভাষা আন্দোলন বাদ দিয়ে অর্থাৎ পাশকাটিয়ে দেশ ও জাতির সামনে বিকৃত ইতিহাস পাঠ করে এবং একটি প্রজন্মকে ভুল ইতিহাস পাঠ করে বড় হতে হয়েছে। সেই প্রভাব এখনও কিছুটা আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুু স্বমহিমায় সগৌরবে মহান ভাষা আন্দোলনের রুপকার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি-ই আমাদের জাতি রাষ্ট্রের স্রষ্টা। ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানই ভাষা আন্দোলনের রুপকার।
লেখক, কলামিস্ট, সাংবাদিক ও সাবেক সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ।