ব্যাংকগুলোর আদায়কৃত অনেক চার্জ সম্পর্কেই জানতে পারছে না গ্রাহকরা

সার্ভিস চার্জ নামে দেশে কর্মরত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে ইচ্ছেমতো টাকা কেটে নিচ্ছে। কিন্তু গ্রাহকদের ওসব চার্জ সম্পর্কে জানানো হচ্ছে না। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক পরিমাণ নির্ধারণ না করায় ব্যাংকগুলো খেয়ালখুশি মতো সার্ভিস চার্জ আদায় করছে। ব্যাংক থেকে আরোপিত সুদের পাশাপাশি গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ৪৫ ধরনের সিডিউল অব চার্জ। তার মধ্যে শুধু আমদানি-রফতানিতেই কাটা হচ্ছে ২৯ ধরনের চার্জ বা কমিশন। আর ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহক ১২-১৫ ধরনের মাসুল দিচ্ছে। এমনকি ঋণ নিষ্পত্তিতেও চার্জ গুনতে হচ্ছে। তার বাইরেও রয়েছে আরো অনেক হিডেন চার্জ, যা গ্রাহক কোন দিনও জানতে পারে না। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের সার্ভিস চার্জ তো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাতে প্রতিনিয়ত গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা গ্রাহক স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চার্জ নির্ধারণ ও ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় সব ধরনের কমিশনের তালিকা টানানোর পরামর্শ দিয়েছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদ ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতি সহায়তাও দিয়ে আসছে। তারপরেও প্রকৃতপক্ষে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামছে না। বর্তমানে ঋণের সুদ কাগজ-কলমে ৯ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা ১২-১৮ শতাংশ পড়ছে (প্রণোদনা ঋণ এ হিসাবের বাইরে)। কারণ ব্যাংকগুলো এখন সার্ভিস চার্জ ডাবল করে দিয়েছে। প্রতিটি এলসিতে আগে ২০ পয়সা কমিশন কাটলে এখন ৪০ পয়সা কাটা হয়। আর আগে ৪০ পয়সা কাটা হল এখন কাটা হচ্ছে ৮০ পয়সা। ফলে গ্রাহকের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ওই কোন কোন ক্ষেত্রে ঋণের সুদ আগের চেয়েও বেড়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, বৈদেশিক বাণিজ্য (আমদানি) লেনদেনের ওপর ১৫ ধরনের কমিশন বা চার্জ আদায় করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে- এলসি ওপেনিং কমিশন। শতভাগ এফডিআর (স্থায়ী আমানত) রেখে সাইট এলসি খোলার জন্য দিতে হয় শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ কমিশন। ব্যাক-টু-ব্যাক, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) এবং বিভিন্ন অনুদান তহবিল থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও গ্রাহককে একই কমিশন দিতে হয়। তবে ডেফার্ড (বকেয়া) এলসির জন্য এ কমিশন আরো বেশি (শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ)। এলসির সময় এবং পরিমাণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গ্রাহককে অতিরিক্ত কমিশন গুনতে হয়। বিদেশী এলসি হলে প্রতিবারে ৭৫০ টাকা এবং লোকাল হলে দিতে হয় ৩০০ টাকা। এ্যাড কনফার্মেশন চার্জ শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। তাছাড়া সুইফট চার্জ অব এলসি ট্রানজেকশনের মধ্যে প্রি-এ্যাডভাইস বিদেশী এলসির জন্য কমপক্ষে এক হাজার এবং লোকাল এলসিতে ৫০০ টাকা কমিশন দিতে হয়। ওসব ঋণ পরিচালনার জন্য গ্রাহককে আবার আলাদাভাবে কমিশন দিতে হয়। লোকাল এলসির জন্য যেখানে সর্বনিম্ন অঙ্ক এক হাজার টাকা, সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য সেখানে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা এবং সার্কভুক্ত দেশের বাইরের দেশগুলোর জন্য কমপক্ষে তিন হাজার টাকা। এলসি এ্যাডভাইসিং ফি ৭৫০ টাকা। একসেপ্টেন্স কমিশন শূন্য দশমিক ১০ থেকে শুরু করে শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নেয়া হয়। লোকাল এলসিতে ডিসক্রিপ্যান্সি (অমিল) চার্জ ২৫ মার্কিন ডলার এবং বিদেশী এলসির জন্য ৮০ মার্কিন ডলার। লোকাল এলসির পেমেন্ট চার্জ বিলপ্রতি ৩০০ টাকা এবং বিদেশী এলসির জন্য ২০ মার্কিন ডলার। অরিজিনাল ডকুমেন্টের অনুপস্থিতিতে জাহাজীকৃত পণ্য খালাসের জন্য প্রতি ডকুমেন্টে এক হাজার টাকা। নো অবজেকশন সার্টিফিকেটের (এনওসি) জন্য ৫০০ টাকা। স্টেশনারি খরচ ৩০০ টাকা, আইআরসি নবায়নের সার্ভিস চার্জ ৫০০ টাকা। রফতানি বাণিজ্যেও একই চিত্র। সেখানে ১৪ ধরনের চার্জ বা কমিশন কাটা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রফতানি বাণিজ্যে ৭৫০ টাকায় এলসি এ্যাডভাইজিং কমিশন। এলসি ট্রান্সফার বা স্থানান্তরের জন্য ৭৫০ টাকা। রফতানির জন্য ব্যাংকের গ্যারান্টি এ্যাড কনফার্মেশন কমিশন শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। পণ্য রফতানির জন্য দু’পক্ষের চুক্তি বা নেগোসিয়েশন হিসেবে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। তাছাড়া রফতানি চুক্তির ভিত্তিতে এক্সপোর্ট বিল কালেকশনের জন্য গুনতে হয় আরো শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। ডকুমেন্ট কুরিয়ার করে পাঠানোর জন্য এশিয়ার মধ্যবর্তী দেশগুলোতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং এশিয়ার বাইরের দেশগুলোর জন্য ডকুমেন্ট প্রতি ৩ হাজার টাকা রফতানিকারককে গুনতে হয়। তবে নিবন্ধিত এয়ার মেইলের মাধ্যমে পাঠালে এ খরচ হয় ডকুমেন্ট প্রতি কমপক্ষে ৫০০ টাকা। বিল প্রতি বায়িং হাউস কমিশন ১ হাজার টাকা। ইএক্সপি ফরমের জন্য স্টেশনারি খরচ ১০০ টাকা। সিএ্যান্ডএফ, এফসিআর, মানি এক্সচেঞ্জ এবং বায়িং হাউসের জন্য প্রসেসিং ফি প্রথমবারের জন্য ৫ হাজার এবং নবায়নের জন্য ৩ হাজার টাকা। এফসি এ্যাকাউন্ট মেইনটেইনের জন্য প্রতি বছর ২ মার্কিন ডলার এবং পিআরসি ইস্যুর জন্য প্রতিবারই রফতানিকারককে ৫০০ টাকা গুনতে হয়। তার বাইরে ক্রেডিট কার্ড ঋণে সবচেয়ে বেশি সুদ নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সর্বনিম্ন ১৪ থেকে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ সুদ নেয়। বর্তমানে ওসব সুদহার আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফি ও চার্জ।
সূত্র আরো জানায়, ঋণ পেতে হলে গ্রাহককে ব্যাংক প্রসেসিং ফি দেয়া লাগে। ব্যাংকভেদে ওই হার ১ থেকে ২ শতাংশ। ঋণ নিতে গেলে অবশ্যই মর্টগেজ রাখতে হয়। মর্টগেজ তৈরির ফি ২ শতাংশের কম নয়। ১ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মর্টগেজ প্রস্তুত করতে ২ হাজার টাকা ফি লাগে। ২০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকার মর্টগেজ প্রস্তুতিতে ফি লাগে ৫ হাজার টাকা। তারচেয়ে বেশি অঙ্কের মর্টগেজ করতে ৫ হাজার এবং প্রতি লাখে ২ শতাংশ হারে ফি দিতে হয়। তার বাইরে রয়েছে সরকারি বিভিন্ন স্টাম্পের নির্ধারিত মূল্য। ঋণ নিতে হলে গ্রাহককে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিআইবি ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। সেজন্য নির্ধারিত ফি ২০০ টাকা। ঋণের জন্য ব্যাংকে সুনির্দিষ্ট কিছু কাগজপত্র জমা রাখতে হয়। সেজন্য ব্যাংকে ১ থেকে দেড় হাজার টাকা ফি দেয়া লাগে। কোন কোন ব্যাংক এজেন্ট কমিশনও আদায় করে ২ থেকে ৩ শতাংশ। ব্যাংকের জামানতের নিরাপত্তার জন্য দিতে হয় ১ থেকে ২ শতাংশ কমিশন। ঋণের অঙ্ক যতো বেশি, কমিশনের অঙ্কও ততো বেশি। অবশিষ্ট অংশের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করতে হয়। একজন গ্রাহককে যদি ৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে ব্যাংক এবং ওই গ্রাহক ২০ কোটি টাকা নিয়ে বাকিটা পরবর্তী সময়ে নিতে চাইলে ওই ৩০ কোটি টাকার ওপর ১ থেকে ২ শতাংশ হারে সুদ আদায় করে ব্যাংক। আর কোন গ্রাহক যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই তার ঋণ পরিশোধ করতে চান তাহলে তাকে মোট ঋণের ওপর ২ শতাংশ হারে চার্জ (আরলি সেটেলমেন্ট ফি) পরিশোধ করতে হয়। তাছাড়া নন-ফান্ডেড ঋণের ক্ষেত্রে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু চার্জ। তার বাইরে ঋণ নিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে হিসাব খুলতে হয়। ওই ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় চার্জসহ ঋণের সুদহার ডাবল ডিজিটে চলে যায়। তাছাড়া আরো আছে ডকুমেন্টেশন ফি, লিগ্যাল ফি, ঋণ পুনর্গঠন ফি, কিস্তি পরিশোধের তারিখ পরিবর্তন ফি, নিজস্ব অভিভাবক পরিবর্তনজনিত ফি, কোটেশন পরিবর্তন ফি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- হিসাব পরিচালন ফি ৬০০ টাকা (প্রতি ষান্মাসিকে ৩০০) ও এটিএমের ডেবিট কার্ড ফি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কেউ যদি হিসাবের জমার পরিমাণ জানতে চান বা কোথাও ব্যাংক সংক্রান্ত কাগজ জমা দিতে হয় তাহলে স্টেটমেন্ট প্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা চার্জ দিতে হয়। বর্তমানে সব ব্যাংকই অনলাইন ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। অনলাইন লেনদেন করলে ৫০ থেকে ৫ হাজার টাকা, ডেবিট কার্ড শুরুত চার্জ ৪৬০ টাকা এবং বার্ষিক চার্জ ৫০০ টাকা।
এদিকে ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গত এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্ক কার্যকর করা হয়েছে। বৈশ্বিক নিয়ম হচ্ছে সুদহার কমলে সার্ভিস চার্জ বাড়ে। কারণ ব্যাংক পরিচালনায় নানা ধরনের খরচ রয়েছে। আইটি, অনলাইন, কমপ্লায়েন্স, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, গ্রাহক সেবার মান বাড়ানো ইত্যাদিতে অনেক খরচ করতে হয়। ওসব করতে হলে অবশ্যই চার্জ থাকতে হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক আগে যেমন সার্ভিস চার্জের একটা তালিকা করে দিতো, এখন তা করছে না। এখন ব্যাংকগুলো কি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা শুধু সংরক্ষণ করছে। তাতে গ্রাহকদের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিভিন্ন ক্ষেত্রের সার্ভিস চার্জের সীমা নির্ধারণ করে দেয়া।