বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের সম্মান আমাদের রক্ষা করতে হবে

এইচ এম মেহেদী হাসান: বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করা। জাতি রাষ্ট্রের শ্রষ্টা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক, বাঙালি জাতির পিতা, মহা কালের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তেইশ বছরের লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আসে বাঙালি জাতির কাঙ্খিত বিজয়। বাঙালি জাতির জন্য তাঁকে বারবার কারাবরণসহ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। সকল প্রকার অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লাখো লাখো জনতার সামনে দ্ব্যর্থকন্ঠে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ‘তিনি আরও বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, তবু এদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাহস, এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এদেশের সর্বশ্রেণীর মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। পাকিস্তানী হায়না ও এদেশীয় তাদের দোসরেরা যুদ্ধের শুরুতেই বাছাই করে করে বুদ্ধীজীবীদের হত্যা করতে থাকে। দীর্ঘ নয়মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, কিন্তু ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে পাক হানাদার বাহিনী যখন বুঝতে শুরু করে যে তাদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব না,তখন তারা নবগঠিত দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দূর্বল এবং পঙ্গুকরে দেয়ার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। বন্দী অবস্হায় বুদ্ধীজীবীদের বিভিন্ন বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ক্ষত-বিক্ষত ও বিকৃত লাশ রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়। অনেকের লাশ শনাক্তও করা যায়নি, পাওয়াও যায়নি বহু লাশ। মেজর জেনারেল কুখ্যাত রাও ফরমান আলী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সাথে একসাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পৃথিবীর জগন্যতম হত্যাকান্ডের পথে হাটে পাকিস্তান। পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরেরা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে-খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে,পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আল-বদর এবং আল-শামস কসাই বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধারণা করা হয় পাকিস্তানী পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল মেজর জেনারেল কুখ্যাত রাও ফরমান আলী। কারণ স্বাধীনতার পর ধ্বংসাত্মক বঙ্গভবন থেকে তার স্বহস্তে লিখিত ডায়েরি পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। এছাড়া কুখ্যাত আইয়ুব শাসন আমলের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের এক সাক্ষাৎকার হত জানা যায় যে,ফরমান আলীর তালিকায় তার বন্ধু কবি সানাউল হকের নাম ছিল। আলতাফ গওহরের অনুরোধক্রমে রাও ফরমান আলী তার ডায়েরীর লিস্ট থেকে সানাউল হকের নাম কেটে দেন। এছাড়া আলবদরদের জন্য গাড়ির ব্যবস্হা কুখ্যাত ফরমান আলীই করেছিল বলে তার ডায়েরীতে একটি নোট পাওয়া যায়। এছাড়া তার ডায়েরিতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন মার্কিন নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এদের নামের পাশে ইউএসএ এবং ডিজিআইএস লেখা ছিল। এর মধ্যে হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে যুক্ত ছিল এবং ডুসপিক ছিল সিআইএ এজেন্ট। এ কারণে বলা হয়ে থাকে পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ’র ভূমিকা ছিল। সেটা অবশ্য বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে পাওয়া প্রমাণিত দলিল। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ হতে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়।ডিসেম্বরের ১০ তারিখ হতে বুদ্ধীজীবী হত্যাকান্ডের প্রস্তুতি নেয়া হতে থাকে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। অধ্যাপক,সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখক-সহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের কুখ্যাত পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরেরা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেদিন প্রায় ২৫০ জনের মত বুদ্ধীজীবীদের তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কালো কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর,নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্যান্য আরো অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের উপর বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়। এমনকি, আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পরেও হানাদার পাক বাহিনী এবং তার সহযোগীদের গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া যায়। এবং সত্যতাও পাওয়া যায়। এমনই একটি ঘটনায়,১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখ স্বনামধন্য চলচ্চিত্র -নির্মাতা জহির রায়হানকে হত্যা করা হয়। এর পেছনে সশস্ত্র বিহারী ও এ দেশীয় পাক হানাদার বাহিনীর দোসরেরা জড়িত। পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পক্ষে বুদ্ধীজীবীদের হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল মেজর জেনারেল কুখ্যাত রাও ফরমান আলী। আর তাকে তালিকা প্রস্তুতিতে সহযোগিতা ও হত্যাকান্ড বাস্তবায়নের পেছনে ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীর গঠিত কুখ্যাত আল বদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিল বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দিন (অপারেশন ইন-চার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান, কাদের মোল্লা (প্রধান জল্লাদ)। ১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়, যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ৩০ জন বুদ্ধীজীবীর নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল। তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বদ্ধভূমি হতে বেশ কয়েকজন বুদ্ধীজীবীর গলিত লাশ
পাওয়া যায় যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল। আর চৌধুরী মঈনুদ্দিন ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিল। সে অবজারভার ভবন হতে বুদ্ধীজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদকে পৌঁছে দিত। এ ছাড়া আরো ছিল এ বি এম খালেক মজুমদার (শহীদুল্লাহ কায়সারের হত্যাকারী), মাওলানা আবদুল মান্নান (ডাঃআলীম চৌধুরীর হত্যাকারী), আবদুল কাদের মোল্লা (কবি মেহেরুন্নেসার হত্যাকারী) প্রমুখ। চট্টগ্রামে প্রধান হত্যাকারী ছিল ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার দুই ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী) এবং গিয়াস কাদের চৌধুরী। এদের মধ্যে সাকা চৌধুরী ও কাদের মোল্লার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ফাঁসি হয়।
অবিভক্ত বাংলায় রাজা রামমোহন রায় এবং ইয়ং বেঙ্গল নামের প্রগতিবাদী দল বুদ্ধিবাদী এমন অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যা সমকালীন বাংলার সমাজকে বিস্মিত এবং আন্দোলিত করেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে নানা ঘটনা ও দুর্ঘনা সম্পর্কে সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের নানারুপ তর্ক-বিতর্ক ও পরামর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রকে চালিত করেছে। তবে বাঙালির পরিপূর্ণ মানস গঠনে বুদ্ধিজীবীদের নানা তর্ক-বিতর্ক ও ব্যাখ্যা -ব্যাখ্যান সবচেয়ে বেশি সক্রিয়তা লাভ করেছে দেশ বিভাগের পর।স্পষ্ট করে বললে পাকিস্তান সৃষ্টি এবং পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান জনগণকে বৈষম্যের শিকারে পরিণত করার পর থেকে। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের ফলে বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সৃষ্ট বৌদ্ধিক বিতর্ক একদিকে বাঙালির স্বাজাত্যবোধকে যেমন তীব্র ও তীক্ষè করেছিল তেমনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেরণায় বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধও করেছিল। ফলে, পাকিস্তান বিরোধী যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে বাঙালির সম্পৃক্ততাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। বুদ্ধিজীবীরাই এদেশের মানুষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন সবচেয়ে বেশি। তবে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের গ্রষ্টা, বঙ্গবন্ধু আজীবন বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে গিয়েছেন। এবং তিনি খোকা মুজিব থেকেই এবিষয়ে কাজ করেছেন। জাতীয়তাবাদী চেতনার আরেক নাম শেখ মুজিব। তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা যেন ছড়িয়ে পরতে না পারে সে জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরামর্শ করে দাঙ্গা থামানোর ব্যবস্হা করেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে প্রেরণা সঞ্চার করেছেন বঙ্গবন্ধুর মতো বুদ্ধিজীবীরাও। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী সমাজের বৌদ্ধিক প্রেরণায় শাণিত হতে থাকে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন।অবশেষে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রায় ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনের জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যকে ‘চ্যালেঞ্জ’ করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পক্ষে জাতির সামনে, পাকিস্তানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জীবনের মায়া ত্যাগ করে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। মূলত এই ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান। আর পাকিস্তানের রোষানলে পরে বঙ্গবন্ধুকে জীবনের বেশির ভাগ সময়ই জেলখানার ভিতর থাকতে হয় অর্থাৎ স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ৪ হাজার ৬ শত ৮২ দিন কারাগারে থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তাইতো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং এদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। ২৫ মার্চ রা কে ‘অপারেশন সার্চ লাইট ‘পরিচালনায়ও অন্যতম টার্গেট ছিল এদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। আর বঙ্গবন্ধুকে তো হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তারই করা হয়, নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে। পাকিস্তানের দোসর এদেশীয় দালালচক্র যখন ক্রমশ উপলব্ধি করছিল যে,মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা ছিন্নভিন্ন এবং তাদের পরাজয় অনিবার্য কখন তারা বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করে। পাকিস্তানি বাহিনী এবং এদেশে ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তান পন্থীরা এও উপলব্ধি করেছিল যে, মুক্তিযুদ্ধে সফল অভিযানের পেছনে রাজনৈতিক নেতাদের মতোই যারা বুদ্ধি, প্রেরণা,উৎসাহ এবং বাঙালির স্বাজাত্যবোধ সম্পন্ন সাংস্কৃতিক চেতনায় উজ্জীবিত করেছেন তারা বেঁচে থাকলে সেইসব দেশদ্রোহীদের পক্ষে এই দেশের মাটিতে টিকে থাকা দুষ্কর। তাই পেশাজীবী বাঙালির নানা স্তরের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ওপর নেমে আসে ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিত গুপ্ত হত্যার নিষ্ঠুর আক্রমণ। পাকিস্তানের দোসরা আরো চিন্তা করেছিল এইসব বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমেই স্বাধীনতা পেতে যাওয়া বাঙালিকে একটি পঙ্গু জাতিতে পরিণত করা সম্ভব। তাই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় তথা স্বাধীনতা লাভের মাত্র দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের গভীরর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে এ হত্যাকান্ড পরিচালিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বর ও নারকীয় হত্যাকান্ড সংঘটিত করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরেরা। বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষ এ হত্যাকান্ডের সংবাদে পুনরায় স্তম্ভিত হয়ে যায় চমকে ওঠে সমগ্র বিশ্ব।এর আগে ২৫ মার্চ কালো রাতে ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট ‘নামে পরিকল্পিত গণহত্যা পরিচালনার মাধ্যমে বাঙালির ওপর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে জাতীয?ভাবে প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন’নিউজ উইক ‘-এ ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয় এক হাজার ৭০ জন। আর এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত বাংলা পিডিয়ায় এ সংখ্যা এক হাজার এগারো জন। কিন্তু দেশব্যাপী এ সংখ্যা যে আরো বেশি তা বলাইবাহুল্য। অথচ অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস! বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরেও বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সব ইতিহাসকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেয় খুনি মোস্তাক ও খুনি জিয়া। এবং পাকিস্তানের চর খুনি জিয়া বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধাপরাধীদের রাষ্ট্র-ক্ষমতা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করে এবং কি তার উত্তরসূরিরাও একই কাজ করে। পাকিস্তান পরাজিত হলেও তারা এদেশে তাদের একটি শক্তিশালী বংশধর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল বলে পাকিস্তানি ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ এইসব বংশধরদের সহযোগিতায় অবলীলায় সম্পন্ন হয়েছে। সশস্ত্র যুদ্ধে পাকিস্তানের সামগ্রিক পরাজয় যখন একেবারেই সন্নিকটে তখন জাতির মেধাবী সন্তানদের গোপনে প্রথমত গুম এবং পরে হত্যা করা হয়। এ হত্যা পাকিস্তানের প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে সৃষ্ট। তারা ভাল করেই বুঝেছিল এবং জেনেছিল যে,রাজনৈতিক চেতনার পাশাপাশি বাঙালিকে সাংস্কৃতিক চেতনায় জাগ্রত রাখার পশ্চাতে বুদ্ধিজীবীদের প্রেরণাই ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
তারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সাফল্যে ঈর্ষাণ্বিত হয়েও বুদ্ধিজীবী হত্যায় অত্যন্ত সুচারুভাবে গোপনে সংঘবদ্ধ এবং সুখী ও সমৃদ্ধ বাঙালির দিশারি স্বরুপ সক্রিয় চেতনার স্ফুরণসমূহ নিভিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা ভেবেছিল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে পারলে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আলোহীনতায় আর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তারা এও ভেবেছিল স্বাধীন হলেও দেশটি আর কখনো তার যথাযথ অস্তিত্ব নিয়ে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে আত্মপ্রকাশে সক্ষম হবে না। মূলত বাঙালিকে এবং স্বাধীন হতে যাওয়া বাংলাদেশটিকে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যেই বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা রচনা করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর জামাতের রাজাকার, আলবদর,আলশামস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী যে, গণহত্যা শুরু করে তার জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং তা চট্রগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রেডিওতে প্রচারিত হতে থাকে,এবং তাঁর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এদেশের সর্বস্তরের মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৪ ডিসেম্বর যে হত্যাযজ্ঞের অপরাজনীতি শুরু হয় তা স্বাধীন দেশেও প্রবহমান থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাও সেই হত্যাযজ্ঞের ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর নীলনকশা বাস্তবায়নে যুক্ত হয় এদেশের তাদেরই রেখে যাওয়া ও তাদের আদর্শের চর খুনি জিয়া ও মোস্তাকগংদের। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের মতাদর্শের যেমন রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয় তেমনি শুরু হয় ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব! বিকৃত ইতিহাসের পথ ধরেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীরাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে এবং মুক্তিযুদ্ধকে অতীতের বিষয় উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশ চলতে থাকে পশ্চাৎ গতিতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন চার মূলনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাকিস্তানি ভাবধারার আদর্শে রাষ্ট্র চালাতে থাকে অবৈধ শাসক জিয়া। তাই যখনই দেখা গেছে পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসী এই গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে তখনই তাদের মধ্যে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির প্রবণতা সক্রিয় হয়ে উঠেছে । ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে তৎকালীন বিএনপি জামাত জোট সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালিয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ করে এটাও অপরাজনীতির অপচ্ছায়া মাত্র! বিকৃত ইতিহাস হাজার বছরের বাঙালি জাতিসত্তা সম্পর্কে আমাদের যেমন উন্মূল করেছে তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সময় গৃহীত চার মূলনীতির বিসর্জন আমাদের বিস্মিত করেছে। সুতরাং ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ মা বোন,আর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মা শান্তিতে রাখতে হলে আর কোনো দিন যেনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বিএনপি জামাত বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না পারে সেই বিষয়ে সবার তীক্ষè নজর রাখতে হবে। তবেই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্বার্থকতা হয়ে ওঠবে।
লেখক: সাবেক সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় সংসদ।