বঙ্গবন্ধু, সাতই মার্চ ও আজকের বাংলাদেশ

এইচ এম মেহেদী হাসান: একাত্তরের সাতই মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন,তা ছিল ক্রান্তিকারী – ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাস্তবে যুগান্তকারী। গণমানুষের মুক্তির ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে কোনো জননায়কের এমন আহবান আজ পর্যন্ত মানব ভাগ্যের পরিবর্তনের সমগ্র ইতিহাসে বিরল। গণমানুষের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা, আকাশ পানে হাত বাড়ানো -স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে নেবার আকাঙ্ক্ষা, ভয় থেকে অভয়ে উত্তরণ,যদিও পাখা পুড়ে ছাই হবার ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপ দেওয়া শূন্যে, -এ সবই প্রবল প্রাণের বিপুল উৎসাহে, কিন্তু প্রাণিত পরিমিতিতে, সুশৃঙ্খল চিন্তার স্বচ্ছতায় উৎসাহিত হয় তাঁর জাতিসত্তার আহত অভিমানে গর্জনে গর্জনে অনলবর্ষী বক্তৃতায়। এক মুজিবের কন্ঠে শত লক্ষ মুজিবের কন্ঠস্বরের ধ্বনি প্রকৃতই বাজতে থাকে। আক্ষরিক অর্থে জাতির কন্ঠস্বর অবিমিশ্র কিন্তু পরিপূর্ণ -আমরা শুনি। কোনো জাতির জীবনের ধারাবাহিকতায় এমনটি ঘটে খুব কমই। ইতিহাস তা ঘটতে দেখে। তাঁর প্রেরণা চেতনায় ধারণ করেছি। আবার আত্মবিস্মৃতিতে,কৃতঘ্নতায়, আর হিংস্র বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁকে সদম্ভে প্রত্যাখান করে দুর্দিনের কানাগলিতে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছি। আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতার খাসতালুকে তারই দাপট। অন্ধকারে মাথাকোটাই বুঝি এখন আমাদের কর্মফল। এই বাস্তবতায় সাতই মার্চ আসে, যায়। আর-এক সাতই মার্চ সামনে নিয়ে ফিরে তাকাই ওই অবিনশ্বর -এবং অবিস্মরণীয় সাতই মার্চের দিকে। বোঝার চেষ্টা করি কী ছিল ওই ভাষণে যা এখনও আমাদের পথ দেখায় -অবশ্য, যদি আমরা তা দেখতে চাই। আর তারই বিপরীতে লক্ষ করি,ব্যর্থতার আস্তাকুঁড়ে, হীনমন্যতায় ভুগে ভুগে তাকেই কেবল বেহেশতের সুখশয্যা বলে চাপিয়ে দেবার অব্যাহত অপচেষ্টা কীভাবে আমাদের এক শ্রেণীর ক্ষমতার সিপাহসালাররা আজ তৎপর। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ কোনো তৈরি করা বক্তৃতা নয়। তা স্বতঃস্ফূর্ত ও সরাসরি চেতনায় প্রস্ফুটিত হয়ে হৃদয় থেকে উৎসারিত। কিন্তু অতি সুসম্বন্ধ ; অতিকথন নেই,পুনরুক্তি নেই,হোঁচট খাওয়া, বা থামাথামিও নেই। নিখুঁত ঠাসবুনুনি। ঝড়ের মতো বলা,অথচ প্রতিটি কথা স্পষ্ট -ধ্বনিসুষমায় যেন শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী গানের দ্রুতলয়ের মেজাজ। ইতিহাস মুখর হয়ে ওঠে তাঁর বলায়। কন্ঠে ঘোষিত হয় ইতিহাসের অমোঘ নির্দেশ। এ ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালি জীবনে সকল বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে সকল স্বপ্নকল্পনা নিয়ে গড়া। তা থেকে জাগে সংকল্প। তালিকা রচিত হয় কর্তব্যের। এবং এ সবই ঊনিশ মিনিটের ভাষণে। কাল স্তম্ভিত হয়ে থেকেছিল বুঝি ওই ঊনিশ মিনিটের পরিসরে। তবে সব নির্দেশে গাণিতিক স্পষ্টতা থাকে না। অনেক কথাই সারতে হয়েছে ইঙ্গিতে। কারণ, বাস্তব পরিস্থিতি তখনও খোলাখুলি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার, বা তার ভিত্তিতে কথা বলার অনুকূল ছিল না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি ছিল পাকিস্তানেরই। সে অবস্হায় আগ বাড়িয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা বিচ্ছিন্নতাবাদী কান্ড বলেই বহির্বিশ্বে গণ্য হতো। বাহবা দেবার লোক তাতে মিলত ঠিকই। কিন্তু তা হতো আত্মঘাতী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তারই সুযোগ দিয়ে নির্বিচারে হামলার ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক অভ্যুদয় নস্যাৎ করার আইনগত ও নীতিগত ভিত্তি একটা খুঁজে পেত। বৃহৎ শক্তিধর অধিকাংশ রাষ্ট্রের সমর্থনও তার জুটত। ওইভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার মুহূর্তেই একলা হয়ে পড়ত বাংলাদেশ। সুযোগ বুঝে ভেতরের শত্রুরাও তৎপর হয়ে উঠত। সবদিক থেকে খোলাখুলি বিরোধিতার মুখে ওই স্বাধীনতার কার্যকর রাজনৈতিক রুপ নির্মাণ আর কোনো বাস্তব ভূমিকা দেখা পেত কি না সন্দেহ। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিশিষ্ট হতো অঙ্কুরেই। বঙ্গবন্ধুও পরিচিত হতেন কেবল এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে। আমরা জানি, প্রায় একই সময়ে পূর্ব নাইজেরিয়ায় বায়াফ্রার স্বাধীনতা ঘোষণা ব্যর্থ হয়েছিল এইভাবেই। যদিও সেখানকার জনসাধারণও বাংলাদেশের বিপুল জনসমষ্টির মতোই ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। বঙ্গবন্ধুকে তাই মুখ খুলতে হয়েছে এইসব বিষয় মাথায় রেখে। চারপাশে বাধার প্রাচীর। তাদের ফাঁক গলিয়ে পথ কেটে তাঁর বেরিয়ে আসে। আসল কথা কিছুই তাঁর বাদ যাবে না,অথচ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিধি-নিষেধের অজুহাত তুলে কেউ তাঁকে ধরতেও পারবে না। দুই কূল রক্ষা করে তাদের ওপর দিয়ে হাল্কা পায়ে অনায়াসে হেঁটে যাবার মতো তাঁর বক্তৃতা। কোথাও কোনো ঘাটতি নেই। যা জানবার সবই জানিয়েছেন। যাদের যা বোঝার, তারাও তা বুঝেছে। ঠিক ঠিক সাড়াও দিয়েছে। মুক্তিসংগ্রামের মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সবাই মানতে বাধ্য হয়েছে দেশে-বিদেশে সর্বত্র ইনিই বাংলাদেশে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। এঁর কথামতই চলে রাষ্ট্রের কাজ। তাকে অমান্য করার কথা তখন কারো মাথাতেও আসে না। স্বাধীনতার কার্যকর রুপায়ণ ঘটে যায় এইভাবে। জনগণের পূর্ণ সমর্থন যে তা পায়, তার প্রমাণ মেলে তাঁর প্রতিটি নির্দেশ মুক্তিসংগ্রামের জয়ী হওয়া পর্যন্ত তাদের অক্ষরে অক্ষরে পালন করায়। সত্য কথা,সুযোগসন্ধানী বিরোধী শক্তিও পাকিস্তানি হানাদারদের ছত্রছায়ায় দানা বাঁধে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দেওয়া জাগ্রত জনতার সক্রিয় প্রতিরোধের মুখে তা খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। একে বলা যায়না বিচ্ছিন্নতাবাদ। কারণ তাদের সংগ্রাম প্রতিরোধের সংগ্রাম। প্রতিরোধ জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়াকে, প্রতিরোধ মানবিক অধিকার লুন্ঠনের সবরকম কর্মকান্ডকে। তারই যৌক্তিক পরিণাম মুক্তির সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম। তার নৈতিক ভূমিকে আর অস্বীকার করা যায় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও না। এবার খুঁটিয়ে দেখি ওই ভাষণের ক’টি গুরুত্বপূর্ণ বাক্য ; কিছু ইঙ্গিতময়, কিন্তু সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যময় নির্দেশ। প্রথমেই তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি।কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা,রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। ‘এখানে কী চেষ্টার কথা তিনি বলেছেন? কেনই বা তাতে ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত? একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, চেষ্টা পাকিস্তানের অখন্ডতা বজায় রাখার। কিন্তু তার প্রাথমিক শর্তই হলো বাঙালির স্বাধিকারের স্বীকৃতি। সমর শাসনে পশ্চিম পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থ তা দিতে অনিচ্ছুক শুধুই নয়,এদেশে বাঙালির রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে ওই দাবি শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে তারা বদ্ধপরিকর।

তিনি আরো বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। এদেশের মানুষের অধিকার চাই।’ এবং এই অধিকারকে তিনি যুক্ত করেন তাদের মুক্তির সঙ্গে :’আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়,বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়,বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ কথাগুলো শুধুই তাৎক্ষণিক আবেগের নয়। ফাঁকা বুলিও নয়। পেছনে তাদের রয়েছে ১৯৬৬-তে ঘোষিত তাঁর ছয়-দফা প্রস্তাবের রুপরেখা। ঔপনিবেশিক শোষণমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে তাতে চাওয়া হয় দেশ রক্ষা ও পররাষ্ট্র -বিষয় বাদ দিয়ে আর সব বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রাদেশিক কতৃত্ব। এমনকি পৃথক মুদ্রা ব্যবস্হা বা মুদ্রার প্রচলন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্হা। আরো দাবি,প্রতিটি প্রদেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা শূন্য। প্রস্তাব করা হয় প্রয়োজনে আঞ্চলিক মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি রক্ষাবাহিনী গড়ার। এ যে প্রকৃতপক্ষে এই বাংলার অর্থবহ স্বাধীনতারই নান্দীপাঠ, এটা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, সেপাই রাজত্বের মাতব্বররা ঠিকই ধরে ফেলে। কিন্তু এই ছয় দফার ভিত্তিতে রচিত হয় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার। আর তার পক্ষেই পড়ে একচেটিয়া গণরায়। বঙ্গবন্ধু সেই জায়গা থেকেই তাঁর এই ভাষণে ঘোষণা করার জোর পান,’এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। ‘-ক্ষমতার উৎস যেখানে জনগণ, সেখানে তাদের বলে বলীয়ান হয়ে আমলা সেপাই আর পাকিস্তানি ‘রবারব্যারন’দের দুষ্টচক্রের খপ্পর থেকে দেশকে মুক্ত করার অঙ্গীকার তিনি অকুণ্ঠে করতে পারেন। তিনি এখানে ব্যক্তি মুজিব নন; বরং সমস্ত দেশবাসীরই প্রাণসত্তার মূর্ত প্রকাশ। প্রকৃতপক্ষে এই জোরেই প্রতিফলন ঘটে তাঁর নির্দেশনামায়। অসহযোগ আন্দোলনের যে কর্মসূচি তিনি সেদিন সেখান থেকে মেলে ধরেন, জনগণ তা তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। পাকিস্তানি হুকুমত নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বোঝা যায়, এদেশের সব মানুষের কার্যকর স্বাধীনতার মূল কারিগর তিনি,বাস্তব কর্মকান্ডে তার প্রকাশ ঘটতে থাকে তাঁকে সামনে রেখে, এবং তাঁকে অবলম্বন করে। তবে ফৌজি শাসকদের মতিগতি নিয়ে দির্ভাবনাও তাঁর ছিল। হানাদার বাহিনীর নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতার পরিচয় মানুষ তো পেতে শুরু করেছে কদিন আগে থেকেই। আগামী দিনগুলো যে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে এবং সব দেশবাসীকে আরো কঠিন দুঃখবরণ করতে হতে পারে, এই আশঙ্কার কালো মেঘের নিচে দাঁড়িয়েই সেদিন তাঁর কথা বলা। তিনি ভয় পান না। গণ -মানুষের ইচ্ছা ও সাহসের ওপর ভর করেই তিনি তাদের বলেন,’আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু -আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি। ‘বাস্তবে তাই ঘটেছিল। স্বাধীনতাকামী জনগণ তাঁর নির্দেশ মেনে আক্ষরিক অর্থেই ঘরে ঘরে দুর্গ তুলেছিল। তিনি আরো বলেন,’সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না। ‘ এবং ভাষণ শেষ করেন মন্ত্রবাণীর মতো এই বলে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। ‘ মুক্তি মানে ঔপনিবেশিক শোষণের শৃঙ্খলা থেকে মুক্তি ;ফৌজি শাসনের অপমান থেকে মুক্তি;স্বাধীনতা মানে নিজেদের স্বাতন্ত্র্যের ও স্বাধিকারের প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠা নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়,তবে পাকিস্তানি শাসকচক্র হানাদার শত্রুবাহিনী’র মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ওই প্রতিষ্ঠাকে ধ্বংস করতে চাইলে তাদের কতৃত্ব অস্বীকার করে নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব ঘোষণা করে। বঙ্গবন্ধুর আহবান ছিল উভয় সম্ভাবনার জন্যেই প্রস্তুত থাকার। আমরা অবশ্যই খেয়াল করি পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি তিনি একবারও উচ্চারণ করেন না, এই দেশ বোঝাতে বলেন বাংলা। এদেশের মানুষের মনে মুক্তির ও স্বাধীনতার ছাপ এমনি করে গভীরভাবে তিনি এঁকে দেন। তা আর মুছে ফেলা যায় না। এবং এর সবটাই তিনি করেন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও তার পন্থা -পদ্ধতি নির্ভূলভাবে অনুসরণ করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও অসাধারণ বহুমাত্রিক। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। কেউ কেউ এ ভাষণকে আব্রাহাম লংকনের ‘গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস'(১৮৬৩) বা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) -এর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম ‘(১৯৬৩) ভাষণের প্রেক্ষাপট আলাদা; বঙ্গবন্ধুর মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার চাপ এবং প্রবল শক্রপক্ষের মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনার মধ্যে তাঁদের ওই ভাষণ দিতে হয়নি। তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে উইনস্টন চার্চিলের একটি ভাষণের সঙ্গেই শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছুটা তুলনা চলতে পারে। তবে সেখানেও চার্চিল শত্রুপক্ষকে আকাশে, মাটিতে এবং জলরাশিতে আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন মিত্রশক্তির প্রবল শক্তিশালী অবস্থান থেকে,কিন্তু বঙ্গবন্ধু, ‘আমরা ভাতে মারব,পানিতে মারব’ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর জনসভাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সর্বাধুনিক অস্ত্র,যুদ্ধ -প্রযুক্তি ও উন্নত কৌশলসমৃদ্ধ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উদ্দেশে। তাঁর অবস্হা ছিল নিরস্ত্র, কিন্তু বিপুল জনসমর্থনধন্য জননেতার অসম-অবস্হান। তবে জনশক্তি যেহেতু যেকোনো মারণাস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী -বঙ্গবন্ধু সেই শক্তির অবস্থান থেকেই কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। স্পষ্টতই, বঙ্গবন্ধু গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর মোকাবেলা করতে বলেছিলেন। তাই চার্চিলের এবং বঙ্গবন্ধুর শত্রুর মোকাবেলার উদ্দেশ্য এক হলেও পথ ছিল ভিন্ন। সকল দিক বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ওইসব ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ। কারণ, এর সঙ্গে একটা জাতি-গঠন প্রক্রিয়ার পূর্ণতা এবং একটা জনগোষ্ঠীর শত শত বছরের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছা-আকাঙক্ষা-স্বপ্ন ও বিপুল আত্মত্যাগের ইতিহাস যুক্ত রয়েছে। দার্শনিক হেগেল রাষ্ট্রগঠনকেই সর্বশেষ্ঠ মানবিক কর্ম বলে আখ্যায়িত করেছেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রগঠনের এই মহৎ কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন বলেই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাঙালি জাতির মহান নেতা এবং বিশ্বের নির্যাতিত নিষ্পেষিত জাতির মহান নেতা।

লেখক; কলামিস্ট, সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।