বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন ও আজকের বাংলাদেশ

রায়হান আহমেদ তপাদার

তরুণ প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে আবির্ভূত হতে দেখেছে এবং তার পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে অসামান্য অবদান তা প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল্যায়ন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। তার পরও আমাদের বাঙালি জাতি সত্তার ঐতিহাসিক বীর প্রতীক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস এবং আদর্শকে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই হবে আমাদের দায়িত্ববোধ।

রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাঙালি আত্মপরিচয়, স্বকীয়তা এবং তা নিয়ে গর্ববোধের পরিচয় পাই। বাঙালি জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতনতার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দরিদ্র, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এই ভেবে যে এই নতুন রাষ্ট্রে দরিদ্র মুসলমান কৃষক জমিদার শ্রেণির নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে। তিনি সব সময় স্বাধীনতার আন্দোলনকে শুধু ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম হিসেবে দেখেননি, তিনি এটাকে দেখেছেন নির্যাতিত দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে। তাঁর জাতীয়তাবাদের ধ্যানধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুষম সমাজব্যবস্থার চিন্তা। বাঙালির জাতিসত্তার স্বীকৃতির আন্দোলনকে তিনি সব সময় দেখেছেন একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আন্দোলন হিসেবে। তাই ৭ মার্চ ১৯৭১-এ তিনি একই সঙ্গে ডাক দেন স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের জন্য। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আন্দোলনের রাজনীতি করেছেন ও দল গঠন করেছেন, মুক্তির কথা বলেছেন।

 

বঙ্গবন্ধু লাখ লাখ জনতাকে সংঘবদ্ধ করতেন আন্দোলনে, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যাতে গণতান্ত্রিক পন্থার মধ্য দিয়ে জনমত সৃষ্টি করে অধিকার আদায় করা যায় এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা যায়। কারাগারের রোজনামচা’য় বিভিন্ন জায়গায় তিনি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী রাজনীতি না করতে পারলে যে দেশ সন্ত্রাসী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হতে পারে, তার আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সরকার যখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের নির্বিচারে জেল–জুলুমের সম্মুখীন করে এবং গণমাধ্যমে খবর প্রচারের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন। এমনকি জনগণের রাজনীতি অনেক সময়ই যাঁরা বড়মাপের নেতা হন, তাঁরা জনগণের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তাঁরা জনগণকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনার কথা বলেন। তাঁরা অনেক সময় থেকে যান জনগণের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু এর ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতেন। এবং তাই তিনি বারবার একদিকে তাঁর জনগণের জন্য ভালোবাসা এবং অন্যদিকে জনগণের তাঁর জন্য ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতেন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর যে ভালোবাসা এবং প্রতিদানে জনগণের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তার কথা তিনি নানা ভাষণে বারবার ব্যক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্র-এসব নানা রকমের আদর্শের কথা বলতেন।

 

তবে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ানো, জনসাধারণ কোন কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তার দিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল।জনসাধারণের ইস্যু নিয়েই তিনি কথা বলতেন, রাজনীতি করতেন। আমরা দেখতে পাই যখন তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলে কাজ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন দেশে খাদ্যের অভাব, তখন তিনি সুষম খাদ্যবণ্টনের আন্দোলন, ভুখা মানুষের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করেন। দাঙ্গাকবলিত মানুষকে উদ্ধারের জন্য কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছিল না, সাধারণ মানুষের সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লেখায় আমরা দেখতে পাই দেশে বন্যা কিংবা খাদ্যাভাব অথবা দ্রব্যমূল্য বা কর বৃদ্ধি হলে তাঁর কত দুশ্চিন্তা হতো। জনসাধারণের ওপর যেসব ইস্যু প্রভাব ফেলে, তার সবই তার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার মধ্যে ছিল। যারা সমাজে অনাদৃত ও বঞ্চিত, তাদের প্রতি তার বিশেষ সহমর্মিতা ছিল।’কারাগারের রোজনামচা’ বইটিতে তিনি বিভিন্ন কয়েদির জীবনবৃত্তান্ত, দুঃখ-কষ্ট বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে পাগল কয়েদিদের প্রতি তাঁর মমতাবোধ আমরা লক্ষ করি। জেলের কর্মচারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। তিনি জেলে নিজ হাতে রান্না করেছেন, বাগান করেছেন এবং তার সঙ্গে ডায়েরিও লিখেছেন। আওয়ামী লীগের অগণিত কর্মীর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখেরও তিনি খবর রাখতেন।

 

বঙ্গবন্ধুর দুটি বইয়েই আমরা তাঁর বহু সহকর্মীর এবং আওয়ামী লীগের নাম জানা-অজানা বহু কর্মীর ত্যাগ-তিতিক্ষার বর্ণনা পাই। বঙ্গবন্ধু একদিকে ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, মানুষের কাছ থেকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি জেনেছেন, শিখেছেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জনতার নেতা। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই তিনি সামনের দিকে, প্রগতির দিকে নিতে চেয়েছেন। সব বিষয়ে তিনি শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি জনগণকে আহ্বান করেন, বলেন ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য। জাগ্রত জনতার ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি সেদিন বলতে পেরেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে আরও লিখছেন: আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। সমাজতন্ত্র বলতে তিনি প্রাধানত শোষণমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতেন। ১৯৫২ সালে চীন যাবার পর চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে পার্থক্য তিনি দেখেছেন, তা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছে।

 

এই দু’টি দেশের পার্থক্য সম্বন্ধে তিনি লিখছেন: তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হল তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ ও এ দেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন। শোষণমুক্তি এবং বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের যে দায়িত্ব আছে, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু আজ নতুন নতুন শিল্পপতিদের ও ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও দুই পাক হয়। সাহেবদের জন্য আলাদা, চাকরদের জন্য আলাদা। আমাদের দেশে যখন একচেটিয়া সামন্তবাদ ছিল, তখন জমিদার, তালুকদারদের বাড়িতেও এই ব্যবস্থা ছিল না। আজ সামন্ততন্ত্রের কবরের উপর শিল্প ও বাণিজ্য সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠতে শুরু করেছে, তখনই এই রকম মানসিক পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। সামন্ততন্ত্রের শোষণের চেয়েও এই শোষণ ভয়াবহ।১৯স্বাধীনতার পর তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি কোনো বৈষম্য দেখতে চাননি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন বাংলাদেশে মানুষে মানুষে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতর আয় ও নিম্নতম উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এত দিন ধরে বিরাজ করছিল, সেটা দূর করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য তিনি খুব সহজ দুটি শব্দে প্রায়ই ব্যক্ত করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলা’, কিংবা তিনি বলতেন দুঃখী মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাতে চান। বঙ্গবন্ধু তাঁর জনসভায় খুবই সরল ভাষায় বক্তৃতা করতেন। তাই তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট।

 

যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে এক জনসভায় তিনি বলেন: আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক। আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক। তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অন্য তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তিনি ঠিকই জানতেন জীবনে একটি হাসি কত অমূল্য এবং সেই অমূল্য সম্পদই অর্জন করাটা ছিল তাঁর লক্ষ্য। পরিশেষে বলতে চাই, তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি করতে হলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে এগিয়ে আসতে হবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির জনকের আদর্শ, দর্শন ও নীতি সমাজতান্ত্রিক  সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৭২ সালের সংবিধানের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য বঙ্গবন্ধুর মতো বজ্রকণ্ঠে আহ্বান জানানো হোক দেশবাসীর প্রতি। সমাজ তান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার মধ্যেই রয়েছে জাতীয় শোক দিবস পালনের স্বার্থকতা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।অপর দিকে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পরিণত হবে সকল অপরাজনীতি দূরীভূত করে শোষণমুক্তির এক মহাশক্তিতে বলীয়ান হওয়া।

 

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট