বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক

রায়হান আহমেদ তপাদার : আমাদের প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে আবির্ভূত হতে দেখেছে এবং তার পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে অসামান্য অবদান তা প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল্যায়ন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগের কথা। সমগ্র জনসাধারণকে অভূতপূর্বভাবে ঐক্যবদ্ধ করা হয় বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত

হওয়া। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মূল নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময়ের আমাদের অনুভূতি যাঁরা তখন উপস্থিত ছিলেন না, যাঁরা চোখে দেখেননি এবং সেই অনুভূতি যাঁদের হৃদয়ে তখন স্পর্শ করেনি, তাঁদের ঠিক ভাষায় বলে বোঝানো কষ্টকর। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক সময়ে অনেক নেতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। দেশ পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক নেতাই ইতিহাস রচনা করতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন অনন্য কালজয়ী ইতিহাসের মহানায়ক। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু জানতে হলে, বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং কর্মকাণ্ডের উৎস খুঁজতে হলে প্রচুর গবেষণা করতে হবে নতুন প্রজন্মকে। বিশেষ করে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র জনগণের আন্দোলনকে দমন করার জন্য কত রকমের নিপীড়ন চালাতে পারে, তার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কত প্রয়োজনীয়, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বইটির বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখা দরকার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগ অংশই কেটেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুবই অল্প সময়ের জন্য-সাড়ে তিন বছর-তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি ব্যয় করেছেন ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং তারপর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বহুদিন সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের জন্য। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতার মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বলতেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না এলে ভৌগোলিক স্বাধীনতা নিরর্থক হয়ে পড়ে। আর্থসামাজিক মুক্তির মাধ্যমে তিনি বাংলার মানুষকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সুফল দিতে চেয়েছিলেন। কিছু সুবিধাভোগী মানুষের মাঝে সম্পদ ও স্বাধীনতার সুফলকে কুক্ষিগত না রেখে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক মুক্তির জন্য সম্পদের সুষম বণ্টন ও সম্পদ সৃষ্টি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষায় বিনিয়োগ, কৃষি ও শিক্ষার সংস্কার ও গণমুখী বাধ্যতামূলক সমবায় প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। যার মূল ভিত্তি ছিল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে মাটি ও মানুষের সমন্বিত অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। তাইতো বলি,স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষ। পাশাপাশি ২০২১ সালে জাতি উদযাপন করতে যাচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।

 

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বিষয়টি কাকতালীয়ভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কেননা, বঙ্গবন্ধুর জীবন-যৌবন ও রক্তের ঋণের সঙ্গে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম ও প্রিয় মাতৃভূমির অস্তিত্ব বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে। একটি বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করার দুঃসাধ্য আমাদের নেই। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একটি অন্যটির পরিপূরকই নয়, বলতে হবে সমান্তরাল প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু বাংলা, বাঙালির মর্যাদার সংগ্রামে বাংলার পথে-প্রান্তরে তার যে জীবন-যৌবন উৎসর্গিত হয়েছিল, শোষিত-বঞ্চিত অধিকারহারা মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সেটি ছড়িয়ে রয়েছে বাংলার প্রতিটি পরতে পরতে। বাংলার প্রান্তরজুড়ে স্নিগ্ধ ধানখেত কিংবা কাশফুলের মাঠে বয়ে যাওয়া বাতাসের দোলাচল, নদীর কলতানি, সাগরের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে যে সুর বেজে উঠে, সেটাই বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের প্রতিধ্বনি। তাঁর

অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির বাংলাদেশের এগিয়ে চলার যে অদম্য কর্মযজ্ঞ, এ যেন বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় পায়ে বাংলার পথে-প্রান্তরে ছুটে বেড়ানোর ব্যস্ততা। মহাকাশ কিংবা সমুদ্র জয় সবই যেন বঙ্গবন্ধুর বিপ্লবী জয়ের প্রতিচিত্র এ মহামানব সম্পর্কে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখি নাই, শেখ মুজিবকে দেখেছি। কী ছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বে! যা পরাধীন সাত কোটি মানুষকে ক্ষণিকে উত্তাল করে তুলত। বিশ্ব নেতৃত্বকে আকৃষ্ট করত! প্রকৃতি তার সুরে সুর তুলে বাংলার আকাশ-বাতাসকে কাঁপিয়ে তুলত! সেটি বর্তমান বা অনাগত প্রজন্মকে অবশ্যই জানতে হবে।

 

বঙ্গবন্ধুকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে জাগিয়ে রাখতে হলে শুধু কথার ব্যঞ্জনায় বঙ্গবন্ধু প্রেমিক হলে চলবে না, তার চিন্তা-চেতনা, ত্যাগ, মানুষের প্রতি মমত্ব-দায়বোধ, দেশপ্রেম অবশ্যই আমাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও কর্মের মাঝে ধারণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীন মাতৃভূমি ও আত্মপরিচয়ের ঠিকানা আমাদের জন্য রেখে গেছেন, সেটিকে তার কল্পিত চিত্রে অঙ্কিত করতে হলে আমাদেরও তার ত্যাগের মনোবৃত্তি ধারণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা হবে আমাদের সেই চর্চার প্রধান উপাদেয় বঙ্গবন্ধু সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন, ভাবতেন। এই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র গঠনে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয় বিভক্তি, স্বার্থান্ধতাকে প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতেন। তিনি অপকটে বলেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। ভুলে যেয়ো না। স্বাধীনতা পেয়েছো এক রকম শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে। তখন আমরা জানতাম আমাদের এক নম্বর শত্রু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও শোষকগোষ্ঠী। কিন্তু এখন শত্রুকে চেনাই কষ্টকর। যদি আমরা বিভক্ত হয়ে যাই এবং স্বার্থে দ্বন্দ্ব ও মতাদর্শের অনৈক্যের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে আত্মঘাতী সংঘাতে মেতে উঠি, তাহলে যারা এ দেশের মানুষের ভালো চান না ও এখানকার সম্পদের ওপর ভাগ বসাতে চান, তাদেরই সুবিধা হবে এবং বাংলাদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, ভাগ্যাহত ও দুঃখী মানুষের মুক্তির দিনটি পিছিয়ে যাবে। তার এ উপদেশ আমাদের ধারণ করতে হবে, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য।

 

তাই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধু দিকদর্শনকে মনেপ্রাণে ধারণ করে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজটা করা হবে মুজিব শতবর্ষে তার প্রতি সুবিচার আর শেখ হাসিনার উন্নয়নের এ গতি ধরে রেখে আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর জন্মভূমি নির্মাণে আমাদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-দর্শনের কাছে প্রতিনিয়ত পৌঁছাতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে এনে দেশকে গড়া যাবে না। দেশের মধ্যেই পয়সা করতে হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনাও একই নীতি ধারণ করে এগিয়ে চলছেন অনেক সময়ই যাঁরা বড়মাপের নেতা হন, তাঁরা জনগণের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তাঁরা জনগণকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনার কথা বলেন। তাঁরা অনেক সময় থেকে যান জনগণের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু এর ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতেন। এবং তাই তিনি বারবার একদিকে তাঁর জনগণের জন্য ভালোবাসা এবং অন্যদিকে জনগণের তাঁর জন্য ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতেন। তবে তাত্ত্বিক না হলেও বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ছিল, মূল্যবোধ ছিল, লক্ষ্য ছিল এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি একনিষ্ঠভাবে এবং নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আমরা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারি। মাত্র তিনটি বাক্যেই বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর একটি উদ্ধৃতি রয়েছে, যা তিনি ১৯৭৩ সালের মে মাসের ৩ তারিখে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন: একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি।

 

একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। এই উদ্ধৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু নিজেকে একাধারে মানুষ এবং তার সঙ্গে বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয় স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁর কর্মপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করছেন বাঙালি এবং মানবসম্প্রদায়ের জন্য তাঁর ভালোবাসা। এই আত্মপরিচয় থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল-বাঙালি জাতিসত্তা, জনসম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সমাজতন্ত্র। আর তাইতো আজ বঙ্গবন্ধু না থেকেও সবার মাঝে চিরঞ্জীব হয়ে আছেন। এমনকি বিশ্বজুড়ে একজন মহান নেতা হিসেবে অমর হয়ে আছেন।আর এখন বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি তার কন্যা শেখ হাসিনা পিতার আদর্শ ধারণ করে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তার দৃঢ় নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ মর্যাদার আসনে আসীন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাক এটাই জাতীর প্রত্যাশা।

 

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট