ফেনী নদী আমার নাড়ীর বাঁধন,আমার গর্বের ধনছঃএ্যাড,আশ্রাফুল আলম চৌধুরী হায়দার।

“এই নদীতে গোসল কইরা বড় হইছি আমি,

এখন সুনি হারিয়ে যাবে ফেনী নদীর পানি।”

৭১’এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক নং সেক্টর এর অত্র অঞ্চলের মুক্তিকামী ফৌজের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী ত্যাগের নিরবসাক্ষী শুভপুর ব্রীজ ও ফেনী নদী। সাঙ্গু, হালদা, মুহুরী, কর্ণফুলী, মাতামুহুরী, নাফ, মহেশখালী, বাকখালী, রাখিয়াং, কাসালং, মাইনি, চেংগী এর ন্যায় ফেনী নদীও এক নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা নদী।

আজ ভারতের কুটনৈতিক ফাঁদে পা দিয়ে এক কালো চুক্তির কবলে আমার স্বাধীনতা যুদ্ধের সৃতি বিজড়িত এই ঐতিহাসিক যোদ্ধাফেনী নদী মরুভূমির দিকে ধাবিত হতে যাচ্ছে।

এই ফেনী নদীর ধারে সুজলা সুফলা, শস্য শ্যমলা আমার গ্রাম জগন্নাথ সোনাপুর। এক সময়ের খরশ্রোতা এই নদীর সাথে মিসেআছে আমার শৈশব কৈশোরের নানা সৃতি। শৈশব কৈশোরে স্কুল পালিয়ে এই নদীর বুকে দাবিয়ে বেড়িয়েছি নৌকায়। এই নদীরচরে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা সহ খেলেছি অনেক খেলা। ভর পানিতে ধরেছি মেলে ভেসেউঠা নানা প্রজাতির মাছএই নদীতে। শৈশবের বন্ধু সোহাগ, পিন্টু, সোহেল, টিটু, সেকু, লিটন, গুল বাহারদের নিয়ে কত লাফালাফি, ঝাপাঝাপি। কৈশোরেনৌকায়, পাহাড়ি ডলে নদীর ধারে আটকাপড়া গাছটিতে বসে বন্ধু সেকুর বাঁশির সূর,

“আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে

অকুল দরিয়ার বুঝি কুল নাইরা….………” সহ আরো কত সূর আজো একাকিত্বে ভেসে আসে কানে। আমার বাল্য সৃতি বিজড়িতএই নদী পরবর্তি প্রজন্ম দেখতে পাবে কিছু ধুলির মাঠ।

ফেনী নদী কোন আন্তঃসীমান্ত নদী নয়। ভারত-বাংলাদেশের নিষ্পত্তিকৃত আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা অনুযায়ী ফেনী নদীর যতটুকুপানি হবে ততটুকুর মালিক বাংলাদেশ।

ভারত সর্ব প্রথম ১৯৩৪ সালে ফেনী নদীর পানি নেয়ার দাবি ওঠায়। তবে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ সাল পযর্ন্ত তারা নানা কলাকৌশলে “নো ম্যানস ল্যান্ড” ও “ট্রান্সবাউন্ডারির” অজুহাতে ফেনী নদীকে আর্ন্তজাতিক নদী প্রবাহের অংশ দেখানোর অপচেষ্টাকরে। ভারত ১৯৬১ সালের দিকে এসে প্রথম আসালং ও তাইন্দং মৌজার প্রায় ১৭’শ একরের বিশাল জায়গা জবর দখল করেনেয়। ১৯৬২ সালে সীমান্ত রেখা ও ফেনী নদীর উৎসকে কেন্দ্র করে আসালং-তাইন্দং এ ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।  ৬২’র ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর ১১ উইংয়ের ক্যাপ্টেন সি আর দত্তের নেতৃত্বে বিএসএফের সঙ্গে একরক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে ভূমিটি পুনরুদ্ধার করা হয়। এবং এই যুদ্ধ ১৭ দিন স্থাই হয়। এ যুদ্ধে ইপিআরের এক হাবিলদার ও তিনসিপাহি শহীদ হন। আজো এখনো সেই যুদ্ধের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে ইপিআর হাবিলদার গোলাম রসুল, সিপাহি আবদুলখালেক, আবদুল জলিল ও মোহাব্বত খানের কবর এবং স্মৃতিসৌধ।

আসালং যুদ্ধের মধ্যদিয়ে ব্যর্থ হয়ে যায় ঐ সময়ে ভারতের সব ধরনের অপকৌশল ও কূটনৈতিক অপচেষ্টা। অনেক অপচেষ্টায়ওজবরদখলে রাখতে পারে নি বাংলাদেশের এই জমিটি। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সীমা রেখা মেনেই ৭১ এর স্বাধীনবাংলাদেশের জন্ম হয়। আর তারই ধারাবাহিকতায় মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে ফেনী নদীর উৎস আসালং-তাইন্দং ছড়াটি সীমান্তরেখার ভেতরে বাংলাদেশ অংশে ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্বত শ্রেণিতে ২৩.২০’ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯১.৪৭’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে উৎপত্তি হয়ে ফেনী নদী রামগড় পযর্ন্ত দক্ষিণপশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে পাহাড়ি নিবাস শেষে বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনী জেলা থেকে চট্টগ্রামকে বিভক্ত করে সমভূমি ধরেএগিয়ে ২২.৫০’ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯১.২৭’ পূর্ব দ্রাঘিমাতে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। উৎসমূল থেকে বঙ্গোপসাগর পযর্ন্ত নদীটির দৈর্ঘ্য১১৫.৮৫ কি.মি। বঙ্গোপসাগর থেকে রামগড় পযর্ন্ত ৮০.৪৫ কি.মি ছাড়া বাকী অংশে শুধুমাত্র ছোট নৌকা চলাচলের উপযোগী।

ফনী বা ফেনী রাজার নামানুসারে ফেনীর নাম করা হয় বলে অনেকে মনে করেন। আর মৌর্য বংশের শাসনামলে একদিনঅবস্থানকারী চীনা পর্যটক, ফাহিয়েনের নামানুসারে কালক্রমে ফাহিয়েনী থেকে ফেনী নামকরণ হয় বলেও কারো কারো বিশ্বাস।তবে, স্থানীয় গবেষকদের মতে, মূলত ছাগরনাইয়ার কিছু অংশ, সোনাগাজী এবং ফেনী সদর পুরোটাই ছিল বঙ্গোপসাগরেরউপকুলীয় চর। তখন সাগরের ফেনা আচ্ছাদিত করে রাখতো এই উপকুলীয় চরকে। কালের বিবর্তনে সাগর উপকূলে গড়ে ওঠেজনবসতি। আর তারই ধারাবাহিকতায় ফেনীর নামকরণ হয়। সেই সাথে ভৌগলিক অবস্থানে এ অঞ্চলের বুক চিরে প্রবাহিতনদীর নামও হয়েছে ফেনীর নামনুসারে। স্থানীয়দের কাছে ‘ফেনী নদী’ বড় ফেনী নদী নামে পরিচিত। কারণ ফেনীর দাগনভুঁইয়ারউপর দিয়ে প্রবাহিত ‘ডাকাতিয়া খাল’ ছোট ফেনী নদী হিসেবে পরিচিত এখানকার মানুষের কাছে।

প্রায় ১১৫.৮৫ কিলোমিটার লম্বা ফেনী নদী ফেনীর ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী, খাগড়াছড়ি ও উত্তর চট্টগ্রামের  মীরশ্বরাই এই তিনজেলার অর্ধ কোটি মানুষের জীবিকার সাথে কোননা কোন ভাবে মিশে আছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প “মুহুরী সেচ প্রকল্পবা ফেনী রেগুলেটর” পুরোপুরিভাবে ফেনী নদীর প্রবাহিত পানির উপর নির্ভরশীল। যেখানে এক সময় অতি বন্যায় ও খরারকারনে কোন কৃষক কোন ফসলই ঘরে তুলতে পারতোনা সেখানে আজ এই “মুহুরী সেচ প্রকল্প” এর ফলে ফেনী ও নোয়াখালীজেলার ২০,১৯৪ (প্রায়) হেক্টর এলাকায় সেচ সুবিধা এবং ২৭, ১২৫ (প্রায়) হেক্টর এলাকা সম্পুরক সেচ সুবিধার আওতায় আসে।এবং এই প্রকল্পের ফলে এই বিসাল জনপদের জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ হচ্ছে। উজান থেকে ভেসে আসা ফেনী নদীর উৎকৃষ্ট মানেরবালি, যা থেকে সরকার পাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

কতিথ কালো চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে পানি উত্তোলন করতে দেয়ার মানে আমার স্বাধীনতার সৃতি ধুলায় মিশিয়ে দেয়া, ভারতকেপানি উত্তোলন করতে দেয়ার মানে মুহুরী সেচ প্রকল্প ধ্বংস করে দেয়া। ভারতকে পানি উত্তোলন করতে দেয়ার মানে অর্ধ কোটিমানুষের জীবিকার সাথে প্রতারণা করা, ভারতকে পানি উত্তোলন করতে দেয়ার মানে আমার মত কোটি সন্তানের ফেনী নদীরসাথে নাড়ির বন্ধন ছিন্ন করা। এই চুক্তির ফলে নোয়াখালীর পূর্বাঞ্চল, চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চল ও সম্পূর্ন ফেনী জেলা মরুভূমিতেরুপান্তর হবে। পঞ্চাশ লক্ষের অধিক কৃষক কৃষাণী হারাবে তাদের চাষাবাদের সুযোগ। হাজার হাজার বালি উত্তোলনের  শ্রমিকহবে বেকার। সরকার হারাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। লক্ষাদিক জেলে হারাবে তাদের জীবীকা নির্বাহের একমাত্র পথ। এইআঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। ধংষ হবে জীব বৈচিত্র। হানিয়ে যাবে এই অঞ্চলের বহু প্রজাতির কীটপতঙ্গ।

ভারত অবৈধভাবে বিনা অনুমতিতে সীমান্তে লুকানো পাম্পিং স্টেশন বসিয়ে ফেনী নদীর পানি উত্তোলন করছে গত এক দশকধরে। ভারতীয় গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারতকে ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের সুযোগদিচ্ছে অর্থাৎ ত্রিপুরার সাবরুমে ফেনী নদী থেকে ভারতকে ১.৮২ কিউসেক পানি নেয়ার সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ।

প্রতি সেকেন্ডে যদি ১.৮২ কিউসেক বা ৫১.৫৩৭ লিটার পানি প্রত্যাহার করা হয় তাহলে ১ (এক) মিনিটে ৩,০৯২ লিটার, ১ (এক) ঘন্টায় ১,৮৫,৫৩২ লিটার,