নতুন প্রজন্ম বনাম নতুন প্রযুক্তি

রায়হান আহমেদ তপাদার:

পৃথিবীর আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে আমাদের সামনে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের শেষ পর্যন্ত কোন দিগন্তে নিয়ে যাবে সেটা ধারণার অতীত বর্তমানের যুগকে বলা হয় তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। এ প্রযুক্তির যুগে আমাদের জীবন যাত্রাকে সহজ ও প্রাণবন্ত করেছে! এই প্রযুক্তি আমাদেরকে সব কিছু হাতের মুঠে এনে দিয়েছে। বর্তমানে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার আমাদের সমাজ জীবনে উন্নতি সাধন করেছে এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। আধুনিক জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে প্রযুক্তি প্রভাব ফেলছে, ফলে পাল্টে যাচ্ছে কার্যপদ্ধতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমনকি রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়া। আধুনিক প্রযুক্তির মোবাইল-ফোন, কম্পিউটারের মাধ্যমে সারা বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, ইন্টারনেট অব থিংস, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবটিক্স, জেনেটিক্স, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের সূচনা বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যাপক ব্যবহার ডেকে এনেছে অভিশাপ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায় ১১ বছর বয়সী শিশুদের প্রতি ১০০ জনে ৭০জন পর্যন্ত নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ফোনের ব্যালেন্স যত বেড়েছে ততই বেড়েছে মানুষের দূরত্ব। মানুষ দিন দিন একা হয়ে গিয়েছে, নিজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। এর গবেষণায় ফুটে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের চিত্র। গবেষণায় বলা হয় ভারত ও পাশের দেশগুলোতে মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা সবচে বেশি। চীনের মতো প্রযুক্তিবান্ধব দেশে শিশুরা দৈনিক ২ ঘন্টা মোবাইল ব্যবহার করে। যেখানে ভারতের পাশের দেশগুলোতে শিশুরা গড়ে ৫-৬ ঘন্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে শিশুরা কেন প্রযুক্তির এত ভক্ত হয়ে ওঠেছে? অল্প বয়সী শিশুদের হাতে প্রযুক্তিপণ্য তুলে দিয়ে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি নিজেদের সাময়িক লাভের জন্য।

 

শিশুদের কোমল মাটির মতো মন। শিশুর চিন্তার জগতে প্রভাব ফেলে দারুণভাবে। একেক শিশুর রয়েছে একেক ধরনের চিন্তাশক্তি।বিগত কয়েকবছর যাবত দেখা যায় অধিকাংশ পরিবারের যেসব শিশু খাবার খেতে চায় না তাদেরকে মোবাইল, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের মাধ্যমে গান, কার্টুন দেখিয়ে খাবার পর্বটা শেষ করেন। শৈশবের সময় যে অভ্যাসটি করা হয় সেটি আরো স্থায়ীরূপ লাভ করে যখন শিশুরা বড় হয়। অভিভাবকগণ দারুণ খুশি হন যে সন্তানেরা খাবার খাচ্ছে, একটু আধটু মোবাইল ব্যবহার করলে তেমন ক্ষতি হচ্ছে না বরং শিশুরা খাবার খেতে আর কোন জ্বালা যন্ত্রনা করছেনা। এভাবেই কোমলমতি শিশুর হাতে ওঠে নামিদামি স্মার্টফোনসহ নানা ধরনের স্মার্ট গ্যাজেট। শিশুদের মোবাইল প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারে অভিভাবকদের আনন্দের শেষসীমা যেন নেই; সেই আনন্দের সাথে যোগ দিয়েছে তাদের অর্থ বৈভব আভিজাত্য। তারা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলেন যে এত অল্প বয়স হতে সব শিখে নিয়েছে অথচ তারা এখনও অনেক কিছুই জানেন না এই হলো প্রযুক্তি দাসের নেপথ্য কথা। আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই। পৃথিবীর আলোয় প্রতিটি শিশুই আসে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায়। সুন্দর জীবন গঠনের পথ সৃষ্টি করার মাধ্যমেই সাজানো যাবে কোমলমতি শিশুর জীবন। শিশুরা বেড়ে ওঠে পরিবেশ-পরিবারে। শৈশব হতেই দেখা যায় অধিকাংশ শিশু প্রযুক্তিপণ্যের প্রতি আসক্ত। ভাত খাওয়াতে মান ভাঙাতে কিংবা যখন বাবা মা ব্যস্ত থাকেন শিশুদেরকে বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের সুযোগ দেন। মা-বাবার কর্মব্যস্ততা কিংবা শিশুর মান অভিমানের সমাধান হিসেবে প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের সুযোগ পায় শিশুরা। এএকসময় দেখা যায় এরাই সময়স্রোতে হয়ে ওঠে প্রযুক্তির ক্রীতদাস। বর্তমান সময় তথ্যপ্রযুক্তি আর গ্লোবাল ভিলেজের যুগ। জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিপণ্য। প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের কল্যাণে প্রজন্মের নিত্য জীবনযাপন হয়ে ওঠেছে সহজ কিন্তু দেখা যায় প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে সমাজ জীবনে।

 

শিশুরা প্রযুক্তিপণ্যে সবচেয়ে বেশি আসক্ত। এর পিছনে নানাবিধ কারণে জড়িয়ে আছে। কেঁচো খুঁড়তে গেলে যেমন সাপ বের হয়ে আসে তেমন করে বর্তমান সময়ে শিশুরা কেন প্রযুক্তির ক্রীতদাস হয়ে ওঠেছে তার অনেকগুলো কারণ বের করা যাবে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খেলাধুলা করার মাঠ ও পর্যাপ্ত সময়-সুযোগ না থাকা, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের সময় না দেয়া কেননা দুজনেই ব্যস্ত কর্মক্ষেত্রে কিংবা ব্যবসায়িক কাজকর্মে শিশুরা প্রযুক্তি আসক্তির কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করতে পারছেনা। শিশুদের কাজ হচ্ছে খেলাধুলা করা আর আনন্দের সাথে পড়াশোনা করা। খেলাধুলা, আনন্দময় পড়ালেখার সুবর্ণ সুযোগে শিশুদের ইতিবাচক বিকাশ ঘটে, সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ হবে, শিশুর কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সমাজে মানুষের সাথে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করবে। বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা যেন শিশুদের প্রযুক্তিপণ্যের ক্রীতদাস না বানায়। মা-বাবা কিংবা কাছের আত্মীয় স্বজনরাই শিশুদের হাতে তুলে দেন প্রযুক্তিপণ্য।অভিভাবকদের সময় নেই সন্তানদের সঙ্গ দেয়ার। বিশ্বের নামি-দামি সব ব্যক্তিদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার স্টিভ জবস একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন আমার সন্তানেরা আইপ্যাড ব্যবহার করেনি। কতটুকু প্রযুক্তি তারা ব্যবহার করবে সেই মাত্রা আমি ঠিক করে দিয়েছি।কম্পিউটার জগতে একচ্ছত্র অধিপতি মাইক্রোসফট। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সন্তানদের বয়স ১৪ হওয়ার আগে মোবাইল কিনে দেননি, নিয়ম করে দিয়েছিলেন ৪৫ মিনিটের বেশি কম্পিউটার ব্যবহার করা যাবে না এবং খাবার টেবিলে মোবাইল ফোন আনা নিষেধ। আমাদের দেশের কথা ভেবে দেখুন সবার হাতেই মোবাইল, ট্যাবসহ নানা প্রযুক্তিপণ্য। বিছানা থেকে শুরু করে খাবার টেবিলও বাদ যায়না। প্রযুক্তিপণ্যের দাস হয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলেছে মানসিক সুস্থতা। অভিভাবক মহলে প্রযুক্তিপ্রীতির আকর্ষণ।

 

ইউনিসেফ রিপোর্ট জানুয়ারি, ২০১৬ তে বলা হয় ভার্চুয়াল ভাইরাসের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। বর্তমান বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে একজন শিশু। ২০১৬ সাল পেরিয়ে এখন চলছে ২০২১ আপনারাই বুঝে নিন বর্তমানে কতজন শিশু প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করছে। পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের গবেষণা অনুযায়ী যেসব শিশু কম্পিউটার, টিভি ভিডিও শো নিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকে তারা একসময় হয়ে পড়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ শিশু প্রযুক্তিপণ্য ছাড়া কিছুই বুঝেনা। একদিকে বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা অন্যদিকে নেই খেলার মুক্ত মাঠ। নগরাযয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ভূমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে, শিশুদের খেলাধুলার জায়গা বলতে গেলে এখন কমই আছে। যার কারণে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিতে আসক্তি। প্রযুক্তির আসক্তিতে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা শক্তির বিকাশ ক্ষমতার মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। শিশুরা হারিয়ে ফেলেছে সুন্দর জীবন, শিশু সূলভ সরলতা। জীবনজুড়ে ভর করেছে প্রযুক্তির দাসত্ববৃত্তি। প্রযুক্তির কল্যাণ-অকল্যাণ দুটোই আছে, দুটোর মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। অল্প সময়ে অল্প খরচে দেশে বিদেশে কথা বলা যাচ্ছে, প্রিয়জনের মুখ দেখা যাচ্ছে এগুলো সহ আরো কতকিছু সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তির কল্যাণে। বিপরীত দৃশ্যপটে অকল্যাণ তখনই হয় যখন কোন কিছু তার নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করে। করোনাকালে প্রযুক্তির ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। প্রযুক্তিদাস নয় বরং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করে দেশের উন্নয়ন ভবিষ্যত সেনানায়ক হয়ে বেড়ে ওঠুক প্রজন্মের কান্ডারীরা এই প্রত্যাশাই করি সামাজিক অবক্ষয় কথাটি এখন বহুল আলোচিত একটি বাক্য। যা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতার উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির অবদান অপূরণীয়। কিন্তু আমরা কি কখনো অনুধাবন করে দেখেছি যে প্রযুক্তির অকল্যাণকর দিকগুলো আমাদের অবস্থান কোথায় নামিয়ে দিচ্ছে?

 

অবশ্য এর জন্য আবিষ্কার ও আবিষ্কারক কোনোটিই অপরাধী নয়, অপরাধী হচ্ছি আমরা ব্যবহারকারীরা।পৃথিবীর আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে আমাদের সামনে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের শেষ পর্যন্ত কোন দিগন্তে নিয়ে যাবে সেটা ধারণার অতীত। এক পা দু পা করে আমরা সভ্যতার একেকটি স্তর পার হয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আবার আমাদের কাছ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধে কেড়ে নিয়েছে। এ কথা আমি বলতে চাই না যে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয়। বর্তমানে পৃথিবীর ৪২.২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। কিন্তু মূল্যবোধ বিবর্জিত মানুষেরা প্রযুক্তিকে তাদের ভোগ ও আয়েশের ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছে। তথ্য বিকৃতি, ব্যক্তিগতভাবে সমাজের কোনো মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা, প্রতিকৃতির ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয় সামাজিক মাধ্যম গুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া একটি নিত্যনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো সামাজিক অবক্ষয়ের কারন কি এবং সমাজে এমন নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটছে কেন? বর্তমান সময়ে মানুষের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় যে হারে ঘটে চলেছে,তা একটি জাতির জন্য খুবই উদ্বেগজনক। তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রিক অপরাধের বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী রা বলেন আইনের প্রয়োগের চেয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো বেশি জরুরি। পরিবারের অসচেতনতাও যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি সংগঠন গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে হবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সুষ্ঠু বিনোদনের অভাব থেকেই মূলত ধ্বংসের পথে পা বাড়াচ্ছে। প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় লাইব্রেরি ও খেলাধুলার ক্লাব স্থাপন করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করতে সরকারেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

 

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট