দৌড়ের গল্প

সবাই যাকে এত দিন ‘মেহজাবীন’ জেনে এসেছি, তিনি আসলে ‘মেহজাবীন’ নন। অন্তত তাঁর বাবা-মা-বোনদের কাছে তো নয়ই। ফারসি শব্দ ‘মেহজাবীন’-এর ‘ন’ উচ্চারণে উহ্য থাকে বলে বাড়িতে তিনি ‘মেহজাবী’। নামের বানান ইংরেজিতে অনেকেই ভুল করত বলে তিন বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে সবাইকে সংশোধন করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। নামের উচ্চারণ সঠিকভাবে করার অনুরোধ কেন জানাচ্ছেন না? “কারণ এখন আমি মেহজাবীনেই অভ্যস্ত। কেউ ‘মেহজাবী’ সম্বোধন করলে খুশি হই, তবে সুন্দর উচ্চারণে ‘মেহজাবীন’ বললেও ভালো লাগে। তা ছাড়া নামে কিই বা আসে-যায়! কাজটাই আসল।”

সত্যিই তাই। ভালো কাজ দিয়ে নিয়মিতই আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন মেহজাবীন। সদ্যঃপ্রচারিত নাটক ‘ইরিনা’য় নাম ভূমিকায় অভিনয় করে আরো একবার ভক্ত-সমালোচকদের হাততালি কুড়িয়েছেন। যদিও এই নাটকের সাফল্য নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না খোদ মেহজাবীন। তাঁর যুক্তি, ‘অনেকেই বলেন ভিন্ন কিছু দেখতে চান। কিন্তু যখনই আমরা একটু আলাদা কিছু চেষ্টা করি, তখন দর্শক দেখেন না। অভিযোগ করলে বলেন, কিছুই বুঝিনি। বাস্তবের সঙ্গে মিল নেই। সত্যি বলতে ইরিনা চরিত্রের যেহেতু কোনো সমাপ্তি নেই, আমার নিজের ভেতরও নানা ধরনের প্রশ্ন খেলা করেছিল। ইরিনা আসলে কে? মানুষ? নাকি বিবেক? মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা একজনের কল্পনা? নাকি ভিনগ্রহের কেউ? দর্শকরা যে যাঁর মতো ভেবে নিয়েছেন। তবে এই বিমূর্ত চরিত্রে অভিনয় করতে সহজ হয়েছে পরিচালক ভিকি জাহেদ ও সহশিল্পী আফরান নিশোর সহযোগিতার কারণে।’

এ প্রসঙ্গে মেহজাবীন যোগ করেন আরো কিছু অনুভূতির কথা, ‘অনেকেই জানবেন না, চটুল কাজের বাইরে ব্যতিক্রমী পাণ্ডুলিপি পাস করাতে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। শুধু অভিনয়শিল্পীই নয়, অনেক পরিচালকও নতুন কিছু করার জন্য প্রায়ই লগ্নিকারক পান না।’

যদিও মেহজাবীনের কণ্ঠে আশার আলো, ‘কয়েক বছর আগেও কেউ যখন শুনতেন, একটি ছেলে বা একটি মেয়ে অভিনয় করেন, পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হতো, আর কী করো? এখন সবাই বুঝতে পেরেছে, চাইলে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিয়ে মাসের ৩০ দিন ব্যস্ত থাকা সম্ভব। এ জায়গাটি তৈরির জন্য আমাদের অনেককেই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে ভেবেছিলাম, মন চাইলে কাজ করব, মন না চাইলে করব না। তবে ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, ৯-৫টা চাকরির চেয়েও এই পেশায় শ্রম দিতে হয় বেশি। অফিস হুট করে মিস করলে হয়তো বসের কথা শুনতে হতো বা মাইনে কাটা পড়ত। কিন্তু আমরা অভিনয়শিল্পীরা কমিটমেন্ট মিস করলে ৭০-৮০ জনের ক্ষতি হয়ে যায়। দিনপিছু আয় করা অনেকের জীবিকা নির্ভর করে অভিনয়শিল্পীদের ওপর। আমরা তো চাইলেই বিশ্রামের বিলাসিতা ভোগ করতে পারি না।’

নিকট অতীতে মেহজাবীন অভিনীত রেকর্ডসংখ্যক নাটক কোটি ভিউর মাইলফলক স্পর্শ করেছে। “আমার জানা মতে ১৩টি নাটক কোটির ক্লাবে ঢুকেছে। এর মধ্যে ‘বড় ছেলে’ রয়েছে তিন কোটির দ্বারপ্রান্তে”, বললেন মেহজাবীন।

একদিকে ‘টম অ্যান্ড জেরি’, ‘সানগ্লাস’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চাপাবাজ’ ধারার চটুল নাটক করছেন, অন্যদিকে ‘২৩শে শ্রাবণ’, ‘জন্মদাগ’, ‘ইরিনা’র মতো ভিন্ন ধারার নাটক করছেন। নিশ্চয়ই এর পেছনে রয়েছে শক্ত অঙ্ক? ‘শক্ত নয়, খুব সহজ অঙ্ক’, এককথায় বললেন মেহজাবীন। কী সেটা? ‘আমি বুঝতে পেরেছি পৃথিবীতে সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা কঠিন। তবু সব শ্রেণির দর্শকের মন জুগিয়ে চলতে চাই। ভিন্ন ধারার কাজই বেশি করতে চাই, তবে রোমান্টিক, রম-কম, কমেডির দর্শকদেরও নিরাশ করব না’, বলেন মেহজাবীন।

অভিনয় ক্যারিয়ারের বয়স এক দশকেরও বেশি। বিগত দুই-তিন বছরেই বহুমুখী চরিত্রে তাঁকে দেখা গেছে বেশি। তবু তিনি মনে করেন, এখনো অনেক চরিত্র করা হয়নি, যেসব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি মুখিয়ে আছেন। যেমন আইন পেশার প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধা তাঁর। এ ধরনের কোনো শক্তিশালী চরিত্র অথবা পুলিশ অফিসার, বিজ্ঞানী, নভোচারী—এক জীবনে বহু যাপিত জীবন চেখে দেখার নেশা পেয়ে বসেছে মেহজাবীনকে।

এত প্রশংসা, জনপ্রিয়তা, পুরস্কারের পরও নিজেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী মানতে নারাজ। মেহজাবীনের মতে, “জয়া আহসান এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয়। তিনি যে অবস্থানে থেকে টেলিভিশন ছেড়েছেন, আমরা এখনো সেই অবস্থানে যেতে পারিনি। জয়া আহসানের পরই নুসরাত ইমরোজ তিশা। ঢাকার বাইরে শুটিংয়ে গেলে বুঝতে পারি, তাঁদের জনপ্রিয়তা কতখানি! আমার আরো সময় লাগবে। নিজেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী তখনই বলব, যখন আরো কিছু নতুন ঘরানার কাজ করার সুযোগ পাব এবং সেগুলোর ‘ভিউ’ রেকর্ড গড়বে।”

কিছুদিন আগে ফেসবুকে নিজের ঘরের একটি ছবি দিয়েছিলেন। ঘরের এক কোণে প্রায় ১৫টি মেডেল সজ্জিত। প্রায় সবকটিই স্কুলে পড়াকালীন দৌড় প্রতিযোগিতার পুরস্কার। দৌড়াতে এখনো ভালোবাসেন মেহজাবীন। তবে এই দৌড় অভিনয় ময়দানে, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। এক জীবনে বহু জীবন যাপন করার যে সুখ, প্রতি মুহূর্তে সেটিই হৃদয়ঙ্গম করতে চান। আর যে কাজে পূর্ণ মনোযোগ, আন্তরিকতা, সততা থাকে, সাফল্য সেখানে ধরা দেবেই—এটা মানেন মেহজাবীনও।