দক্ষ কর্মকর্তার অভাবে আশানুরূপ গতি পাচ্ছে না মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত

মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করা যাচ্ছে না। আর তদন্ত নিষ্পত্তি বিলম্বের কারণে অপরাধ না নিরপরাধ তা প্রমাণের আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনভাবে অনেকেরই ব্যবসা-বাণিজ্যবন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাছাড়া তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের (প্রকৃত দামের চেয়ে কম দেখানো) মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। মূলত দক্ষ কর্মকর্তার অভাবে মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত যেমন আশানুরূপ গতি পাচ্ছে না, পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করতেও বিলম্ব হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মানি লন্ডারিং মামলাগুলোর তদন্ত সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান মামলাগুলো যাতে হেরে না যায়, সেজন্য প্রমাণযোগ্য তথ্যসহ আদালতে চার্জশিট দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিগত ২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সহ ৫টি সংস্থা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায়। অন্য ৪টি সংস্থা হলো- পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তার আগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলা তদন্তের দায়িত্ব শুধুমাত্র দুদকের ছিল।
সূত্র জানায়, এনবিআর মানি লন্ডারিং মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর আলোচিত অনেক মামলা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আপন জুয়েলার্সের ৫টি শোরুম থেকে ১৫ মণ ১৩ কেজি স্বর্ণ, ৭ হাজার ৩৬৯ পিস ডায়মন্ডখচিত অলংকার, ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ১০০ মার্কিন ডলার জব্দের ঘটনা। ওসব ঘটনায় ৫টি মামলা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলাগুলো করে। তাছাড়া ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার এলসি (ঋণপত্র) খুলে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার অবৈধ পণ্য আমদানির অপরাধে মেসার্স হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এলসি ও অ্যাগেও্ বিডি অ্যান্ড জেপি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর ওই ঘঁনাটিকে জালিয়াতির মাধ্যমে সবচেয়ে বড় শুল্ক ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তাছাড়া ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচারের দায়ে ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ এবং রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরই ওই ৩টি মামলা করে।
সূত্র আরো জানায়, মানি লন্ডারিং অপরাধে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৯০টি মামলা করা হয়েছে। তারর মধ্যে ৫৭টি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তার বাইরে ৫টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আরো ৫টি মামলার চার্জশিট দাখিলের কার্যক্রম চলছে। তাছাড়া অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলা যৌথভাবে তদন্ত করছে সিআইডি, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আরো একটির তদন্ত কার্যক্রম যৌথভাবে চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, কাস্টমস গোয়েন্দা ও অধিদপ্তর। পাশাপাশি সিআইডি ও দুদকের হাতে ২১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
এদিকে ইতোমধ্যে মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩টি পৃথক মামলা করার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আর বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের ১৭টি ঘটনা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চলছে। নতুন করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কাছে আরো ৩টি পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে চলতি মাসের মধ্যে চার্জশিট দাখিলের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু হিসাব-নিকাশের গরমিল পেলেই এনবিআর মুদ্রা পাচার বা মানি লন্ডারিং মামলা ঠুকে দিচ্ছে। কিন্তু ওই মামলা পরে মানি লন্ডারিং হিসাবে প্রমাণ করা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে মানি লন্ডারিং মামলা করার সময় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর দেয়ার জন্য এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম জানান, মানি লন্ডারিং বিষয়ে অসংখ্য মামলা দীর্ঘদিন তদনন্তাধীন আছে। ওসব মামলার চার্জশিট দ্রুত দেয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া দক্ষতার অভাবে তদন্ত কর্মকর্তারা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সেজন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের এ বিষয়ে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।