*নগরজুড়ে মশার দাপটে নাজেহাল মানুষ-
*সিটি কর্পোরেশনের দাবি—’কাজ চলছে নিয়মিত’
ময়মনসিংহ নগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে না আসায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে চরম দুর্বিষহ। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে—যেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন ডেঙ্গু রোগী।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মাত্র ২৪টি শয্যা থাকলেও প্রতিদিন তার তিনগুণের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা টানা কাজ করছেন।
গত ২২ অক্টোবর বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে মারা যান নগরের নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী আনোয়ারুল হক। রবিবার (২ নভেম্বর) পর্যন্ত হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন মোট ৭৭ জন—পুরুষ ৬৪, নারী ৯ এবং শিশু ৪ জন। এ বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৬০ জন ডেঙ্গু রোগী; মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে—আগস্টে ভর্তি ছিল ১৫০ জন, সেপ্টেম্বরে ৩৭৩ জন, অক্টোবরে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭৯ জনে, আর নভেম্বরের প্রথম দুই দিনেই ভর্তি হয়েছেন ৮২ জন।
একদিকে হাসপাতালের চাপ, অন্যদিকে নগরজুড়ে মশার উপদ্রব জনমনে আরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হওয়া তো দূরের কথা, ঘরেও মশার আক্রমণে টিকতে পারছেন না বাসিন্দারা।
ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“সন্ধ্যার পর ঘরে বসে থাকা দায়। কয়েল, স্প্রে—কিছুই কাজে আসে না। শিশুরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না।”
বড়বাজার এলাকার গৌতম পোদ্দারের অভিযোগ,“ছেলে বিদেশ থেকে ফিরেছে, কয়েক দিনের মাথায় ডেঙ্গু। হাসপাতালে জায়গা না থাকায় বাসায় রেখেই চিকিৎসা করছি।”
কালিবাড়ী এলাকাবাসীর দাবি, অকার্যকর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্যই মশার প্রজনন বাড়িয়ে দিয়েছে।
হাদিম উদ্দিন রোডের বাসিন্দা আনোয়ার বাবু বলেন,“ডেঙ্গুর ভয় আমাদের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া অসম্ভব।”
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন জানায়, চলতি অর্থবছরে মশক নিধনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১.৫ কোটি টাকা—যার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। ২০ অক্টোবর থেকে বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। পাশাপাশি মাইকিং, লিফলেট ও জনসচেতনতা কার্যক্রমও অব্যাহত আছে।
প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ. কে. দেবনাথ বলেন,“বাড়ির ছাদে, টবে কিংবা পাত্রে পানি জমে থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে। শুধু সিটি করপোরেশনের চেষ্টা যথেষ্ট নয়—নাগরিকদেরও সতর্ক হতে হবে।”
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম জানান,
“প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। চিকিৎসক-নার্সরা বাড়তি চাপ নিয়েও আন্তরিকভাবে সেবা দিচ্ছেন।”
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোখতার আহমেদ বলেন,“পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের উদ্যোগ আছে। তবে নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া কার্যকরভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।”
মশা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
Leave a Reply