ডায়াবেটিস-চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি

ডাঃ এ আর খান
ডায়াবেটিস (Diabetes) ইংরেজি শব্দ যার অর্থ বহুমূত্র। ডায়াবেটিস একটি হরমোন সংশ্লিষ্ট রোগ। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামের হরমোনের সম্পূর্ন বা আপেক্ষিক ঘাটতির কারণে বিপাকজনিত গোলযোগ সৃষ্টি হয়ে রক্তে গ্লুকোজের পরিমান বৃদ্ধি পায় এবং এক সময় তা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। এই সামগ্রিক অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলে। ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক কোন রোগ নয়। বর্তমানে পৃথিবীর ২-৫ ভাগ লোক এ-রোগে আক্রান্ত ।
দেহযন্ত্র অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরী করতে না পারে অথবা শরীর যদি উৎপন্ন ইনসুলিন ব্যবহারে ব্যর্থ হয় তা হলে যে রোগ হয় তা হল ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ। অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিন, যার সহায়তায় দেহের কোষগুলো রক্ত থেকে গøুকোজকে নিতে সামর্থ হয় এবং একে শক্তির জন্য ব্যবহার করতে পারে। ইনসুলিন উৎপাদন বা ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা-এর যেকোন একটি বা দুইটিই যদি না হয় তাহলে রক্তে বাড়তে থাকে গøুকোজ। আর একে নিয়ন্ত্রন না করা গেলে ঘটে নানা রকম জটিলতা। ডায়াবেটিস এমন একটি শারীরিক বিকৃতি ঘটিত অবস্থা যাতে অধিক পরিমানে ও বার বার প্রস্রাব ত্যাগ, প্রচুর পানির পিপাসা, শীর্ণতা তৎসহ প্রস্রাব পরীক্ষা করলে সুগার থাকতে পারে আবার সুগার নাও থাকতে পারে।
ডায়াবেটিস এর শ্রেনীবিভাগ (Classification of Diabetes) ঃ-
ডায়াবেটিস প্রধানত দুই প্রকার। যথা-

A) ডায়াবেটিস মেলিটাসB) ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস। A) ডায়াবেটিস মেলিটাস আবার দুই প্রকার।
a) প্রাইমারী ডায়াবেটিস মেলিটাস –
(i) ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলিটাস। (ii) নন-ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলিটাস।

b) সেকেন্ডারী ডায়াবেটিস মেলিটাস –
(i) নন প্যানক্রিয়েটিক এন্ডোক্রাইনাল ডিজঅর্ডার (ii) প্যানক্রিয়েটিক ডিজিজ। (iii) গ্যাস্ট্রোটাইনাল ডায়াবেটিস।
(iv) ইন্টোজেনিক ডায়াবেটিস।

B) ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস আবার দুই প্রকার। যথাঃ
(1) ক্রনিয়াল ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস। (2) নেক্সোজেনিক ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস।
এছাড়া ব্রিটিশ ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন কর্তৃক শ্রেণীবিভাগ -যথা:
* পোটেনশিয়াল ডায়াবেটিস-ডায়াবেটিস হওয়ার পূর্বাবস্থা।
* লেটেন্ট ডায়াবেটিস-পরীক্ষা করলে ধরা পড়ে না।
* কেমিক্যাল ডায়াবেটিস-লক্ষণ প্রকাশ পায় না, তবে পরীক্ষা করলে ধরা পড়ে।

ডায়াবেটিসের কারণ (Causes of Diabetes):-
A) প্রধান কারণ:- * সোরা (Psora) * সিফিলিস (Syphilis) * সাইকোসিস (Psychosis)
* টিউবারকুলার ডায়াথেসিস (Tubercular Diathesis).

B) আনুষঙ্গিক কারণ:-
* জেনেটিক বা বংশগত কারণ। * ওজনাধ্যিকের কারণে। * শারীরিক পরিশ্রম কম করলে।
* বহুদিন ধরে ষ্টেরয়েড ঔষধ ব্যবহার করলে। * জন্মের পরপরই শিশুকে গরুর দুধ খাওয়ালে।
* ষ্ট্রেস বা টেনশনের কারণে। * অটোইমিউন ডিজিজজনিত কারণে। যেমন-হাইপোথাইরোডিজম, হাইপারথাইরোডিজম,
মাইক্সোডিমা প্রভৃতি। * ইনফেকশনজনিত কারণে- যেমন-রুবেলা ভাইরাস, ষ্টেফলো কক্কাস।
* বয়স- যেমন- যেকোন বয়সে হতে পারে। প্রধানত মধ্য বয়সে এবং বার্ধক্যে অবস্থায় বেশি হয়। ৫০ বছর বয়সের পরে শতকরা ৫০ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়।
* লিঙ্গ -নারী পুরুষ উভয়েই এই রোগে সমানভাবে আক্রান্ত হয়। তবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে পুরুষরা এবং অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে মহিলারা বেশি আক্রান্ত হয়।
* অতিরিক্ত আহার করা।
* শারীরিক ও মানসিক আঘাত। * গর্ভাবস্থায় ইনসুলিন বিরোধী হরমোন সিক্রেশন অধিক পরিমানে বৃদ্ধি পেলে।
*প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন সিক্রেশন করে এরূপ-সেলের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলে রক্তের
প্লাজমায় ইনসুলিনের মাত্রা অত্যন্ত কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিস মেলিটাস দেখা যায়।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ:-
* বেশি প্রস্রাব হয়। * রাতে ঘুম ভেঙ্গে প্রস্রাবের প্রবনতা। * খুব বেশি পিপাসা লাগা। * বেশি বেশি ক্ষুধা লাগা।
* যথেষ্ট খাওয়া সত্তে¡ও ওজন কমে যাওয়া। * ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ। * ক্ষত শুকাতে বিলম্ব হওয়া।
* খোস পাঁচড়া, ফোড়া প্রভৃতি চর্মরোগ দেখা দেয়া। * যৌনাঙ্গে চুলকানি। * চোখে ঝাপসা দেখা। * মাথা ঘোরা।
* প্রচন্ড চুলকানি। * কোন কাজে উৎসাহ না পাওয়া। * গলা ও মুখ শুকিয়ে যায়।
* বার্ধক্য ছাড়াই যৌনক্ষমতা ক্রমেই কমে যাওয়া।
* রোগের আক্রমন সাধারনত ধীরে ধীরে হয়। কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হঠাৎ হয়।
*বিছানায় প্রস্রাব করে। * অত্যন্ত ক্ষুধা, রোগী সবসময় ক্ষুধা অনুভব করে।
* কোষ্ঠবদ্ধতা বা মলশক্ত এবং ২-৩ দিন পর পর মলত্যাগ হয়। * দ্রুত শীর্ণ বা দ্রুত ওজন হ্রাস পায়।
* শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ হয়। * জিহŸা ময়লা লেপাবৃত এবং ঠোঁট ফাটা। * প্রস্রাবে গ্লুকোজ।
* পালস নিম্নে এবং প্রেসার নিম্নে। * পুরুষাঙ্গের চর্মরোগ ও চুলকানি।

রোগানুসন্ধান (Investigation)
* Blood CBC. * 2 hour after meal * FBS * RBS. * KFT * L FT * HBA1C
* GTT * Lipid Profile * Urine RME C/S, R/S * Stool RME C/S * USG of W/A.
* ECG * Echo * Chest of E-ray

ভাবীফল (Prognosis);- নিয়ন্ত্রিত ও দক্ষতার সাথে চিকিৎসা করিলে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। ডায়াবেটিস জটিল আকার ধারন করলে এবং গর্ভাবস্থায় ১ম পর্যায়ে ডায়াবেটিস আক্রান্ত হলে এর ভাবীফল খারাপ।

জঠিলতা (Complication):-
(১) রক্তনালী সম্পর্কিত জটিলতা- a) ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ। b) গ্যাংগ্রিন।
২) কিডনী সম্পর্কিত জটিলতা-
a) কিডনীর প্রদাহ। b) কিডনীর আর্টারী সরু। c) এলবুমিনুরিয়া।
৩) নিউরোলজিক্যাল সম্পর্কিত জটিলতা-
a) পেপরিফেরাল নিউরাইটিস। b) ইমপোটেন্সী ) রাত্রে উদারাময়।
৪) পালমোনারী-
a) নিউমোনিয়া। b) ব্রক্কোনিউমোনিয়া c) টিউবারকুলোসিস।
৫) গর্ভাবস্থায় এবং নিউনেটাল সম্পর্কিত জটিলতা-
a) মিসক্যারিজ। b) এবরশন। c) টক্সিমিয়া অব প্রেগনেনসি। d) হাইড্রোমোনিয়াম।
৬) চোখের সমস্যা-
a) ডায়াবেটিস ক্যাটার‌্যাকট। b) রাইনাইটিস। c) হেমোরেজ। d) কনজাংটিভাইটিস।
e) দেখতে সমস্যা।
৭) চর্মের সমস্যা-
a) ফোড়া। b) কার্বাঙ্কল।
৮) কোমা
৯) মানসিক এবং সামাজিক।
১০) মাড়ীর রোগ হয়।

ব্যবস্থাপনা (Management):-
A) ঔষধ (Medicine):- সাদৃশ্য লক্ষনানুসারে নিম্নেলিখিত হোমিওপ্যাথি ঔষধ যোগ্যতাসম্পর্ন হোমিওপ্যাথ এর পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করা উচিত। যেমন-সিজিজিয়াম জাম্বো (Syzyzyum zambo), ইউরোনিয়াম নাইট্রিকাম (Urenium Nitricum), আর্জেন্ট মেট (Argent Met), এসেটিক এসিড (Acitic Acid), এসিড ফস (Acid Phos), ফসফরিক এসিড (Phosphoric Acid), জিমনেমা (Gymnema Sylvestre), ফসফরাস (Phosphorus), আর্নিকা (Arnica), বেলেডোনা (Belladona), আর্সেনিক এলবাম (Arsenic Album), কেলি ফস (Kali Phos), নাক্স ভম (Nux-Vom), ব্রায়োনিয়া (Bryonia), ইনসুলিন (Insulin), ক্যালকেরিয়া ফস (Calcara Phos)

B) উপদেশ (Advice):-
1) পালনীয়/করনীয়:-
* রোগীকে রোগ সম্পর্কে পূর্ণ ধারনা দিতে হবে।
* জীবন প্রণালী, নিদ্রা হাটাচলা এবং ব্যায়াম সম্পর্কে রোগীকে তার রোগ অবস্থার সাথে স্যমঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষন ও উপদেশ দিতে হবে। * খাদ্য তালিকা সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে হবে।
* রোগীর সাথে সব সময় একটি ঔষধ নির্দেশক কার্ড রাখতে হবে।
* রোগীর রক্তে শর্করার হ্রাসনিত শক সম্বন্ধে অবগত করতে হবে।
* ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
* নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
* দৈনিক নিয়মিত ৪০ মিনিট হাটতে হবে।
* শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।

2) নিষেধ (Avoid):
*মিষ্টি, চিনি খাওয়া নিষেধ। * মিষ্টি শাক-সবজি খাওয়া। * মাটির নিচে জম্মে এরূপ সবজি যেমন-আলু।
* শর্করা, প্রোটিন, চর্বি জাতীয় খাবার নিষেধ।
* ধুমপান, মদ্যপান এবং হোটেলের খাবার পরিপূর্নভাবে পরিহার করতে হবে।
* মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না। * দুশ্চিন্তা করা নিষেধ।
3) পথ্য (Diet):-
* সবুজ শাক-সবজি খেতে দিতে হবে। * টমেটো, লেবু, শশা খেতে দিতে হবে।
* পানি জাতীয় সবজি বেশি করে খেতে হবে। এতে প্রচুর ভিটামিন থাকে ও কোন সুগার থাকে না এই সব সবজিতে।
* লাউ, কুমড়া, পটল, করলা, চিচিঙ্গা ইত্যাদি ভিটামিনের অভাব পূরন করে।