১১ ডিসেম্বর, টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা পাক-হানাদার বাহিনীর কবল থেকে টাঙ্গাইলকে মুক্ত করে। ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে টাঙ্গাইলের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতাপূর্ণ গেড়িলা যুদ্ধের কাহিনী দেশের সীমানা পেড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত কাদেরিয়া বাহিনীর বীরত্বের কথা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পরপরই দেশকে শত্রু মুক্ত করতে টাঙ্গাইলে স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়। চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ।
একপর্যায়ে টাঙ্গাইলে গঠন করা হয় কাদেরিয়া বাহিনী। এই বাহিনী প্রচন্ড প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাত শুরু করে পাক সেনাদের ওপর। ক্রমান্বয়ে সংগঠিত হতে থাকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা। শেষ পর্যন্ত এর সংখ্যা দাড়ায় ১৭ হাজারে।৮ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে প্রায় পাঁচ হাজার পাক সেনা ও সাত হাজার রাজাকার আলবদর অবস্থান করে। খান সেনাদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য যমুনা নদী পথে পাঠানো হয় সাতটি জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও গোলাবারুদ।কাদেরিয়া বাহিনী গোপনে এই খবর পেয়ে জাহাজ ধবংস করার জন্য মাইন পোতার দায়িত্ব দেয় কমান্ডার হাবিবুর রহমানকে। জীবনবাজী রেখে মাটিকাটা নামক স্থানে ঘটানো হয় জাহাজ বিস্ফোরণ। দুটি জাহাজে দুরাত দুদিন ধরে চলতে থাকে অনবরত বিস্ফোরণ। বাকি জাহাজগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র শস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলার বিভিন্ন স্থানে।মুক্তি বাহিনীর এ সব আক্রমণ, গোলাবারুদ ধ্বংস ও অস্ত্র উদ্ধারে খান সেনারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
২৬ মার্চ গণমুক্তি পরিষদের উদ্যোগে টাঙ্গাইল সদর থানায় স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়।২৭ মার্চ বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত সভায় টাঙ্গাইলকে স্বাধীন ঘোষণা করা হয়। ওইদিন রাতেই সার্কিট হাউজ আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। অতর্কিত ওই আক্রমণে দুইজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয় ও ১৫০ জন আত্মসমর্পন করে। প্রথম আক্রমণে ব্যাপক সাফল্য পাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এরপর থেকে গ্রামে গ্রামে যুবকরা সংগঠিত হতে থাকে।
টাঙ্গাইল মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে যাওয়ায় ৩ এপ্রিল ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে প্রবেশের চেষ্টা করে পাকবাহিনী। এসময় মির্জাপুর উপজেলার গোড়ান-সাটিয়াচড়া নামক স্থানে ইপিআর ও মুক্তিযোদ্ধারা পাক-হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।সেদিনের প্রতিরোধ যুদ্ধে ২৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। যুদ্ধে ১৬ ইপিআর সদস্য, জুমারত আলী, জাহাঙ্গীর হোসেন মানিকসহ ৮ থেকে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এরপর স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ওই গ্রামে বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ শতাধিক গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।
এরপর হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করলে নিরাপদ স্থানে চলে যায় মুক্তিযোদ্ধারা এবং নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ ও সংগঠিত হতে থাকেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়। শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ। চারদিকের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী।
টাঙ্গাইল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী অন্যান্য যোদ্ধাদের নিয়ে সখিপুরের মহানন্দা ও কীর্ত্তনখোলায় গড়ে তোলেন দুর্ভেদ্য দূর্গ। একের পর এক আক্রমণের মুখে পাক সেনারা গুটিয়ে জেলার অন্যান্য স্থান থেকে এসে যখন টাঙ্গাইল শহরে অবস্থান নেয় তখন উত্তর ও দক্ষিণ টাঙ্গাইল ছিল স¤পূর্ণ মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা করা হয় টাঙ্গাইল আক্রমণের। পরে কালিহাতীর পুংলি নামক স্থানে মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সংর্ঘষ হয় পাক সেনাদের। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রাণ ভয়ে পাক সেনারা সারারাত ধরে টাঙ্গাইল ছেড়ে ঢাকার দিকে পালায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী চার দিক থেকে সারাশি আক্রমণ চালিয়ে পাক সেনাদের টাঙ্গাইল থেকে বিতারিত করতে সক্ষম হয় কাদেরিয়া বাহিনী।
১০ ডিসেম্বর রাতে টাঙ্গাইলে প্রবেশ করেন কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক। ১১ ডিসেম্বর সকালে কমান্ডার বায়োজিদ ও খন্দকার আনোয়ার টাঙ্গাইল পৌঁছান। আসেন বিগ্রেডিয়ার ফজলুর রহমান। সার্কিট হাউজে অবস্থানরত খান সেনারা কাদের সিদ্দিকীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। মুক্ত হয় টাঙ্গাইল জেলা। মুক্তির স্বাদ পেয়ে উল্লসিত মানুষ রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। মুক্তির স্বাদ পেয়ে জয় বাংলা স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলে জেলা শহর।
Leave a Reply